ইরানে গিয়েছিল ইসমাইলসহ চার সদস্যের বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস দল।
ইরানে গিয়েছিল ইসমাইলসহ চার সদস্যের বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস দল। ছবি: সংগৃহীত

দেশের মাটিতে নিজের টাইমিং ঠিকঠাক বুঝতে পারেন না বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে দেশে বাকি সময় হাতঘড়িতেই টাইমিং হয়। অ্যাথলেটরা তাই জানেন না তাঁদের আসল টাইমিং।

আর সে কারণেই বিদেশে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গেলে ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা। ১৩ এপ্রিল ইরান থেকে যেমন ফিরলেন দেশের দ্রুততম মানব মোহাম্মদ ইসমাইল। অভিজ্ঞতা পূর্বসূরিদের মতোই। তাঁর আগের দ্রুততম মানবেরা দেশে ফিরে বলতেন, ‘নিজেকে চিনে এলাম।’ ইসমাইলও বলছেন একই কথা। ইরান থেকে তিনিও নিজেকে চিনে এলেন।

ইরান যাওয়ার আগে ২ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে হাতঘড়িতে ইসমাইলের টাইমিং হয়েছিল ১০.৫০ সে.। ইরানের মাসাদ শহরে ১১-১২ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ইমাম রেজা কাপ আমন্ত্রণমূলক অ্যাথলেটিকসে ইলেকট্রনিক বোর্ডে তাঁর টাইমিং ১০.৯১ সে.।

বিজ্ঞাপন
default-image

১০০ মিটারে মোট ৩৮ জন অ্যাথলেট দৌড়েছেন। ৮ দেশের ৮ জন উঠেছেন ফাইনালে, যার মধ্যে ছিলেন ইসমাইলও। ফাইনালে আটজনে তিনি হন অষ্টম। হিটে অবশ্য ১০.৯৪ টাইমিং করে দ্বিতীয় হয়েছিলেন ইসমাইল।

ইসমাইল হতাশ নন মোটেও। ইরান সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে গত চারটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার স্প্রিন্টজয়ী নৌবাহিনীর এই অ্যাথলেট প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইলেকট্রনিক বোর্ডে নিজের টাইমিং দেখে বোঝা যায় আমি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। আমার কতটুকু সামর্থ্য আছে বা কতটা এগোতে পারব, সেটাও বুঝতে পেরেছি। সব দেখে মনে হয়েছে, চীন-জাপান বাদে অন্য দেশের অ্যাথলেটদের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই আমি। উচ্চতা বলেন বা ফিটনেস—কোনো দিক দিয়েই নিজেকে পিছিয়ে রাখব না।’

কিন্তু এই যুগে ১০০ মিটারে ১০.৯১ টাইমিং কি আশাব্যঞ্জক কিছু? ইসমাইলের অবশ্য বিশ্বাস, উন্নত প্রশিক্ষণ পেলে টাইমিং ভালো করা সম্ভব। তাঁর কথা, ‘আমরা সারা বছর অনুশীলনের সুযোগ পাই না। ইরাকের যে অ্যাথলেট ইরানের এই প্রতিযোগিতায় সোনা জিতেছে, ওর টাইমিং ১০.৪৫ সে.। সারা বছরই ওরা উন্নত মানের অনুশীলন করে। অথচ ইরাকের অবস্থা আমাদের চেয়ে ভালো নয়। ওদের দেশে শান্তি নেই। তারপরও ১০.৪৫-এ ওরা দৌড়াতে পারে উন্নত অনুশীলনসুবিধা পায় বলেই।’

default-image

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কাঠমান্ডু এসএ গেমস ১০০ মিটারে ইসমাইল ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ে দৌড় শেষ করেন ১০.৭০ সে. সময় নিয়ে। তৃতীয় হওয়া অ্যাথলেটের টাইমিং ছিল ১০.৬৫ সে.। ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে খুব কাছাকাছি ছিলেন ইসমাইল। কিন্তু ইরানে সময় বাড়ল কেন? বাংলাদেশের দ্রুততম মানব বলছেন, ‘নেপালে আমি সম্ভাবনার আলো দেখিয়েছিলাম। কিন্তু এরপর বাংলাদেশ আমাকে গড়ে তোলেনি। নেপালের পর কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি। অবশ্য গত বছরটা গেল করোনায়। তা ছাড়া টুর্নামেন্টের জন্য আমন্ত্রণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য দেশের অ্যাথলেটরা অনুশীলনে নেমে পড়ে। আমরা সেটা পাই না। এখানেই আমাদের পিছিয়ে পড়া।’

বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকস অনেক বছর ধরেই মৃতপ্রায়। টাইমিং ভালো করার মতো উন্নত প্রশিক্ষণ নেই অ্যাথলেটদের জন্য। এটা ভেবেই বড় আক্ষেপ ২৯ বছর বয়সী ইসমাইলের, ‘যখন আমি বাইরের দেশে খেলতে যাই, তখন সবাই দেখে আমার টাইমিং কত হয়েছে। কিন্তু টাইমিং ভালো করার দায়িত্ব কি শুধুই আমার?’

প্রশ্ন করেই ইসমাইল বলছেন, ‘ফেডারেশনকে এ নিয়ে ভাবতে হবে। ইরান যেতে অনেক ভ্রমণ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। যেতেই লেগে যায় ২২ ঘণ্টা। সাড়ে ১৪ ঘণ্টা কাতারে ট্রানজিট ছিল। আমরা ক্লান্ত ছিলাম। ভ্রমণকষ্ট না হলে হয়তো আরেকটু ভালো হতো টাইমিং। ৪-৫-এ থাকতে পারতাম।’

বিজ্ঞাপন
default-image

ফেডারেশনের কাছে উন্নত প্রশিক্ষণের দাবি জানিয়ে দেশের দ্রুততম মানব বলেছেন, ‘ফেডারেশন ভালো অনুশীলনের ব্যবস্থা করলে আমরা কয়েকটি ইভেন্টে ভালো ফল করতে পারব।’ এ জন্য অন্তত টানা ছয় মাসের প্রশিক্ষণ চান ইসমাইল। বিদেশি কোচের অধীনে ভালো প্রশিক্ষণ পেলে সোনা না হোক, তিন-চারটি ইভেন্টে দ্বিতীয় বা তৃতীয় হতে পারে বাংলাদেশ, এমন বিশ্বাস কুমিল্লার তিতাস থানার কড়িকান্দি গ্রামের ছেলে ইসমাইলের, ‘১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট, ৪০০ মিটার দৌড়, হাইজাম্প এবং ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলেতে আমাদের সম্ভাবনা আছে। শর্ত একটাই, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দরকার।’

বাংলাদেশ গেমস খেলেই ৮-১০ দিনের মধ্যে আরেকটি প্রতিযোগিতায় খেলা কঠিন ছিল, বলেছেন ইসমাইল। তারপরও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। হাইজাম্পে মাহফুজুর রহমান বাংলাদেশ গেমসে ২.০৫ মিটার লাফিয়েছেন। ইরানেও একই উচ্চতায় লাফিয়ে ১০ জনে মাহফুজ হন ষষ্ঠ। আল আমিন ৬.৯৯ মিটার দূরত্ব লাফিয়ে লংজাম্পে ১২ জনে নবম। ইসমাইল লং জাম্পে প্রথম লাফের পর মাংসপেশিতে চোট লাগায় আর লাফ দেননি।

নৌবাহিনীর খরচে ইরানে গিয়েছিল ইসমাইলসহ চার সদস্যের বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস দল। কিন্তু সেখানে গিয়ে অ্যাথলেটরা পড়েন নানা সমস্যায়। কথা ছিল ইরানে স্থানীয় খরচ দেবে আয়োজকেরা। কিন্তু বিমানবন্দরে নেমেই করোনা পরীক্ষার জন্য ইসমাইলদের গুনতে হয় ১৩ ডলার করে। একই কারণে আসার সময় লেগেছে জনপ্রতি ২৫ ডলার। এমনকি হোটেল ওয়াই-ফাই খরচও নাকি দিতে হয়েছে তাঁদেরই। তারপরও সব ছাপিয়ে খেলার সুযোগ পাওয়াটাই বড় প্রাপ্তি ইসমাইলদের।

মন্তব্য করুন