default-image

এ যেন সিনেমার গল্প! অ্যাথলেট ইমতিয়াজ হোসেনের পাঁচ বছরের ছোট ক্যারিয়ারে কত কিছুই না ঘটে গেল! বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর সংস্থাটিকে উপহার দিয়েছেন অধরা সোনার পদক। ডাক পেয়েছেন জাতীয় দলে। দেশের হয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য গেছেন চীনে। ইরানে খেলেছেন এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে। এরপর মাদক নেওয়ার দায়ে চাকরিচ্যুত, যেতে হয় জেলে। ভাবছেন, এখানেই গল্প শেষ ইমতিয়াজের? না, তা নয়।

জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর ইমতিয়াজ আবারও ফিরেছেন অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে। গত তিন বছরের লড়াইয়ে একটু একটু করে চেষ্টা করেছেন নিজের হারানো জায়গাটা ফিরে পাওয়ার। এবারের ৪৪তম জাতীয় অ্যাথলেটিকসে সোনা জয়ের পর তাই বলছিলেন, ‘এভাবেও যে ফিরে আসা যায়, সেটা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই সবাইকে বোঝাতে চাই।’

বিজ্ঞাপন
default-image

ইমতিয়াজের ইভেন্ট শটপুট। এই একটা মাত্র ইভেন্টেই সব সময় অংশ নিচ্ছেন তিনি। নোয়াখালীর যুবক এবার সোনা জিতেছেন ১৪.১৪ মিটার দূরত্বে শটপুট নিক্ষেপ করে। শটপুটে ২০১৯ সালে জাতীয় রেকর্ড গড়ে সোনা জেতেন নৌবাহিনীর মোহাম্মদ ইব্রাহিম। সেই ইব্রাহিমকে হারিয়ে এবার ইমতিয়াজ জিতেছেন সোনা।

ইমতিয়াজকে আবিষ্কার করেন কোচ রফিকউল্যা আখতার। ইমতিয়াজের বাবা দেলোয়ার হোসেনের বন্ধু অ্যাথলেটিকসের এই কোচ। শারীরিক গড়ন ও উচ্চতা দেখে ইমতিয়াজকে জাতীয় জুনিয়র মিটে শটপুট ও ডিসকাস থ্রোয়ে খেলার সুযোগ দেন। এরপর খেলার সুবাদেই ২০০৬ সালে বিমানবাহিনীতে চাকরি হয়ে যায় ইমতিয়াজের।

জাতীয় অ্যাথলেটিকসে কখনো চ্যাম্পিয়ন হয়নি বিমানবাহিনী। গত এক দশকে সব সময় পয়েন্ট তালিকার তলানিতেই দেখা গেছে তাদের। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিমানবাহিনীর কোনো অ্যাথলেটই সোনা জেতেননি। ২০১৬ সালে ইমতিয়াজ শটপুটে খেলতে নেমেই জেতেন সোনা। ২০১৭ সালেও ধরে রাখেন সোনার পদক। নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই এসএ গেমসের জাতীয় দলের আবাসিক ক্যাম্পে সুযোগ পান।

default-image

এরপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইমতিয়াজকে চীনে পাঠায় অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। খেলতে যান ইরানে এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে। কিন্তু সেই ইমতিয়াজই ২০১৮ সালে মাদক নেওয়ার অপরাধে চাকরিচ্যুত হন বিমানবাহিনী থেকে। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে।

কারাগারে থাকায় ২০১৮ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিকসে অংশ নিতে পারেননি। ওই আসরেও কোনো পদক পায়নি বিমানবাহিনী। ছাড়া পেয়ে ২০১৯ সালে ইমতিয়াজ জাতীয় অ্যাথলেটিকসে অংশ নেন আনসারের হয়ে। অনুশীলন ছাড়া খেলেই জেতেন ব্রোঞ্জ। গত বছর চট্টগ্রাম এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে জেতেন রুপা। প্রতিবছরই খেলার উন্নতি হয়েছে ইমতিয়াজের। এবার তো সোনা জিতে সবাইকে তাকই লাগিয়ে দিয়েছেন! কারণ, করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে তিনি ছিলেন শয্যাশায়ী। সেভাবে তাই অনুশীলনও করতে পারেননি।

ইমতিয়াজ বর্তমানে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলের জিমনেসিয়ামে ইনস্ট্রাক্টর পদে চাকরি করছেন। কিন্তু চাকরিটা স্থায়ী নয়। পুলিশের হয়ে চুক্তিভিত্তিক খেলেছেন এবারের জাতীয় অ্যাথলেটিকসে।

বিজ্ঞাপন
default-image

নিজের খারাপ সময়ের কথা ভুলে যেতে চান ইমতিয়াজ, ‘মাদকের নেশা কতটা সর্বনাশা, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এক বছর খেলতে পারিনি বলে খুব কষ্ট পেয়েছি। ওই সময়গুলো ছিল আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময়। এরপর নিজেকে সংশোধন করে নিয়েছি। এখন আমি মাদককে মনেপ্রাণে ঘৃণা করি।’

৩১ বছর বয়সী যুবক আবারও নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে ফিরতে চান জাতীয় দলের ক্যাম্পে, ‘বাংলাদেশ গেমসে নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়তে চাই। এসএ গেমসে অন্তত ব্রোঞ্জ জিততে পারি, সেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে চাই। জাতীয় দলে ফিরতে যা যা করার, সবই করব।’

কিন্তু পদক জিততে হলে তো আগে ভালোভাবে অনুশীলন করতে হবে। সেই সুযোগই যে মেলে না চাকরিতে ব্যস্ত থাকার কারণে! এমনিতেই মাত্র ১৬ হাজার টাকা বেতনে সংসার চলে না। এর ওপর চাকরিটাও স্থায়ী হয়নি। মায়ের হৃদ্‌রোগের সমস্যা। সব মিলিয়ে একটা সংকটের মধ্য দিয়েই কাটছে ইমতিয়াজের জীবন, ‘এত অল্প বেতনে সংসার চলে না। তবু কষ্ট করে চলছি। আবারও একটা ভালো চাকরি পেলে হয়তো জীবনের মোড় বদলে ফেলতে পারতাম।’

ইমতিয়াজের কোনো কোচ নেই। কাজ শেষে রাতের বেলা নিজের শটপুটটি মোটরসাইকেলে বেঁধে অনুশীলনের জন্য চলে আসেন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। কখনো চলে যান আর্মি স্টেডিয়ামে বা বিশ্বরোডের পাশের ফাঁকা জায়গায়। যে বাজে নেশায় জড়িয়ে জীবনটা নষ্ট করতে বসেছিলেন, সেই নেশা ছেড়ে শটপুটের নেশাতেই মজে আছেন ইমতিয়াজ। শটপুট খেলেই একদিন বিশ্বমানচিত্রে তুলে ধরতে চান বাংলাদেশের পতাকা।

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন