default-image

গত সপ্তাহে ভয়ংকর কিছু দিন পার করেছে লিভারপুল। বহুদিন পর ভক্ত ও সাবেক খেলোয়াড়দের কথার চাবুক হজম করতে হয়েছে ক্লাবটিকে। গত মৌসুমে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বেশি আয় করা ক্লাব দল হয়ে সরকারি সাহায্য চেয়েছিল ক্লাবটি। ফুটবল খেলে না এমন কর্মচারীদের বেতন সরকারের কাছ থেকে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল তারা।

ইংল্যান্ডে কাজ করছেন না কিন্তু বেতন দেওয়া হচ্ছে এমন কর্মচারীর বেতনের ৮০ ভাগ সরকার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। এর জন্য প্রতিষ্ঠানকে আবেদন করতে হয়। সবাইকে বিস্মিত করে লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও টটেনহামের মতো ক্লাবগুলো এর জন্য আবেদন করেছিল।

এর মাঝে লিভারপুলকেই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা শুনতে হয়েছে। অধিকাংশ সমর্থক তো বটেই, এমনকি সাবেক খেলোয়াড়েরাও ক্ষেপে উঠেছিলেন এতে। আর কিছু না হোক, গত মৌসুমেই শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে ১১ কোটি ১০ লাখ ইউরো বা ১০২৫ কোটি টাকা আয় করেছে লিভারপুল। শুধু প্রিমিয়ার লিগ থেকে এসেছে ১৫ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড বা ১৫৯৮ কোটি টাকা। এই ফেব্রুয়ারিতেই ঘটা করে রেকর্ড ৫৩ কোটি ৩০ লাখ ইউরো (৪ হাজার ৯২২ কোটি টাকা) আয়ের কথা জানিয়েছে অল রেডরা। সেই ক্লাবের কেন কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন? বিশেষ করে ফুটবল খেলেন না এমন কর্মচারীদের বেতন যেখানে ফুটবলারদের তুলনায় একেবারেই নগণ্য?

সমালোচনার ঝড়ে সিদ্ধান্ত বদলাতে খুব একটা দেরি করেনি লিভারপুল। ইউনাইটেডও সে পথে হেঁটেছে খুব তাড়াতাড়ি। লেস্টার সিটি অবশ্য প্রথম থেকেই বলছে তারা এ সুবিধা নেবে না। কিন্তু বেশ কয়েকটি প্রিমিয়ার লিগের দল এখনো সে আশা ছাড়ছে না। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নামটি টটেনহামের।

গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলেছে টটেনহাম।স এ সুবাদে ১০ কোটি ৯০ লাখ ইউরো পেয়েছে। সেই এক হাজার ৬ কোটি টাকার সঙ্গে যোগ করা যাক প্রিমিয়ার লিগ বাবদ পাওয়া এক হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। দলবদলের বাজারে দর-কষাকষির জন্য বিখ্যাত ডেনিয়েল লেভির ক্লাবের কেন এমন অর্থ কষ্টে পড়তে হবে? শুধু টটেনহাম নয়, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে অবনমন অঞ্চলে থাকা দলের আয়ও অন্যান্য লিগগুলোর চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলার যোগ্য দলের চেয়ে বেশি। এত ধনী ক্লাবগুলো হঠাৎ এত দরিদ্র হয়ে গেল কীভাবে?

শুধু টিভি স্বত্ব বাবদ বছরে ৩১০ কোটি পাউন্ড পায় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। ৩২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকার এই বিশাল অঙ্ক সমান ২০ ভাগে ভাগ হয়। ইউরোপের আর কোনো দেশেই এই ব্যবস্থা নেই। তবু সরকারি সাহায্য চাইছে অধিকাংশ ক্লাব।

এখানেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। যে টটেনহাম সরকারি সাহায্য ছাড়া ফুটবল খেলেন না এমন কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না, সে ক্লাবেরই কোচ হোসে মরিনহো বার্ষিক ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড পাচ্ছেন ক্লাব থেকে। আর লিগের ২০ দলের ফুটবল খেলেন না এমন সব কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন যোগ করলে দাঁড়ায় ২ মিলিয়ন। আয়ের তুলনায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই অর্থ দিতেই নাকি হিমশিম খাচ্ছিল টটেনহাম, ইউনাইটেড আর লিভারপুলের মতো ক্লাব!

ক্লাবগুলোর এমন আচরণের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন কিয়েরান ম্যাগুয়ার। লিভারপুল ইউনিভার্সিটির ফুটবলের আর্থিক বিনিয়োগের এই শিক্ষক বলছেন, ‘আর্থিক সহযোগিতার যে প্রসঙ্গ, তাতে মাত্র কয়েকটি ক্লাবই কঠিন আর্থিক সমস্যার মধ্যে আছে। অন্য ক্লাবগুলো এখনো এই সাহায্য নেবে না, কারণ তারা এখনো খেলেন না এমন কর্মীদের বেতন দিতে পারবে। কিন্তু লিগে ২০টি দল আছে, সব মালিকের চিন্তাভাবনা এক নয়।’

ক্লাবগুলো যে সরকারি আইনের ফাঁক বের করে সুবিধা নিতে চাইছে, সেটাই জানাচ্ছেন ম্যাগুয়ার, ‘টটেনহামের আয়ের মাত্র ৩৯ ভাগ বেতনে খরচ হয়। ফলে তাদের এ সাহায্য নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তবু তারা এটা করতে চাইছে, কারণ আইন তাদের সে সুবিধা দিচ্ছে। এটা বেআইনি নয়, ব্যাপারটা নৈতিকতার। লিভারপুলে হয়তো ৩০০ লোক আছে, যাদের সবার বেতন যোগ করলে বছরে কয়েক মিলিয়ন হতে পারে। তাদের আয়ের তুলনায় এটা কিছুই না, আমি তাই এর যৌক্তিকতা দেখিনি। প্রিমিয়ার লিগে ১৩ আর ১৪তম দলের আয়ের পার্থক্য ২৫ লাখ পাউন্ড। তার মানে সব ক্লাবেরই এ ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আছে।’

লিভারপুল এর মাঝেই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে সমালোচনা পর। টটেনহামের ভক্তরাও শোরগোল ফেলে দিয়েছেন এ নিয়ে। কিন্তু ম্যাগুয়েরের ধারণা, করোনাবিরতি আরও দীর্ঘায়িত হলে সব ক্লাবই হয়তো চক্ষুলজ্জা ভুলে যাবে, 'লিভারপুল স্বীকার করেছে তারা ভুল করেছে। কিন্তু এ অবস্থা যদি আরও চার মাস চলে, এবং তখন যদি সরকারি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থালে, অধিকাংশ ক্লাব সে সুবিধা নেবে। আপনি যে ধরনের ব্যবসাই করেন না কেন, একদিকে আয়ের পথ বন্ধ, আর অন্যদিকে প্রতি মাসে লাখ টাকা বেতন দিচ্ছেন, আপনার হাত খালি হতে বাধ্য।'

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0