default-image

কায়েমা খাতুনের হাতে এত শক্তি কোথা থেকে আসে, সেটা একটা প্রশ্ন। হয়তো জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত থেকেই পেয়েছেন তা। অভাব-অনটন তাঁকে শিখিয়েছে টিকে থাকার সংগ্রামে কীভাবে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়। একেকটি ঘুষিতে যেন প্রতিপক্ষকে নয়, নকআউট করতে চান ক্ষুধা আর দারিদ্র্যকেই!

সদ্য শেষ হওয়া বাংলাদেশ গেমস বক্সিংয়ে মেয়েদের ৪৮ কেজি ফ্লাইওয়েট শ্রেণিতে সোনা জিতেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বালিগ্রামের মেয়ে কায়েমা। তবে তাঁর সোনালি হাসির পেছনের গল্পটা আর দশজন সোনাজয়ীর মতো নয়। ১৮ বছর বয়সী কায়েমা ছোটবেলা থেকেই জীবনের বাঁকে বাঁকে দেখা পেয়েছেন অদৃশ্য প্রতিপক্ষের। মুষ্টি পাকিয়ে জিততে জিততেই এসেছেন আজকের বিজয়মঞ্চে। রিংয়ে নামলে ভয়ডর উধাও হয়ে যায় তাঁর। এবার সোনাজয়ের পথে জিতেছেন টানা চার ম্যাচ। তিনটিতেই নকআউট করেছেন প্রতিপক্ষকে।

কায়েমার বয়স যখন মাত্র তিন মাস, দাদির সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যা করেন তাঁর বাবা। বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পর মা সুমী বেগম আবার বিয়ে করেন। সৎবাবার সংসারে কায়েমার ঠাঁই হয়নি। বড় হয়েছেন নানি নূরজাহান বেগমের কাছে। এই নানিই তাঁর ‘বাবা-মা’।

নানি গৃহকর্মীর কাজ করেন, মামা নূরনবী নির্মাণশ্রমিক। মা তো থেকেও নেই! আর্থিক অনটন আর মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ-অভিমান নিয়েই বড় হয়েছেন কায়েমা। আনন্দ খুঁজে পেতেন শুধু খেলায়। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাহ নেয়ামতউল্লাহ কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী কায়েমার খেলাধুলায় হাতেখড়ি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। নবাবগঞ্জ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দৌড়, লাফে প্রথম হতেন। স্কুলের ক্রীড়াশিক্ষক নূর আলম আর কুমকুম বেগমের অনুপ্রেরণায় তাঁর খেলাধুলায় আসা।

default-image

শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই কায়েমার, ‘কুমকুম ম্যাডামকে আমি মা ডাকি। নূর স্যার আর ম্যাডামই আমাকে খেলার জগৎ চিনিয়েছেন।’ জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে আন্তস্কুল বার্ষিক ক্রীড়ায় কায়েমাকে নিয়মিত খেলাতেন এই দুই শিক্ষক। বক্সিংয়ের হাতেখড়িও নূরনবীর মাধ্যমে। কায়েমা বলছিলেন, ‘স্কুল থেকে একবার বক্সিংয়ের জন্য খেলোয়াড় বাছাই করা হয়। নূর স্যার বললেন, “তুই যেহেতু অ্যাথলেটিকসে ভালো, বক্সিংয়েও ভালো করবি।” কিন্তু নানি অনুমতি দিচ্ছিলেন না। আমার আগ্রহ দেখে স্যার নানিকে বোঝান।’

বিজ্ঞাপন

কায়েমা চাঁপাইনবাবগঞ্জ বক্সিং একাডেমির খেলোয়াড়। কিন্তু স্থানীয় বক্সিং রিংটি ভাঙাচোরা, ব্যবহারের অনুপযোগী। তাঁকে অনুশীলন করতে হয় স্থানীয় কলেজমাঠে। প্রয়োজনীয় অনুশীলন সরঞ্জাম অবশ্য সেখানেও নেই। হাতে প্যাড পরে কোচ রাজু আহমেদ দাঁড়িয়ে থাকেন সামনে, তাঁর হাতের ওপরই ঘুষি মেরে যান কায়েমা। আক্ষেপ করে কায়েমা বলছিলেন, ‘অনেক কষ্ট করে অনুশীলন করতে হয়। রাজু স্যারও অনেক সময় নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। নিজের আগ্রহে যতটুকু পারি করি।’

যে বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন, তাঁর চেহারা কায়েমার মনে থাকার কোনো কারণ নেই। দাদির কাছে বাবার ছবি চেয়েও পাননি কখনো। অন্য মেয়েরা যখন বাবার কাছ থেকে উপহার পায়, কায়েমা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তবে বাবাকে দেওয়ার মতো উপহার এখন আছে তাঁর হাতেই। প্রয়াত বাবাকেই যে উৎসর্গ করেছেন সোনার পদকটা, ‘বাবার চেহারা মনে নেই। তাঁর অভাব খুব অনুভব করি। সোনা জেতার পর রিংয়ে তাঁর জন্যই কেঁদেছিলাম। বাবা থাকলে নিশ্চয়ই অনেক খুশি হতেন।’

default-image

বাংলাদেশ গেমসের সাফল্য বদলে দিয়েছে কায়েমার স্বপ্নের রং। পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের হয়ে এসএ গেমসে সোনা জিততে চান তিনি। তবে সে জন্য প্রয়োজন অনুশীলনের ভালো সুযোগ–সুবিধা। সাফল্যের বাকি রসদটা তো তাঁর জীবন থেকেই পাওয়া! কায়েমা বলছিলেন, ‘রিংয়ে উঠলে শুধু মনে হয়, সামনে যে আছে, তাকে মারতে হবে। আমাকে জিততে হবে।’

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন