গোলের পর জার্সি খুলে উদযাপন মাহবুবুর রহমান সুফিলের
গোলের পর জার্সি খুলে উদযাপন মাহবুবুর রহমান সুফিলেরছবি: প্রথম আলো

‘সুফিলের সঙ্গে দৌড়ে পারা নেপালের ফুটবলারের পক্ষে সম্ভব না’

গর্বের সঙ্গে প্রেস বক্সে কথাটি বললেন এক সাংবাদিক। নিয়মিত যাঁরা ফুটবল দেখেন, তাঁদের এর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই। পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই মাহবুবুর রহমান সুফিলের নামের সঙ্গে লেগে গেছে ‘দুরন্ত গতির ফরোয়ার্ড’ উপমা।

বিজ্ঞাপন
default-image

গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের বা ‘জিপিএস’-এর তথ্য অনুযায়ী ঘণ্টায় ৩২.০৪ কিলোমিটার গতিতে দৌড়াতে পারেন মাহবুবুর। ২০১৮ সালে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘে খেলার সময় জিপিএস ব্যবহার করে তাঁর এই গতির পরিসংখ্যানটি বের করেন তখনকার আরামবাগের ও বর্তমানে চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ মারুফুল হক।

দুই বছরে জাতীয় দল ও বসুন্ধরা কিংসের উন্নত মানের পরিবেশে গতির উন্নতি আরও হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, তবে কমেনি এ কথা বলাই যায়।

সুযোগ পেলেই সেই গতি কাজে লাগাচ্ছেন ২২ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। নেপালের বিপক্ষে কাল বাংলাদেশের ২-০ গোলের জয়ের পর মাহবুবুরের গোলটি নিয়ে চর্চা চলছে ফেসবুকে। প্রায় প্রতিটি ক্যাপশনেই জুড়ে দেওয়া হচ্ছে—দ্রুতগতির সঙ্গে দুর্দান্ত ফিনিশিং। আরও একটি কথা যোগ করতে হবে—‘ফাইটার’।

মাঝমাঠের ওপরে নেপাল ডিফেন্ডারের পা থেকে বলটি কেড়ে নেন তিনিই। এরপর বদলি মিডফিল্ডার সোহেল রানাকে ব্যাক পাস করেই সেই যে মাঝমাঠের কাছাকাছি থেকে দিলেন ভোঁ দৌড়, আর মাহবুবুরকে ধরে কে!

বিজ্ঞাপন
default-image

সোহেলের থ্রু বলটি নিয়ন্ত্রণে নিলেন ডি বক্সের প্রায় ৭–৮ গজ বাইরে। বলে তিন স্পর্শে ডি-বক্সের ভেতরে ৬ গজের ছোট বক্সের কাছাকাছি পৌঁছে যান মাহবুবুর। ততক্ষণে পোস্ট ছেড়ে তাঁকে আটকাতে এগিয়ে আসেন নেপাল গোলকিপার, কিন্তু তাঁর পাশ দিয়ে মাহবুবুরের দারুণ বাঁকানো শট মাটি কামড়ে দূরের পোস্টে জালে।

গতি, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ঠান্ডা মাথায় ফিনিশিং। ফিটনেস, স্কিল ও মানসিক শক্তির মিশেলে পাওয়া এক গোল।

এর আগে নেপালের ডিফেন্ডার অজিত ভান্ডারিকে দেখা গেল মাহবুরের পেছন পেছন দৌড়াতে। কিন্তু মাহবুবুরের সঙ্গে দৌড়ে টিকলে তো! ম্যাচ শেষে ফোনে কিছুটা মজার ছলেই জিজ্ঞাসা করা হলো মাহবুবুরকে—এত গতি পান কোথায়?

মাহবুবুরের সহজ-সরল জবাব, ‘আল্লাহ দিয়েছেন।’ নিজের কোনো চেষ্টা নেই? এবার একটু খোলাসা করলেন মাহবুবুর, ‘ছোটবেলা থেকেই অনুশীলনে আমি প্রচুর স্প্রিন্ট দিই। ছোট জায়গার মধ্যে জোরে দৌড় শুরু করতে পারি।’

default-image

এর আগে গত বছর আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে কম্বোডিয়ার বিপক্ষে মাহবুবুরের এমন একটি দৌড় এখনো দেশের ফুটবলপ্রেমীদের চোখে লেগে থাকার কথা। পাল্টা আক্রমণে বাঁ প্রান্ত দিয়ে মাহবুবুরের ঝড়ের গতিতে একটি মুভেই খুলে গিয়েছিল স্বাগতিক কম্বোডিয়ার গোলমুখ।

ম্যাচের একমাত্র গোলদাতা রবিউল হাসানের গোলটি যতটা না মাধুর্য ছড়িয়েছিল, এর চেয়ে বেশি প্রশংসনীয় হয় মাহবুবুরের সেই দৌড় ও গোল করানোর দক্ষতা।

বিজ্ঞাপন

সেদিন সুশান্তের বাতাসে ভেসে আসা বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ প্রান্ত দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটেছিলেন মাহবুবুর। তাঁর সঙ্গে দৌড়ে কুলিয়ে উঠতে না পেরে একেবারেই ছিটকে পড়েন কম্বোডিয়ান ডিফেন্ডার।

বক্সে গোললাইনের কাছাকাছি গিয়ে মাহবুবুর আলতো কাট ব্যাকে বলটি সাজিয়ে দেন রবিউলের সামনে। সেই গোলে প্রায় তিন বছরের বেশি সময় পর বিদেশের মাটিতে আসে বাংলাদেশের জয়। সেদিন গোল করিয়েছিলেন মাহবুবুর, কাল নিজেই করলেন। কাল অবশ্য মাহবুবুর মাঠে নেমেছিলেন নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জ্বালা থেকে। সুমন রেজার অভিষেক হওয়ায় একাদশে জায়গা হয়নি তাঁর।

default-image

তবে বদলি হিসেবে কোচ জেমি ডে যে তাঁকে মাঠে পাঠাবেন, সেই বিশ্বাসটি ছিল। তাই ক্ষণ গুনছিলেন মাঠে পা রাখার। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সুমনের বদলি হিসেবে নেমেছেন, গোলটি করেছেন ৮০ মিনিটে। অর্থাৎ নিজেকে প্রমাণ করতে সময় লেগেছে ৩৫ মিনিট।

মাহবুবুর শুধু জানতেন দলে টিকে থাকতে গোল তাঁকে করতেই হবে, ‘আমি শুধু মাঠে নামার অপেক্ষায় ছিলাম। জেদ ছিল, যে কয়েক মিনিটই খেলার সুযোগ পাই, ভালো খেলতে হবে। গোল করতে হবে। কারণ এখন দলে টিকে থাকা অনেক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।’

জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর শেষ গোলটি ছিল ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভুটানের বিপক্ষে। সে বছরের মার্চে গোল দিয়েই জাতীয় দলে অভিষেক হয় মাহবুবুরের। ভিয়েনতিয়েনে সে ম্যাচে স্বাগতিক লাওসের বিপক্ষে হারের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বদলি নেমে ৯২ মিনিটে বাংলাদেশের ত্রাণকর্তা মাহবুবুর। নতুন জার্সির ঘ্রাণ গায়ে লেগে থাকতে থাকতেই গোল করে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচটা সেদিন ২-২ গোলে ড্র করে বাংলাদেশ।

তবে জাতীয় দলের হয়ে ১৬ ম্যাচ খেলেও তাঁর গোল মাত্র ৩টি—এ পরিসংখ্যানে হয়তো আরও উন্নতি আনতে চাইবেন মাহবুবুর।

মন্তব্য পড়ুন 0