বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

অলিম্পিকে ভারতের হয়ে ইতিহাস গড়েন জ্যাভেলিন থ্রোয়ার নীরজ। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্টে প্রথম ব্যক্তিগত সোনার পদক জেতে ভারত তাঁর হাত ধরেই। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে শুটার অভিনব বিন্দ্রার সোনা জেতার পর এটাই ভারতের অলিম্পিকে কোনো ব্যক্তিগত সোনার পদক।

এবার চোখ ফেরানো যাক, বাংলাদেশের দিকে। ৩৬ বছর ধরে প্রতিটি অলিম্পিক গেমসে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের বিব্রত ও লজ্জার একটা রেকর্ড রয়েছে অলিম্পিকে। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল একটি দেশ হয়েও যাদের একটিও অলিম্পিক পদক নেই। অথচ মাত্র ৬৪ হাজার জনসংখ্যার দেশ বারমুডাও টোকিও অলিম্পিকে সোনা জিতেছে মেয়েদের ট্রায়াথলনে। এমনকি সবচেয়ে ছোট দেশ সান মারিনোও ট্র্যাপ শুটিংয়ে ব্রোঞ্জ জিতেছে এবার।

ক্রীড়া আসরের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর অলিম্পিক। সেখানে পদক জেতার স্বপ্ন দেখার আগে নজর বোলানো যাক, আর কোন কোন গেমসে অংশ নেয় বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ান গেমস (এসএ গেমস), এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস—তিনটি গেমসে নিয়মিতই বাংলাদেশের প্রতিনিধি থাকে। কিন্তু যেখানে এসএ গেমসেই বাংলাদেশ নিজেদের সেরাটা দিয়ে সোনা জিততে পারে না বেশির ভাগ খেলায়, সেখানে অলিম্পিক তো অনেক দূরের পথ।

default-image

ঠিক একটা নির্দিষ্ট কারণে যে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা পিছিয়ে রয়েছেন, সেটা বলা যাবে না। অ্যাথলেট কোচ রফিক উল্লাহ আখতার যেমন অনেকগুলো কারণ তুলে ধরলেন, ‘সবার আগে প্রয়োজন একটা সুষ্ঠু ক্রীড়ানীতি, যেটা আমাদের দেশে একেবারে নেই। ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক শক্তির দৌরাত্ম্য বেশি। দেশের আনাচকানাচে লুকানো প্রতিভাগুলো তুলে আনার উদ্যোগ নেই। আন্তস্কুল ও আন্তবিশ্ববিদ্যালয়ের খেলাধুলার চর্চাটা কমে গেছে। জেলা ক্রীড়া সংস্থায় পদাধিকার বলে রয়েছেন জেলা প্রশাসক সভাপতি। ক্রীড়ানুরাগী সভাপতি পাওয়া এ দেশে ভাগ্যের ব্যাপার। তাই আগের মতো জেলাগুলো থেকে খেলোয়াড় বের হচ্ছে কম। আর সবকিছুর প্রভাব পড়ছে পুরো খেলায়।’

আন্তর্জাতিকমানের ক্রীড়া অবকাঠামোর অভাব: অলিম্পিকে সাফল্য পাওয়ার পূর্বশর্তই হচ্ছে একটি বিশ্বমানের ক্রীড়া অবকাঠামো থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা অনুশীলনের জন্য সেই সুবিধা খুব কমই পেয়ে থাকেন। নিজেদের একটা আধুনিক জিমনেসিয়াম নেই বলে এসএ গেমসে সোনাজয়ী ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার প্রায়ই আফসোস করেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও এই দেশে নেই একটা ভেলোড্রাম। অথচ সাইক্লিং অলিম্পিকের একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলা! ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড নিয়ে অভিযোগ জানাতে জানাতে ক্লান্ত সাঁতারুরা। এখনো বাংলাদেশে জাতীয় অ্যাথলেটিকসের আয়োজন করা হয় ঘাসের মাঠে, ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে স্প্রিন্টারদের টাইমিং জানার সুযোগ থাকে কম।

default-image

নেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

ভারতের অলিম্পিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে সে দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম নামের এই পরিকল্পনার আওতায় একটা প্রকল্প শুরু করেছে ভারত সরকার ২০১৪ সাল থেকে। সম্ভাবনাময় অ্যাথলেটদের বাছাই করে দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রত্যেককে দেওয়া হচ্ছে মাসিক বড় অঙ্কের বৃত্তি। ‘খেলো ইন্ডিয়া’ নামে প্রকল্পের বাজেটেও সে দেশের সরকার বরাদ্দ বাড়িয়েছে। কিন্তু উল্টো চিত্রই বলা যায় বাংলাদেশে। শুধু গেমস শুরুর আগে নামকা ওয়াস্তে একটা অনুশীলন ক্যাম্প শুরু করে ফেডারেশনগুলো। অথচ ২০১০ সালে বছরব্যাপী ক্যাম্প করানোয় সেবার ঢাকা এসএ গেমসে ১৮টি সোনার পদক জেতে বাংলাদেশ।

অথচ আগের বার ২০০৬ কলম্বো এসএ গেমসে বাংলাদেশ জিতেছিল মাত্র ৩টি সোনা! কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের যে বিকল্প নেই, সেটা মানলেন এসএ গেমসে সোনাজয়ী সাঁতারু মাহফুজা খাতুন, ‘কথায় আছে, যে যেমন পরিশ্রম করবে, সে তেমন ফল পাবে। আমাদের খেলোয়াড়দের বেলায় এটা একটু বেশিই প্রযোজ্য। ভালো মানের কোচ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন করলে ফল যেমনই আসুক না কেন, টাইমিংয়ের উন্নতি তো হবেই। তা ছাড়া বাছাই থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পের বিকল্প নেই। তখন আমাদের পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, খাওয়াদাওয়া—সবকিছু একটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসে। দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের কারণেই ভারতে দুটি সোনা জিততে পেরেছিলাম আমি।’

default-image

সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের পরিচর্যা নেই
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম বড় সমস্যা প্রতিভাবান অ্যাথলেটদের পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যাওয়া। ২০০২ ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে সোনাজয়ী শুটার আসিফ হোসেন খান যার বড় উদাহরণ। এই আসিফই ম্যানচেস্টারে ভারতের অভিনব বিন্দ্রাকে হারিয়ে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে সোনা জেতেন। বিন্দ্রা এরপর ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন, আসিফ হারিয়ে গেছেন। এই তো ২০১৯ জাতীয় অ্যাথলেটিকসে রেকর্ড গড়ে হাইজাম্পে সোনা জেতেন ঋতু আক্তার। তিনি ১.৭০ মিটার লাফিয়েছিলেন জাতীয় অ্যাথলেটিকসে!

অথচ কাঠমান্ডুতে গত এসএ গেমসে যুগ্মভাবে রুপাজয়ী ভারতের রুবিনা যাদব ও শ্রীলঙ্কার দুলাঞ্জলী রানাসিংহে লাফিয়েছিলেন ঋতুর চেয়ে কম। ১.৬৯ মিটার! অথচ ঋতুকে নিয়ে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কোনো পরিকল্পনাই চোখে পড়েনি এই দুই বছরে। আর সম্ভাবনাময় অ্যাথলেটদের পরিচর্যা নেই বলেই ২০০৬ সালের কলম্বো এসএ গেমসের পর থেকে অ্যাথলেটিকসে কোনো সোনা জিততে পারেনি বাংলাদেশ। কলম্বোতে এসএ গেমসে ১১০ মিটার হার্ডলসে সোনাজয়ী মাহফুজুর রহমান ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পালিয়ে গিয়েছিলেন ইতালিতে।

নজর দিতে হবে সরকারকেই

ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটে ক্রীড়া খাতে বরাদ্দের পরিমাণ যেখানে বেড়েই চলেছে, সেখানে বাংলাদেশের সর্বশেষ বাজেটে ৩৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ কমিয়েছে সরকার। অথচ ক্রীড়াঙ্গনকে অবহেলার চোখে না দেখে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উচিত আরও বেশি বাজেট বাড়ানো। ফেডারেশনগুলোর কাছে আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চাওয়া। কিন্তু বিগত সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন, ওবায়দুল কাদের, ফজলুর রহমান, আহাদ আলী সরকার, বীরেন শিকদাররা দেশের ক্রীড়াঙ্গনে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন আর সংস্কারের দিকেই বেশি বেশি নজর দিয়েছেন। ভারতের মতো একটা দীর্ঘমেয়াদি অলিম্পিক ভিশনও যদি থাকত, তাহলে এত দিনে অন্তত এশিয়ান গেমসে পদক জেতার স্বপ্ন দেখতেই পারত বাংলাদেশ।

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন