খেলার মানুষটাকেও হত্যা করতে বাধেনি পাকিস্তানিদের
‘এই মানুষটাকে কীভাবে হত্যা করল পাকিস্তানিরা?’
প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক কামরুজ্জামানের যেন ব্যাপারটা বিশ্বাস হয় না ৪৯ বছর পরে এসেও। একজন পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক, যাঁর ধ্যানজ্ঞান কেবলই খেলা। পেশার প্রতি অবিচল। সে সময়কার ইংরেজি দৈনিক অবজারভারের ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে পত্রিকাটির খেলার পাতার ভালো-মন্দই তাঁর ভাবনা। রাজনীতির সাতপাঁচে না থাকা সেই সাধাসিধে মানুষটিই কিনা প্রাণ হারালেন পাকিস্তানিদের নৃশংসতার কাছে!
তাঁর নাম শেখ আবদুল মান্নান। এস এ মান্নানও অনেকে বলতেন। তবে স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তিনি ‘লাডু ভাই’ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন, খেলাপাগল মানুষদের কাছে ছিলেন আপনজন। তিনি সেই সময় ক্রীড়া সাংবাদিকতা করতেন, যখন দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোয় খেলার খবরের গুরুত্ব ছিল খুবই নগণ্য। সম্পাদকেরা সে সময় ভাবতেও পারতেন না পত্রিকার পুরো একটা পাতা যে খেলার খবরের জন্য দেওয়া যায়। সেই সময় ইংরেজি দৈনিক অবজারভারে লাডু ভাই–ই সম্পাদনা করতেন খেলার গোটা একটা পাতা। তিনি অবজারভারের পাতায় লিখতেন খেলার আদ্যোপান্ত, সমালোচনা। আর খেলার জগতে পূর্ব পাকিস্তানি ক্রীড়াবিদদের প্রতি শোষণ আর বঞ্চনার কথা।
প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক কামরুজ্জামান ছিলেন লাডু ভাইয়ের সহকর্মী। তাঁর সাহচর্যের স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল তাঁর মানসপটে, ‘লাডু ভাই ছিলেন খুবই সুপুরুষ। কেতাদুরস্ত মানুষ। প্রতি বিকেলে ঢাকা স্টেডিয়ামে (এখনকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে) তাঁকে দেখা যেত। গভীর মনোযোগের সঙ্গে খেলা দেখছেন। হাতের ডায়েরিতে নোট নিচ্ছেন। তিনি সে সময় অবজারভারের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটির খেলার পাতা সে সময় দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। সেখানে লাডু ভাইয়ের লেখার একটা বড় ভূমিকা ছিল। তিনি খেলার বাইরের গল্পগুলো লিখতে পছন্দ করতেন। পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য নিয়ে সে সময় অনেক কিছুই লিখেছেন। খেলা ছাড়া যে মানুষটা কিছুই ভাবতেন না, তাঁকে কীভাবে পাকিস্তানিরা হত্যা করল, এটা আমি আজও ভেবে পাই না।’
ঠিক সহকর্মী না হলেও সাংবাদিক এস এ মান্নানকে কাছ থেকে দেখেছেন ক্রীড়া লেখক ও সাবেক জাতীয় কোচ জালাল আহমেদ চৌধুরী। তিনি স্বাধীনতার আগে একজন ক্রিকেটার হিসেবে দেখেছেন এস এ মান্নানের প্রভাব, ‘ইংরেজি পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে লাডু ভাইয়ের একটা প্রভাব ছিল। তিনি পত্রিকার পাতায় কোনো বিষয় নিয়ে লিখলে কর্তাব্যক্তিরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। খেলোয়াড়েরাও তাঁর লেখা প্রতিবেদনগুলো নিয়ে খুব তটস্থ থাকতেন। কোনো খেলোয়াড়ের খেলার প্রশংসা যদি তিনি করতেন, সেটা তাঁর কাছে অনেক বড় ব্যাপার ছিল।’
রাজনীতি নিয়ে এস এ মান্নান ভাবতেন না। কথাটা হয়তো ঠিক হলো না। তিনি তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতেন। পাকিস্তান আমলে এ দেশের ক্রীড়াজগৎকে সমতার আসনে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। রাজনৈতিক ভাবনা না থাকলে এমন ভাবনা হয়তো তাঁর আসত না। নির্বোধী ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবেই তিনি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু সেটি তিনি করেননি। অকপটে সত্য কথা বলার সাহস ছিল তাঁর। ছিল খেলা নিয়েও সাহসী সাংবাদিকতা করার মনের জোর। ক্ষুরধার লেখনী। তবে সত্য কথা বলার জন্য দাম যে নিজের জীবন দিয়ে মেটাতে হবে—এটা বোধ হয় ভাবতেও পারেননি তিনি।
এস এ মান্নানের পৈতৃক নিবাস ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার পার্ক সার্কাসে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের কয়েক বছর পর ঢাকায় চলে আসেন। কলকাতার ক্রীড়াজগতের রমরমা দেখে এসেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ঢাকা তথা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনও আলো ছড়াবে, অসংখ্য প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠবে। পাকিস্তান দলে আরও বেশি করে বাঙালি ক্রীড়াবিদেরা জায়গা করে নেবে। দেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসবে গৌরব। নিজের সাংবাদিকতা দিয়ে অন্যদেরও সেই স্বপ্নে বিভোর করতে চেয়েছিলেন।
এস এ মান্নানের সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন প্রখ্যাত ফুটবল ও হকি তারকা প্রতাপ শংকর হাজরা, ‘তিনি আন্তরিকতা নিয়েই এ দেশের খেলাধুলার উন্নতি চাইতেন। কিন্তু পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে পাকিস্তানিদের অবহেলা আর উপেক্ষা ছিল প্রচণ্ড পীড়াদায়ক। এটা মুখ বুজে তিনি সহ্য করতেন না। বিশেষ করে ফুটবলের স্বার্থরক্ষায় পাঞ্জাবি চক্রের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন মারমুখী। এ কারণেই হয়তো একাত্তরে পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করে। যদিও লাডু ভাই ছিলেন অজাতশত্রু একজন মানুষ। আমার জানামতে, বাঙালি কেউ তাঁর শত্রু ছিল না। কিন্তু সরলপ্রাণ এই মানুষটি একসময় পাঞ্জাবিদের শত্রু হয়ে যান।’
এস এ মান্নান সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর ‘আমার অগ্রজপ্রতিম’ রচনা থেকে। কামাল লোহানী লিখেছেন, ‘তিনি ছিলেন সবার প্রিয় “লাডু ভাই”। দীর্ঘদেহী, প্রশান্ত, সৌম্যদর্শন। তাঁর চলার ভেতর ছিল গাম্ভীর্য, যা সকলকে শ্রদ্ধাবনত করে দিত। ...তিনি যখন ধীর পদক্ষেপে অফিসে ঢুকতেন, তখন সবাই সহকর্মী হিসেবে তাকিয়ে থাকতাম। তিনি কখনো গম্ভীর হয়ে বসতেন। আবার কখনো প্রাণখোলা মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করতেন। তারপর কাজ শুরু করতেন।’ ‘রাতের পালায় কাজ করতে ক্লান্তি এলে মাঝেমধ্যে রসিকতা করতেও ছাড়তেন না। ...দারুণ রসবোধ ছিল তাঁর।’ (সূত্র: স্মৃতি: ১৯৭১, তৃতীয় খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৯০, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।
১৯৪৮ সালে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় দৈনিক আজাদের সহসম্পাদক হিসেবে। বাংলাদেশে আসার আগপর্যন্ত আজাদ পত্রিকার কলকাতা অফিসে কর্মরত ছিলেন। ১৯৫০ ও ৫১ সালে ফুটবল লিগের দ্বিতীয় বিভাগে দৈনিক আজাদের হয়ে খেলেছেন। জিমখানা ফুটবল লিগেও তিনি কিছুদিন খেলেছেন। এ ছাড়া জিমখানা রেসকোর্সেও যুক্ত ছিলেন। দৈনিক আজাদে দীর্ঘ ১৫ বছর কাজ করার পর পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় যোগ দেন। একাত্তরে এখানেই কর্মরত ছিলেন।
ক্রীড়া সাংবাদিকদের মাঠের মানুষ হতে হবে, নিয়মিত খেলা দেখতে হবে, সারা দুনিয়ার খেলার খবর রাখতে হবে—এটা ছিল তাঁর নীতি। ক্রীড়া সম্পাদক হয়েও প্রতিটি বিকেল কাটাতেন স্টেডিয়ামপাড়ায়। লিগ, টুর্নামেন্টের খেলাগুলো দেখতেন। খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁদের সুবিধা-অসুবিধা জানতেন। খেলোয়াড়েরাও যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে বর্তে যেত।
সে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত এক ব্যক্তি। এ ব্যাপারে লিখেছেন প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসা প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘আমার বেলা যে যায়’ বইয়ে, ‘আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না লাডু ভাইয়ের। তাঁকে একটি ইংরেজি পত্রিকার স্পোর্টস এডিটর করা হচ্ছে, এটা অনেকেরই মনঃপূত হয়নি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আড্ডা মারার সময় কথাবার্তা বলে আমার মনে হয়েছে, ডিগ্রি না থাকলেও ইংরেজি তিনি জানেন। কারণ, প্রচুর পড়াশোনা করতেন। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যা, খেলার জগতের খবরাখবর ও জ্ঞান ছিল তাঁর অনেক।’
এই মানুষটিকেই ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের কোনো একসময় পুরানা পল্টনের নিজের ফ্ল্যাট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। অকৃতদার মানুষটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। তাঁকে অপহরণ করেছিল ওই রাজাকার, আলবদররা। যুদ্ধোন্মাদ ওই পাষণ্ডদের হাতেই চিরদিনের জন্য হারিয়ে যান খেলাপাগল সেই মানুষটি।