বিশ্ব দাবার উদীয়মান তারকা আলীরেজা ফিরুজিয়া (বাঁয়ে) ইরানের পতাকার বদলে খেলছেন ফিদের পতাকা নিয়ে। ছবিতে ফিরুজিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ম্যাগনাস কার্লসেন।
বিশ্ব দাবার উদীয়মান তারকা আলীরেজা ফিরুজিয়া (বাঁয়ে) ইরানের পতাকার বদলে খেলছেন ফিদের পতাকা নিয়ে। ছবিতে ফিরুজিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ম্যাগনাস কার্লসেন।ফাইল ছবি

তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগটা বর্ণবাদের। জাতিভেদের। আন্তর্জাতিক দাবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিদের নীতিমালার সঙ্গে যা যায় না। সে কারণে ইরানের দাবা ফেডারেশনকে (আইসিএফ) আন্তর্জাতিক দাবা থেকে নিষিদ্ধ করতে চলেছে ফিদে।

ইরানের বিরুদ্ধে ফিদের অভিযোগ কী? যেকোনো টুর্নামেন্টে ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলা পড়লেই ইরানের খেলোয়াড়েরা আর খেলেন না। কখনো চোটের কারণ দেখিয়ে, কখনো-বা সরাসরিই খেলবেন না জানিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে সরে যান। অভিযোগ আছে, খেলোয়াড়েরা দেশের নেতাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনেক খেলোয়াড়ের না খেলার সিদ্ধান্ত ইরানে প্রশংসিতও হয়েছে।

আগামী ৬ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় ফিদের সাধারণ সভার জন্য এই সপ্তাহে যে অ্যাজেন্ডা ঠিক করা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, ফিদে ইরানের ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, যাতে ইসরায়েলিদের বিপক্ষে ইরানিদের ম্যাচগুলো হয়। সেখানে লেখা আছে, ‘আগামী সাধারণ সভার আগে ফিদের সব সদস্যদেশের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে নিজেদের খেলোয়াড়দের খেলতে যদি রাজি করাতে না পারে ইরানিয়ান দাবা ফেডারেশন অথবা এরপর যদি ইরানের কোনো খেলোয়াড় এভাবে টুর্নামেন্ট বয়কট করেন, সে ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ফিদের সব কর্মকাণ্ড থেকে ইরানের দাবা ফেডারেশনকে নিষিদ্ধ করা হবে।’

বিজ্ঞাপন
ইরানের ইসরায়েলিদের বর্জন করার এই নীতির ফল আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দিক থেকেও আসতে পারে, অলিম্পিক থেকেও নিষিদ্ধ হতে পারে ইরানীরা।

প্রস্তাবটা এসেছে ইংলিশ গ্র্যান্ডমাস্টার নাইজেল শর্ট ও ইংলিশ দাবা ফেডারেশনের প্রতিনিধি ম্যালকম পিনের কাছ থেকে। ২০১৮ সালে ফিদের সভাপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই ইংরেজ নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য একপাশে ঠেলে রেখে এই ইস্যুতে একজোট হয়েছেন।

গত জুনে ফিদে নিজেদের ওয়েবসাইটে বিবৃতি দিয়ে আইসিএফকে তিরস্কার করেছে। ফিদে সভাপতি আরকাদি দরকোভিচের সঙ্গে আইসিএফ কর্মকর্তাদের যে চিঠিপত্র দেওয়া-নেওয়া হয়েছিল, সেটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে ফিদে। সেখানে দেখা গেছে, দরকোভিচ আহ্বান জানিয়েছিলেন আইসিএফ যাতে ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের বয়কট করার ব্যাপারটা বন্ধ করে। কিন্তু দেশের প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর আইসিএফ প্রসঙ্গটাই এড়িয়ে গেছে। মাস কয়েক আগে চেস২৪ ওয়েবসাইটের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নাইজেল শর্ট বলেছিলেন, ইরানের ভাগ্য সুতোর ওপর ঝুলছে। ইরানের ইসরায়েলিদের বর্জন করার এই নীতির ফল আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দিক থেকেও আসতে পারে বলে জানান শর্ট।

ফিদে অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছে দাবাকে অলিম্পিকের অংশ করে নিতে। ইরানের এই নীতি সেই চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে বলেও জানান শর্ট। মজার ব্যাপার, এই শর্টই ২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইরানের জাতীয় দাবা দলের কোচ ছিলেন। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) ইরানের দিকে নজর রাখছে বলেও সাক্ষাৎকারে বলেছেন শর্ট, ‘এটা খেলাটাকে পরিষ্কারভাবে রাজনৈতিকীকরণ। (ইসরায়েলিদের বিপক্ষে না খেলায়) খেলোয়াড়দের পুরস্কৃতও করা হচ্ছে। এ সবকিছুই ফিদে ও আইওসির ভেদাভেদ না করার নীতির বিরুদ্ধে যায়।’

default-image

ইরানের এই ইসরায়েলি-বর্জন অনেক দিন ধরে হয়ে আসছে বোঝাতে শর্ট বললেন, ‘এটা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, এটা পুরোপুরি বর্ণবাদটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো। গত বছরে অন্তত ১২টি এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচের ক্ষেত্রে ইরানের খেলোয়াড়দের ম্যাচটা না খেলতে বা টুর্নামেন্ট থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আইওসি এসব দেখছে।’

শুধু দাবাই নয়, সব দিক থেকেই ইরানের ওপর চাপ বাড়ছে বলে জানালেন শর্ট, ‘ওরা (ইরান) জানে এটা শুধুই দাবার ব্যাপার নয়। আইওসির দিক থেকেও ওরা বহিষ্কার হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। আমরা ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছি যাতে ওরা (আইওসি ও ফিদের নিয়ম) মেনে চলে, না মানলে সেটার ফল ভোগ করতে হবে ওদের।’

বিজ্ঞাপন

ইরান কূটনৈতিকভাবেই ইসরায়েলকে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ১৯৮৩ সাল থেকেই সে কারণে নিজ দেশের অ্যাথলেটদের ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলতে নিষেধ করে আসছে ইরান। সে জন্য নিষেধাজ্ঞাও পেতে হয়েছে। ২০১৮ সালে ইরানের এক কুস্তিগির পরের রাউন্ডে ইসরায়েলি খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হতে হবে দেখে ইচ্ছা করেই ম্যাচ ছেড়ে দিয়েছিলেন, যে কারণে ওই খেলার সব টুর্নামেন্ট থেকে ইরানকে নিষিদ্ধ করা হয়।

ইরান কূটনৈতিকভাবেই ইসরায়েলকে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ১৯৮৩ সাল থেকেই সে কারণে নিজ দেশের অ্যাথলেটদের ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলতে নিষেধ করে আসছে ইরান।

দাবায় ইসরায়েলের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে না খেলেও ইরান এত দিন ঝামেলায় না পড়ার কারণ হিসেবে ভাবা হয়, এত বছর ধরে ফিদের কর্তাব্যক্তিরা টুর্নামেন্টের ড্র-য়ের ক্ষেত্রে ছাড় দিতেন। কিন্তু রাশিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী দরকোভিচের অধীনে ২০১৮ সালে ফিদের নতুন কমিটি আসার পর থেকে এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। টুর্নামেন্টের ড্র এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়। সে কারণে ইরানের খেলোয়াড়দের ইসরায়েলিদের বিপক্ষে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটছে বেশি। ইরানের জন্য আরও খারাপ দিক হচ্ছে, এমন সময়ে ইরান বিপাকে পড়েছে, যখন ইরানে বেশ কজন প্রতিভাবান দাবাড়ু উঠে আসছেন।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দুজন ইরানি দাবাড়ু স্পেনে এক টুর্নামেন্টে ইসরায়েলিদের বিপক্ষে খেলার কারণে বেশ বিপাকেও পড়েছেন। সাবেক জুনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পারহাম মাগসুদলু ও আমিন তাবাতাবেই পড়েছিলেন দুই ইসরায়েলি খেলোয়াড়ের বিপক্ষে। ম্যাচ দুটি খেলেছেন, দুজনই জিতেছেন। তাবাতাবেই তো পরে টুর্নামেন্টই জিতেছেন। কিন্তু কয়েক দিন পর যখন ইরানের নেতাদের কানে এ ঘটনা যায়, ইরানের দাবা ফেডারেশন দুই খেলোয়াড়কেই তিরস্কার করে।

ইরানের এই নীতি না মেনে খেলোয়াড়দের অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ইরানের উজ্জ্বলতম প্রতিভা যাকে মানা হয়, সেই আলীরেজা ফিরুজিয়া এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই বছরে ব্যান্টার ব্লিৎজ কাপে দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ম্যাগনাস কার্লসেনকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেন ফিরুজিয়া। ভবিষ্যৎ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভাবা হয় তাঁকে। কিন্তু ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে আর ইরানের পতাকা নিয়ে খেলেন না ফিরুজিয়া।

default-image

সে সময় বিশ্ব র‍্যাপিড অ্যান্ড ব্লিৎজ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলোয়াড়দের খেলতে দেয়নি ইরান। এর আগে জানুয়ারিতেও ইসরায়েলি খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলতে হবে বলে গ্রেঙ্কে চেস ওপেনে একটা ম্যাচ না খেলে চলে আসতে হয় ফিরুজিয়াকে। কিন্তু ডিসেম্বরে সে টুর্নামেন্টে ফিরুজিয়া খেলার জন্য ফ্রান্সে চলে যান, সেখান থেকে বিশেষ নিয়মে টুর্নামেন্টে নাম লেখান। সেখানে র‍্যাপিড টুর্নামেন্টে রুপা জেতেন, ব্লিৎজ টুর্নামেন্টে হেরে যান কার্লসেনের কাছে। ৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় ফিদের সাধারণ সভায় ফিরুজিয়াকে ইরানের বদলে ফিদের পতাকা নিয়ে খেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হবে।

ফিরুজিয়ার আগে ২০১৭ সালে তরুণ বরনা দেরাকশানি ইরানের কর্তৃপক্ষের কাছে নিষেধাজ্ঞা পেয়ে ইংল্যান্ডের পতাকা নিয়ে খেলার আবেদন করেন। সে আবেদন গৃহীতও হয়। ‘এ রকম আরও হবে’, বলেন নাইজেল শর্ট, ‘এটা হবেই। দিনে দিনে ব্যাপারটা আরও জটিল হচ্ছে, এটা শিগগিরই চলে যাবে না।’

মন্তব্য পড়ুন 0