বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লোকে তা বোঝে। সম্ভবত বোঝে বলেই পৃথিবীর আনাচকানাচে ১০ নম্বররা ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকলেও চোখ ঘুরিয়ে বলে দেয়, ১০ নম্বর মানে তো শুধু সংখ্যা ও পাস দেওয়া নয়, ওঁর ১০টা ছিল জীবন্ত! জার্সিটা গায়ে তোলার পর শরীরে কী যেন ভর করত।

আসলে এই ‘কী যেন’টুকুই সেই ‘জীবন’—ফুটবলের আনন্দদায়ী চাতুরী দেখে যে অদৃশ্য জীবনকে স্পর্শের স্বাদ মেলে। মানুষের চোখে ডিয়েগো ম্যারাডোনা সেই জীবনেরই ‘ঈশ্বর’। তাঁর না থাকা মানে পৃথিবীটা সত্যিই ‘১০ নম্বর’হীন।

শীতের রাত বড় হয়। সেদিন শীত না পড়লেও রাতটাই ক্রমশ বড় হচ্ছিল। ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর আসার পর অনেকের চোখ থেকেই ঘুম পালায়, স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যায় আপনাই।

default-image

শারীরিক সমস্যা তো ছিলই, জীবনটাও থরো থরো আবেগের হওয়ায় মাদক বাসা বেঁধেছিল সহজেই। কিন্তু কোনো রকম খোঁজখবর না নিয়েই বলে দেওয়া যায়, সে রাত থেকে এখন পর্যন্ত ম্যারাডোনার মাঠের জীবন নিয়েই কথা হয়েছে বেশি। বাকিটা যেন ‘চাঁদের কলঙ্ক’—অন্তত তাঁর সমর্থকদের কাছে। তা দীর্ঘশ্বাসে চাপা দিয়ে আজও হয়তো পৃথিবীর কোনো কোনা থেকে কেউ অস্ফুটেই বলছেন, ম্যারাডোনা থাকলে এটা বলত, ওটা বলত...।

ম্যারাডোনার না থাকার আজ ১০ মাস পূর্ণ হলো।

শুধু বাংলাদেশের কথা বিবেচনা করলেও ম্যারাডোনার এই না থাকার অভাবটা টের পাওয়া যায়। এ দেশের মানুষের মধ্যে ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা সৃষ্টির ভিতটা ম্যারাডোনার ১০ নম্বর জার্সির ভেলকিতে গড়া। সেখানে কী দারুণের পর কী নিদারুণ পরিসমাপ্তি!

১৯৮৬ বিশ্বকাপে অমরত্ব নিশ্চিত করলেন, ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিজে কেঁদে সবাইকে কাঁদালেন। আর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা প্রমাণ করলেন, তিনিও রক্ত–মাংসের মানুষ, ভুল তাঁরও হয়।

এরপর বাকিটা পথের দখল নেয় মাদক। শুধু একটি বিষয় কখনো পাল্টায়নি, টিকে ছিল আমৃত্যু—ম্যারাডোনার মুখ। সোজা কথাটা সোজা করেই বলতেন ম্যারাডোনা। প্রশংসা–নিন্দা যা-ই হোক, প্রকাশ্যে বলেছেন।

default-image

আর তাই এই ১০ মাস যেন ১০ বছরের সমান! এ সময় পৃথিবীতে কত কিছু ঘটল—আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জেতালেন লিওনেল মেসি, বার্সেলোনাও ছাড়লেন, পেলে কয়েক দফা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলেন, ফিরেও এলেন প্রতিবার।

কিন্তু কিংবদন্তি হয়েও বিতর্কিত ইউরোপিয়ান সুপার লিগে নিয়ে পেলে মুখে কখনো টুঁ শব্দটি করেননি। ফিফা যে চার বছরের বদলে দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায়, তা নিয়েও নয়। ম্যারাডোনা—১০ নম্বর—থাকলে নিশ্চিতভাবেই ছেড়ে কথা বলতেন না! সোজা কথায়, স্রেফ ধুয়ে দিতেন।

মাঠের বাইরে কিংবদন্তির এমন আচরণ মিস করেন অনেকেই। দেশের হয়ে প্রথম জেতা শিরোপা ম্যারাডোনাকে দেখাতে পারেননি মেসি। স্নেহসুলভ অধিকারবোধ থেকে ম্যারাডোনা নিশ্চয়ই মেসির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলতেন, এবার বিশ্বকাপটাও এনে দাও!

এদিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পেলের হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যাওয়া নিয়েও হয়তো মুখ ফুটে সহমর্মিতা বের হতো। কিন্তু পেলে বের হওয়ার পর দুজনের মধ্যে আবারও যা তা-ই; বিনা যুদ্ধে নাহি দেব–শ্রেষ্ঠত্বের–সূচ্যগ্র মেদিনী!

সত্যি বলতে পেলে–ম্যারাডোনার বাক্যবিনিময়, আদতে কথার লড়াই কয়েক যুগ ধরেই ফুটবল বিশ্বকে একই সঙ্গে বিনোদন ও বিতর্কের খোরাক জুগিয়েছে। অনন্তলোকের বেরসিক ‘কোচ’ ফুটবলপ্রেমীদের কপাল থেকে সেই খোরাকিটুকু ছিনিয়ে নেওয়ার পর পেলেও নিশ্চয়ই ভীষণ একা বোধ করেন! টম না থাকলে জেরির কিংবা জেরি না থাকলে টমের যে অবস্থা হয়!

কিংবা সুপার লিগ নামক জোটের ‘লোভাতুর দৈত্য’দের ডামাডোলে চ্যাম্পিয়নস লিগকে ভালোবেসে ফেলা সমর্থকদের অবস্থাটা একবার ভাবুন। তাঁদের হয়ে গলা ফাটিয়ে কথা বলার কেউ নেই! যাঁরা আছেন, তাঁরা ফুটবল–রাজনীতির কোনো না কোনো ‘ব্লক’ মেনে কথা বলেন। বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর বন্ধু ম্যারাডোনাকে কখনো এই ছাঁচে ফেলা যায়নি। এমন আজীবনের এক বিপ্লবীর অনুপস্থিতিও ১০ মাস ধরে চোখে বিঁধছে প্রকট।

আর যা যা বিঁধছে, সবই পুরোনো স্মৃতি। ইউটিউবে সার্চ দিলেই ‘ম্যাজিক’গুলো এখন কাঁটার মতো হুল ফোটায়!

ফুটবলের এই উত্তর–আধুনিক যুগে ‘স্বাধীন’ ফুটবলার বলে কিছু নেই। ‘পাস দাও, পাস নাও’—সূত্রে মিডফিল্ডারদের কাজ বড়জোর বক্স থেকে বক্সে দৌড়ানো। দু–একটা ক্রস কিংবা ডিফেন্সচেরা পাস। আশি–নব্বই কিংবা গত এক দশকের আগের সময়েও মাঠে প্লে–মেকারদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত।

default-image

পায়ের ঝলক, বল একটু বেশি সময় পায়ে রাখা, নিজের মতো করে খেলে গোলমুখ খোলা—প্লে–মেকারদের এসব ‘ট্রেডমার্ক মুভ’ এখন অপচয় হিসেবে ধরা হয়। প্লে–মেকার সত্তাটা খুন করে বেশির ভাগই এখন হয় বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার, নয়তো ফরোয়ার্ড। প্লে–মেকারদের জাত বিলীন হতে থাকায় খেলায় এখন প্রাণের স্পন্দন টের পাওয়া যায় সামান্যই। খেলাটা আর জীবন্ত হয়ে ওঠে না।

এদিকে ইউটিউবে ম্যারাডোনার প্লে–মেকিংয়ের ভিডিওগুলোয় অনুসারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি থাকছেন। তাঁর খেলার ধরন থেকে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কাটাছেঁড়া হচ্ছে, চলছে উকিল–আদালত; শুধু মানুষটাই নেই।

আজ ১০ মাস হলো, পৃথিবী তাঁর ‘প্লে–মেকার’ হারিয়ে মেনে নিয়েছে গ্রামবাংলার প্রচলিত কথাটা, ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ।’

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন