‘আঙুল না থাকলে বাংলাদেশের হয়ে খেলব কী করে’
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সেই অবরুদ্ধ সময়টায় ‘ক্র্যাকপ্লাটুন’ নামের সেই গেরিলা বাহিনী ছিল আতঙ্কগ্রস্ত ঢাকাবাসীর আশার আলো। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর টহল। বাড়ি বাড়ি চলছে তল্লাশি। একে–ওকে তুলে নিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে অবলীলায়। এমন একটা দম বন্ধ করা সময় এই ক্র্যাকপ্লাটুন ঢাকায় ঢুকে চালাত বিভিন্ন অপারেশন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা তো ছিলই, ক্র্যাকপ্লাটুন দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছিল আরও অনেক জায়গায়। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য—এই ব্যাপারকে মাথায় রেখেই চলত ক্র্যাকপ্লাটুনের অভিযান। সেই দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনীতে ছিলেন দেশসেরা একজন ক্রিকেটারও। পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা এই ক্রিকেটারের নাম সবাই জানেন—আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল। পাকিস্তানি হানাদারদের শিকারে পরিণত না হলে তিনিই হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাপ মাথায় পরতে পারতেন খুব সহজেই।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরানোর লক্ষ্যেই পরিচালিত হতো ক্র্যাকপ্লাটুনের সব অভিযান। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর (পরবর্তী সময়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) খালেদ মোশাররফ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো বাহিনী স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ বা এসএসজির বাঙালি কমান্ডো ক্যাপ্টেন (পরবর্তী সময়ে কর্নেল) এ টি এম হায়দারের হাতে গড়া এই ক্র্যাকপ্লাটুন গেরিলা বাহিনীতে স্থান পেয়েছিলেন ঢাকা শহরের বাছাই করা সাহসী ছাত্র-যুবকেরা। চিরদিন বাঙালির স্বাধিকার আর আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েলও যোগ দিয়েছিলেন এই বাহিনীতে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল জুয়েলের হৃদয়ে। মাতৃভূমির অসম্মানের প্রতিশোধ আর বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে নিজের জীবনটাই বাজি রাখার সংকল্প করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়েই এ দেশের ক্রিকেট ও খেলাধুলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন তিনি।
জুয়েল ছিলেন আপাদমস্তক ক্রীড়াবিদ। ক্রিকেটের দিকেই তাঁর মনোযোগ বেশি ছিল। হতে চাইতেন বড় ক্রিকেটার। খেলতে চাইতেন পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলে। টেস্ট খেলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ঢাকা স্টেডিয়াম মাতিয়েছেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তান আমলে আর সব জায়গার মতো ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছিল বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য। জাতীয় দলে বাঙালি ক্রিকেটারদের নিয়ম রক্ষার্থে নেওয়া হলেও দ্বাদশ ব্যক্তি হিসেবে পানি টানিয়ে নেওয়াই ছিল পাকিস্তানিদের লক্ষ্য। অনেক বাঙালি ক্রিকেটারই ঘরোয়া ক্রিকেটে চোখে পড়ার মতো পারফরম্যান্স করলেও তাঁদের কখনোই টেস্ট খেলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। শহীদ জুয়েল ছিলেন তাঁদেরই একজন। ১৯৭০-৭১ মৌসুমেই জীবনের সেরা ফর্মে ছিলেন জুয়েল। এর আগে ১৯৬৯ সালে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল পাকিস্তানে সিরিজ খেলতে এসেছিল। সে সিরিজে মূল দলে জায়গা পাওয়ার মতো পারফরম্যান্স থাকলেও জুয়েলের জায়গা হয়নি। প্রাথমিক ক্যাম্পে থেকেই বিদায় নিতে হয় তাঁকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে দিয়ে জুয়েলের ব্যাট যেন প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের পর রান করে যাচ্ছিলেন। একটা সময় হয়তো তাঁকে আর উপেক্ষা করতে পারত না পাকিস্তানি ক্রিকেট প্রশাসকেরা। কিন্তু তিনি তাঁর লড়াইটা সরিয়ে আনেন মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে। লক্ষ্য স্থির করেছিলেন বাংলাদেশকে স্বাধীন করেই তিনি খেলবেন তাঁর দেশের জাতীয় দলে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে তিনি নিয়ে যাবেন অন্য উচ্চতায়। তাঁর দেশ ঠিকই টেস্ট খেলেছে, খেলেছে বিশ্বকাপ। বিশ্বের বড় বড় ক্রিকেট শক্তিকে হারিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। জুয়েল সেটি দেখে যেতে পারেননি।
জুয়েলের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার আরও একটা প্রেক্ষাপট আছে। তাঁর ‘গুরু’র হত্যাকাণ্ড কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি জুয়েল। গুরু বলতে মুক্তিযুদ্ধের আরেক শহীদ খেলাপাগল মানুষ মুশতাক হোসেন। অবাঙালি এই মানুষই জুয়েলকে ক্রিকেটের ময়দানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন খেলায়। মুশতাক স্বাধীনতার আগে ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনের এক পরিচিত মুখ ছিলেন। কিছুটা আলাভোলা ধরনের মানুষটি ছিলেন পরিবারহীন। খেলাধুলাই ছিল তাঁর জীবনের ধ্যানজ্ঞান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাত্রিতে ঢাকার আজাদ বয়েজ ক্লাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানের নরপশু সৈন্যরা। বিয়েথা না করা মুশতাক আজাদ বয়েজ ক্লাবেই থাকতেন, খেতেন।
মুশতাকের মৃত্যু জুয়েলের মাথা খারাপ করে দেয়। এমন একজন মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানিরা। গুরুর লাশ খুঁজে পেয়েছিলেন ঢাকা জেলা পরিষদ ভবনের সামনে। প্রতিশোধস্পৃহা পেয়ে বসে তাঁকে। স্বামীহারা মায়ের কোনো নিষেধই তিনি মানেননি। মাতৃভূমিকে হায়েনাদের হাত থেকে বাঁচাতে চলে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেলাঘরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে হয়ে ওঠেন দুর্ধর্ষ এক গেরিলা।
ক্র্যাকপ্লাটুনের হয়ে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ওড়াতে এসেছিলেন জুয়েল। পাকিস্তান সরকারের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থাপনা। মাথায় সব সময়ই ছিল মেজর খালেদ মোশাররফের সেই অমিয় বাণী—পরাধীন দেশ চায় তারুণ্যের বিশুদ্ধ রক্ত। জুয়েল যে দলটার সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন, সেই দলে ছিলেন শহীদজননী জাহানারা ইমামের ছেলে সাইফ ইমাম রুমী, ছিলেন বদিউজ্জামান, আলম, পুলু, সামাদ ও আজাদদের মতো ঢাকার দুর্ধর্ষ ছেলেরা। দলটার দায়িত্বই ছিল অতর্কিতে হামলা চালিয়ে নিরাপদে সরে যাওয়া। লক্ষ্য পাকিস্তানিদের মনোবলে চিড় ধরানো। ক্র্যাকপ্লাটুন যা করল, তাতে চিড় নয়, রীতিমতো ভাঙন ধরারই কথা। ফার্মগেটে আর্মি চেকপোস্ট, এলিফ্যান্ট রোড, যাত্রাবাড়ীর পাওয়ার স্টেশনেও হামলা হলো। মাত্র অল্প কয়েকজন সাহসী বীর যুবকই ওই সময় ঘুর হারাম করে দিয়েছিল পাকিস্তানি জান্তার।
আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়েছিল ক্র্যাকপ্লাটুন। সে অপারেশনে জুয়েল রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। উড়ে গিয়েছিল তাঁর হাতের আঙুল। রক্তাক্ত, আহত জুয়েল ব্যথায় কুঁকড়ে প্রথম যে কথাটা বলেছিলেন, সেটি ক্রিকেট নিয়ে—‘ভাই রে, আঙুল না থাকলে বাংলাদেশের হয়ে খেলব কী করে? কীভাবে ব্যাট ধরব?’
১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ক্র্যাকপ্লাটুনের অনেক সদস্যকে। এ দলে অনেকেই ছিলেন, ছিলেন রুমী, জুয়েল। এই অপারেশনেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সুরকার আলতাফ মাহমুদকে। নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরিতে রেখে অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়েছিল সবার ওপর। জুয়েলের হাতের বাকি আঙুলও কেটে ফেলা হয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি পাষণ্ডরা।
আগেই বলা হয়েছে, এ দেশের খেলাধুলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে আছেন জুয়েলই। দেশের জার্সিতে কখনো খেলেননি। কিন্তু তাতে কী হয়েছে। তাঁর আত্মত্যাগই যে পথ করে দিয়েছে খেলাধুলায় এ দেশের অনেক অর্জনের। তাঁর গ্রেনেড–বিস্ফোরিত রক্তাক্ত হাত কিংবা হায়েনাদের কেটে ফেলা আঙুলের বিনিময়েই যে সাকিব-তামিম-মুশফিকদের লাল-সবুজ জার্সি। কিংবা ওই গাঢ় সবুজ টেস্ট ক্যাপ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের লোগোয় যে বাঘের মুখটা আঁকা, সেটিই যে শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল।