বিজ্ঞাপন
default-image

অলিম্পিক গেমস কেবল স্বাগতিক দেশের জন্যই বিশাল ঘটনা নয়। এটি তাদের জন্যও বিশাল ব্যাপার, যারা বছরের পর বছর ধরে এতে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। অনেক ক্রীড়াবিদের জন্য অলিম্পিকে অংশ নেওয়া কিংবা বিজয়স্তম্ভে দাঁড়িয়ে সাফল্য উদ্‌যাপন করাটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো একটা ব্যাপার। এটা তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়েরও সূচনা।

সবার নিশ্চয়ই মনে আছে আলজেরীয় নারী অ্যাথলেট হাসিবা বুলমার্কার নাম। তিনি তাঁর দেশের বড় এক গর্ব। আজ থেকে ঠিক ৩০ বছর আগে, ১৯৯১ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে বুলমার্কা ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়ে জিতে দেশকে গর্বিত করেছিলেন। সেই সাফল্য তাঁকে এনে দিয়েছিল প্রথম আফ্রিকান নারী অ্যাথলেট হিসেবে বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের কোনো ইভেন্টে শিরোপা জয়ের সম্মান। দেশে ফেরার পর রাজধানী আলজিয়ার্সে তাঁকে সেদিন বীরোচিত সম্মান দেওয়া হয়েছিল। বিমানবন্দর থেকে তাঁর গন্তব্য পর্যন্ত পথটা ছিল গর্বিত সাধারণ মানুষের মিছিলে মুখর।

default-image

তবে বুলমার্কার জীবন এরপর একই রকম থাকেনি। বরং পরে তাঁর জীবন খুব দ্রুতই হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। ওই সময়টা অবশ্য তাঁর দেশ আলজেরিয়ার জন্যও ছিল খুব খারাপ। দেশটিতে উত্থান ঘটে ইসলামি মৌলবাদের। বিশ্বপর্যায়ে দেশের জন্য সাফল্য বয়ে নিয়ে আসা বুলমার্কা প্রতিনিয়ত উগ্রপন্থীদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকি পেতে থাকেন। ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিকের জন্য এই আলজেরীয় নারী অ্যাথলেট যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনো মৃত্যু রীতিমতো তাঁর পিছু তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

বার্সেলোনায় পৌঁছানোর পরও হুমকি তাঁর পিছু ছাড়েনি। তাঁর নিরাপত্তার জন্য আলাদা করে নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করতে হয়েছিল। বার্সেলোনায় তাঁর ইভেন্টের আগে তিনি যখন অনুশীলন করতে যেতেন, তাঁকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে ঘিরে থাকত নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন। সব বাধা, হুমকি পেরিয়ে তিনি ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়ে অংশ নেন এবং দৌড় শেষ করেন সবার আগে, বিজয়ীর বেশে। তাঁর সেই বিজয় ছিল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দারুণ এক যুদ্ধজয়। পোডিয়ামে তিনি যখন সোনার পদক গলায় পরে দাঁড়ালেন, জাতীয় সংগীতের সুর মূর্ছনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। বুলমার্কার সেই কান্না ছিল আনন্দের, বিজয়ের। সব বাধা জয় করার।

default-image

এখন একটু ভাবি, যদি কোনো কারণে ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিক বাতিল হয়ে যেত, তাহলে আমরা বুলমার্কার সেই অনুপ্রেরণাদায়ী বিজয়ের সাক্ষী হতাম না। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের কোনো গল্পও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমরা যেন ভুলে না যাই ক্রীড়াবিদেরা কেবল ক্রীড়াবিদই নন, তাঁরা তাঁদের দেশের মানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষা এবং গর্বের উৎস। এই ক্রীড়াবিদদের মাঠে নামার সুযোগ না দেওয়া মানে তাঁদের জীবনের অন্য দিকের গল্পটা থেকে বঞ্চিত হওয়া।

২০২০ টোকিও অলিম্পিক বাতিল হয়ে যাওয়ার যে কানাঘুষা শুরু হয়েছে, তাতে আমি জাপানের স্বর্ণকন্যা রিকাকো ইকেইকে নিয়ে চিন্তিত। ২০ বছরের এই নারী ক্রীড়াবিদ কেবল এক মরণব্যাধিকে জয় করেননি, তিনি আমাদের সবার আশার প্রতীকও। রিকাকো প্রমাণ করেছেন, মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। সংকল্প আর পরিশ্রমের মাধ্যমে মানুষ তাঁর জীবনের কঠিনতম সমস্যা, বাধাবিপত্তি জয় করতে পারে।

default-image

রিকাকো এরই মধ্যে কেবল তাঁর সেই মরণব্যাধিকেই জয় করেননি। প্রয়োজনীয় অনুশীলন, দৃঢ়তা আর অধ্যবসায় দিয়ে পৃথিবীর সেরা এক সাঁতারু হওয়ার যাবতীয় দক্ষতাও অর্জন করেছেন। এর বিনিময়ে বিজয়স্তম্ভে দাঁড়িয়ে রিকাকো যেন সাফল্য উদ্‌যাপন করতে পারেন, সেটিই আমাদের সবার চাওয়া। সুইমিংপুলে তাঁর সাঁতারের পোশাক হয়তো জাপানকে প্রতিনিধিত্ব করবে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, তাঁর জীবনের গল্পটি এমন যে তিনি অলক্ষ্যে পৃথিবীর সব মানুষকেই প্রতিনিধিত্ব করে ফেলবেন।

তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন হাসিবা বুলমার্কার দেশের মতো দেশকেও, যেখানে মেয়েদের জোর করে বাড়ির চার দেয়ালে আটকে রাখতে চায় উগ্রপন্থীরা, তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন অসহায় শরণার্থী মেয়েদের, যাঁরা একটু ভালো জীবনের আশায় অন্য দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। রিকাকো আমার দেশেরও সেই অসহায় পথশিশুদের প্রতিনিধি, যারা ভাগ্যবিড়ম্বিত, স্বপ্ন দেখা যাদের মানা।

আমার হৃদয়ের একটি অংশ যে এই করোনাকালেও মানুষের দুর্ভোগ আর মৃত্যুর মিছিলের মধ্যেও চাইছে অলিম্পিকটা হোক, সেটি ওই রিকাকো কিংবা বুলমার্কার মতো ক্রীড়াবিদদের জন্যই।

জাপানি দৈনিক মায়ানিচি শিম্বুনের সৌজন্যে

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন