গোল্ডেন স্টেট ওয়ারিয়র্সের বাস্কেটবল খেলোয়াড় স্টিফেন কারির গত মৌসুমের বেতন ৩০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ইউএস ডলার। বিশ্বের অন্যতম সেরা লিগ এনবিএর আরেক খেলোয়াড় লেব্রন জেমস গত মৌসুমে পেয়েছেন ২৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার নয়, তবে বাস্কেটবল খেলে কিছু আয় করেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরাও। ব্যতিক্রম ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ধূমকেতু ক্লাবের খেলোয়াড়েরা। ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফেডারেশন আয়োজিত সব কটি লিগ ও টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও ধূমকেতুর খেলোয়াড়েরা ক্লাবের কাছ থেকে কখনোই কোনো পারিশ্রমিক নেন না।

ডালপুরির দোকান থেকে শীর্ষ লিগে

১৯৮৬ সালের ঘটনা। বকশীবাজারের একটি ডালপুরির দোকানে আড্ডা দিতেন একদল বাস্কেটবল খেলোয়াড়, যাঁদের বেশির ভাগই নটর ডেম কলেজের ছাত্র। ওই সময়ের খেলোয়াড় আবদুল গাফফার, তানভির আহমেদ, মোহাম্মদ ইউসুফেরা মিলে একটা দল গড়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পছন্দের নাম খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ধূমকেতু নামটা পছন্দ হয়। গল্পটা বললেন ক্লাবের বর্তমান সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আবদুল গাফফার, ‘আমরা বাস্কেটবল খেলতাম বুয়েটের কোর্টে। প্রথম বিভাগের দল গড়তে চাইলাম। কিন্তু নাম ঠিক করতে পারছিলাম না। ওই বছর আকাশে হ্যালির ধূমকেতু দেখা যায়। সবাই প্রস্তাব করি, ক্লাবের নাম হবে ধূমকেতু।’

ক্লাব নয়, যেন পরিবার

সেন্ট যোসেফ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র শামসুল ইয়াসিন বলেন, ‘ধূমকেতু আমাদের বড় ভাইদের ক্লাব। যাঁদের কাছে খেলা শেখা, তাঁদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিতে মন টানে না। এটা প্রজন্ম-পরম্পরায় চলে আসছে। বড় ভাইয়েরাও কখনো পারিশ্রমিক নেননি। আমরাও নিই না।’ শেখ আবদুল্লাহ চার বছর ধরে ধূমকেতু ক্লাবে খেলছেন। ক্লাবটিকে নিজের পরিবারের মতোই মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র। তিনি জানান, পরিবারের কাছ থেকে কেউ কখনো টাকা নেয় না।

বিজ্ঞাপন

অন্য ক্লাবের প্রস্তাবেও না

দেশের বাস্কেটবলে ‘এ’ শ্রেণির একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পান ২ লাখ টাকা। ‘বি’ শ্রেণির খেলোয়াড়েরা ৫০ হাজার-১ লাখ টাকা পর্যন্ত। ধূমকেতুর খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স দেখে অনেকেই তাঁদের ক্লাবে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ধূমকেতুর জার্সি পরার পর কেউ অন্য ক্লাবে খেলতে চান না। গাফফার সে কথাই বলছিলেন, ‘ক্লাবের ৩৪ বছরের ইতিহাসে আমাদের কেউ অন্য ক্লাবে খেলেনি।’

বড় ভাইয়েরাই পৃষ্ঠপোষক

এক মৌসুম লিগে দল পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা খরচ হয় ধূমকেতু ক্লাবের। অন্য দলগুলো বিদেশি খেলোয়াড় নিলেও ধূমকেতুর সবাই দেশি। বিনা পারিশ্রমিকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বাস্কেটবল কোচ মিজানুর রহমান অনুশীলন করান খেলোয়াড়দের। তিনিও ক্লাবের সদস্য। জার্সি, বল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বড় ভাইয়েরা দেন বলে জানান গাফফার, ‘নিজেদের খরচে খেলতাম আমরা। একসময় আমরা খেলা ছেড়ে দিলাম। ভেবেছিলাম ক্লাবটাও বন্ধ করে দেব। কিন্তু তত দিনে আরেক ব্যাচ এসে যায়। ওরা বলত, “আমরা ক্লাবটা চালিয়ে নিতে চাই। ” তত দিনে আমরাও বিভিন্ন চাকরি ও ব্যবসায় ঢুকে পড়ি। তখন থেকে আমরাই খরচ দিয়ে যাচ্ছি।’

স্বপ্ন থেমে নেই ধূমকেতুর

ধূমকেতু ২০০০ সালে প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০০৩ ও ২০১০ সালে রানার্সআপ। ফেডারেশন কাপ ও অন্যান্য ঘরোয়া টুর্নামেন্টেও নিয়মিত সাফল্য আসছে। ৩৪ বছর আগে আকাশে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গিয়েছিল হ্যালির ধূমকেতু। কিন্তু দেশের বাস্কেটবলের আকাশে ধূমকেতু ক্লাব টিকে থাকতে চায় আরও বহুদিন।

মন্তব্য পড়ুন 0