ইউরোপিয়ান সুপার লিগের স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন ছিলেন বার্সেলোনার সাবেক সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ।
ইউরোপিয়ান সুপার লিগের স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন ছিলেন বার্সেলোনার সাবেক সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ। ফাইল ছবি

রিয়াল মাদ্রিদ গত রোববার রাতে বড় এক ‘বোমা’ই ফাটিয়েছে ফুটবল–বিশ্বে। ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নামের সেই বোমায় কেঁপে উঠেছিল ফিফা-উয়েফাসহ গোটা বিশ্বের ফুটবল অঙ্গন। কিন্তু সেই ‘বোমা’ তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল আজ থেকে পাঁচ বছর আগে। আর এর অন্যতম কারিগর ছিলেন বার্সেলোনার সাবেক সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ।

রোববার রাতে স্পেনের লা লিগায় হেতাফের মাঠ থেকে গোলশূন্য ড্র করে ফেরার ঘণ্টাখানেক পর রিয়াল টুইট করে জানায়, ইউরোপের ফুটবলে সুপার লিগ নামে নতুন একটি টুর্নামেন্টের জন্ম হতে যাচ্ছে। রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনাসহ যে লিগে খেলবে ইউরোপের বিভিন্ন লিগের শীর্ষ ১২টি ক্লাব। ইউরোপিয়ান সুপার লিগ খেলতে একমত হওয়া দলগুলোর নামও চলে আসে একই সঙ্গে—রিয়াল, বার্সেলোনা, আতলেতিকো মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল, টটেনহাম, এসি মিলান, ইন্টার মিলান ও জুভেন্টাস।

বিজ্ঞাপন
default-image

ইউরোপিয়ান সুপার লিগের চেয়ারম্যান করা হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকে। আর ভাইস চেয়ারম্যান জুভেন্টাসের সভাপতি আন্দ্রেয়া আনেয়েল্লি। সুপার লিগের হর্তাকর্তা হিসেবে যেহেতু তাঁদের নাম এসেছে, সাধারণ ফুটবলপ্রেমী থেকে শুরু করে ফুটবল পণ্ডিত বা সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার তির ছুটেছে পেরেজ আর আন্দ্রেয়া আনেয়েল্লির দিকেই। কিন্তু এই সুপার লিগ আদল পেতে শুরু করে ২০১৫-১৬ মৌসুম চলাকালে। আর সেই আদল দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন বার্তোমেউ।

ফুটবলবিষয়ক খবরের ওয়েবসাইট গোল ডটকমের খবর, কয়েক বছর ধরেই সুপার লিগবিষয়ক আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছেন বার্সার সাবেক সভাপতি বার্তোমেউ। বার্সেলোনার সঙ্গে সেই সময় সুপার লিগে যোগ দিয়েছিল জুভেন্টাস, রিয়াল মাদ্রিদসহ ইংল্যান্ডের দুটি ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও আর্সেনাল।

default-image

২০১৫-১৬ মৌসুমে শুরু হওয়া সেই আলোচনা একবার ভেস্তেও গিয়েছিল। এর বড় কারণ ছিল ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন (ইসিএ) ও উয়েফার বাধা। সেই সময়ে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের আলোচনা কোনো আকার পাওয়ার আগেই দলগুলোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায় উয়েফা ও ইসিএ। কিন্তু তখনো হাল ছাড়েননি বার্তোমেউ। জুভেন্টাস ও ইসিএর সভাপতি আন্দ্রেয়া আনেয়েল্লিকে নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।

বার্তোমেউ ও আনেয়েল্লির আলোচনা কিছুদূর এগোতে না এগোতেই তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি পেরেজ। এরপর আবারও এগিয়ে আসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও আর্সেনাল। সেই সময় উয়েফা ও ইসিএ চ্যাম্পিয়নস লিগ নিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত একটি চুক্তিও করেছিল। ২০১৮ সালে ক্লাবগুলোর মধ্যে উয়েফার লভ্যাংশ ভাগাভাগির কাঠামোটা ভালো লাগেনি বড় ক্লাবগুলোর। এর ফলে সুপার লিগের আলোচনা আরও গতি পায়। সেই গতি পাওয়া আলোচনার নেতৃত্বেও ছিলেন বার্তোমেউ।

বিজ্ঞাপন
default-image

বাস্তবতা হচ্ছে, সুপার লিগ নিয়ে আলোচনার সেই সময়ে বার্তোমেউ ছিলেন একমাত্র বোর্ড সদস্য, যিনি পরিকল্পনটা সবচেয়ে ভালো করে জানতেন। দুজন নির্বাহী সদস্য নিয়ে সুপার লিগকে আলোর মুখ দেখাতে গোপনে কাজ করে যাচ্ছিলেন বার্সেলোনার সাবেক সভাপতি। বিষয়টি যেন ফাঁস না হয়ে যায়, এ জন্য বার্তোমেউ জড়িত সবার সঙ্গে গোপনীয় একটি চুক্তিও করেছিলেন। সেই সময়কার পরিকল্পনার মধ্যে ছিল, ঘরোয়া লিগগুলোর পাশাপাশি টুর্নামেন্টটি কীভাবে চালানো যায় আর এর থেকে উপার্জিত অর্থ টুর্নামেন্টে খেলা ক্লাবগুলোর মধ্যে কেমনভাবে ভাগ করা হবে।

২০১৮ সালের পর পেরেজ এর সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে যান। যেকোনো মূল্যে পরিকল্পনাটি সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পণ করেন রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি। অবশেষে ২০২০ সালে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। বার্তোমেউ তখন সব বোর্ড সদস্যকে বিষয়টি খোলাসা করেন। বার্সেলোনায় তাঁর রাজত্ব শেষ হয়ে গেলেও তিনি সুপার লিগের প্রজেক্টটি বোর্ডের কাছে উপস্থাপন করেন। আর গোপন চুক্তির মাধ্যমে সেই প্রজেক্ট অনুমোদনও পেয়ে যায়।

প্রজেক্ট অনুমোদনের আগে করা গোপন চুক্তিটা ছিল এ রকম যে তারা পুরো বিষয়টি তখন দেখতে পর্যন্তও পারবেন না! তবে সেই সময় বোর্ড সদস্যদের সবাই বার্তোমেউকে বিশ্বাস করেছিলেন। যেদিন তিনি বার্সেলোনার সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন, তখন পুরো পরিকল্পনা অবমুক্ত করেছিলেন। সেই পরিকল্পনা ক্লাবকে কোনো কিছুর প্রতি দায়বদ্ধ না করলেও চুক্তিটি ছিল অলঙ্ঘনীয়।

default-image

বার্তোমেউর বিদায়ের পর বার্সেলোনার সভাপতি হয়েছেন হুয়ান লাপোর্তা। কিন্তু ইউরোপিয়ান সুপার লিগের ক্ষেত্রে সাবেক সভাপতির পথেই হেঁটেছেন তিনি। ক্লাবে প্রচুর পরিমাণে অর্থসমাগম ঘটবে, এটা ভেবেই লাপোর্তা গত শনিবার সুপার লিগে থাকবেন বলে চুক্তিতে সই করেন। তবে সুপার লিগের কিছু কিছু বিষয় চূড়ান্ত হয়নি এখনো, যেমন লভ্যাংশ কীভাবে ক্লাবগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি হবে। চুক্তি অনুযায়ী ১২টি ক্লাব সমান অর্থ পাবে না বলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

অর্থ ভাগাভাগির বিষয়টি হয়তো পরে আলোচনা করে মিটিয়ে নিত ক্লাবগুলো। কিন্তু এর আগেই ইউরোপিয়ান সুপার লিগের স্বপ্ন অনেকটাই ভেস্তে গেছে। এরই মধ্যে ১২ ক্লাবের ১০টিই সুপার লিগ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এরপরও বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদ সুপার লিগ আয়োজনের আশা ছাড়ছে না। বার্সেলোনার এক কর্মকর্তা গোল ডটকমকে বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এটা খুব আকর্ষণীয় একটি প্রতিযোগিতা হবে। এখানে আরও অর্থ থাকবে। কারণ, আমরা ঘরোয়া লিগেও থাকব।’

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন