অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর ইস্পাতকঠিন মনোবল দেখিয়ে ফিরে এসেছেন রিকাকো।
অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর ইস্পাতকঠিন মনোবল দেখিয়ে ফিরে এসেছেন রিকাকো। ছবি: এএফপি

২০২০ টোকিও অলিম্পিকের ভাগ্য এখন রজ্জু পথে দোদুল্যমান। এক বছর পিছিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর মনে হয় কারও জানা নেই। আয়োজক দেশ এবং অলিম্পিকের আয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা চাইছেন, অলিম্পিক যেন আর পিছিয়ে দিতে না হয়। কারণ, তাঁদের ভালোভাবে জানা আছে, দ্বিতীয়বারের মতো পিছিয়ে দিতে হলে অলিম্পিকের আয়োজন পুরোটাই হয়তো ভন্ডুল হয়ে যেতে পারে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত আকাশ ছুঁয়ে যেতে পারে লোকসানের হিসাব।

অন্যদিকে অলিম্পিকের স্বপ্ন দেখে আসা ক্রীড়াবিদেরা চোখ বন্ধ রেখে এই প্রার্থনা করে চলেছেন যে দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাওয়া মানুষের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক যেন তাঁদের প্রতি সদয় হন। কারণ, তাঁদেরও জানা আছে, দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে গ্রহণ করা প্রস্তুতির শেষে অলিম্পিকের আয়োজন এবার না হওয়ার অর্থ অনেকের জন্যই হয়তো খেলোয়াড়ি জীবনের সমাপ্তি। খেলাধুলার পারদর্শিতা ধরে রাখা অনেকটাই নির্ভর করে বয়সের ওপর। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতার জগতে প্রতিনিয়ত নতুন ক্রীড়াবিদের আগমনে সেখানে বেশি দিন রাজত্ব করে যাওয়া কারও জন্যই সম্ভব নয়। ফলে অলিম্পিক একবার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার অর্থ হতে পারে খ্যাতি আর প্রাপ্তির কাছে এসেও শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরে যাওয়া।

এই দ্বিতীয় দলে আছেন জাপানের এক তরুণী সাঁতারু। অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর ইস্পাতকঠিন মনোবল প্রায় অসম্ভব এক বাধা পার হয়ে যেতে তাঁকে সাহায্য করলেও শেষ পর্যন্ত অলিম্পিকে অংশ নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে কি না, এর অনেকটাই এখন ভাগ্যের সুতায় ঝুলে আছে। তবে তিনি এখনো আশা ছেড়ে দেননি এবং অসম্ভবকে জয় করে এতটা পথ এগিয়ে যাওয়ার পর এখন আমরা সবাই প্রার্থনা করতেই পারি, তাঁর জন্য হলেও যেন টোকিও অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

রিকাকো ইকের আন্তর্জাতিক সাঁতারের সার্কিটে পদার্পণ বলা যায় ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সেই অলিম্পিকে যোগ দিয়ে মেয়েদের ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে হয়েছিলেন পঞ্চম। এর দুই বছর পর জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের সাঁতারে ছয়টি সোনার পদক জিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন এবং তখন থেকে অনেকেই অপেক্ষায় ছিলেন ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে আর নতুন কোন চমক দেখান।

জাকার্তা থেকে ফিরে এসে নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ চলছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে নিজের ফর্ম আরও উন্নত করে নেওয়া হচ্ছিল। তবে দুর্ভাগ্যের কালো ছায়া যে নিঃশব্দে তাঁর পিছু নিয়েছিল, কেউই তা আঁচ করতে পারেননি। সবাই ধরে নিয়েছিলেন, ২০২০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়স হতে যাওয়া এই বিস্ময় জাগানো তরুণী নতুন চমক দেখিয়ে দেশবাসীকে মাতিয়ে রাখবেন। তবে ভাগ্য তো সব সময় মানুষের ইচ্ছার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে না!

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন হঠাৎই এক টুইটার বার্তায় রিকাকো তাঁর ভক্তদের জানান, লিউকেমিয়ার উপস্থিতি ধরা পড়েছে শরীরে। এর পরের কাহিনি অনেক কষ্টের আর মন ভেঙে দেওয়ার। মাত্র ২০ বছর বয়সী একজন, যিনি কিনা মাত্র আলোড়ন তুলতে শুরু করেছেন, তাঁর এ রকম এক জটিল অসুখে আক্রান্ত হওয়ার খবর ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো।

default-image

রিকাকো নিজেও কতটা শোকাহত হয়েছিলেন, এর প্রমাণ মেলে সেই সময়ে দেওয়া কিছু টুইট বার্তায়, ‘যতটা আমি ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক কঠিন হচ্ছে এটা, দশ গুণ বেশি কঠিন, শত গুণ বেশি, হাজার গুণ বেশি।’ কিংবা ‘তিন দিনের বেশি হয়ে গেল আমি কিছুই খাইনি। তবে হাল ছেড়ে দিতে আমি অস্বীকার করছি।’

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সেই দিন থেকে বছরের একেবারে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে কাটাতে হয় তাঁকে। ক্যানসারের চিকিৎসা সহজ কোনো চিকিৎসা নয়। রোগের বিস্তার প্রতিহত করা গেলেও নানা রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেহে দেখা দেয়, যা কিনা প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দেয় রোগীর শারীরিক অবস্থা। অন্যদিকে মানসিক চাপ তো আছেই। সে রকম অবস্থায় এক বালিকার উচ্চারিত প্রত্যয় জাপানে অনেক মানুষকেই আপ্লুত করেছিল। সবাই রিকাকোর দ্রুত রোগমুক্তি কামনা করে প্রার্থনা করে গেছেন।

খেলার জগৎ চাকচিক্যময় হলেও অন্যদিকে সেটা হচ্ছে অনেক অর্থেই মানবিক গুণাবলিবঞ্চিত এক জগৎ। খেলার মান পড়ে যাওয়া কাউকে এই জগৎ জায়গা দিতে নারাজ। রাজি নয় সে দুর্বলের পৃষ্ঠপোষকতা করতে। রিকাকো যখন গৌরবের শীর্ষে অবস্থান করছিলেন, স্পনসররা অনেকেই হাত বাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই মানুষেরই অসুস্থ হয়ে পড়া এদের ক্রমে দূরে সরিয়ে নেয়। রিকাকোর স্পনসরদের মধ্যে ছিল খেলাধুলার পোশাক ও সরঞ্জাম তৈরির জাপানি ব্র্যান্ড কোম্পানি মিজুনো।

অসুস্থতার খবর শুনে মিজুনোর কর্তাব্যক্তিরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন এই ভেবে যে কোম্পানির প্রতিচ্ছবির মুখ হিসেবে রিকাকোর উপস্থিতি ধরে রাখা এখন থেকে আর যুক্তিসংগত হবে কি না। কোম্পানির এক কর্মকর্তা একদিন হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে রিকাকোকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁদের কী করা উচিত। রিকাকো সেদিন বলেছিলেন, ‘দয়া করে বিজ্ঞাপন থেকে আমাকে সরিয়ে দেবেন না। আমি ফিরে আসব, এই প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন
default-image

সেই প্রতিশ্রুতি রিকাকো রেখেছেন। ১০ মাস হাসপাতালে কঠিন চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া রিকাকোর শুরুতে মনে হয়েছিল, তাঁর দেহে যেন আর কোনোরকম শক্তি অবশিষ্ট নেই। তারপরও আশা ছেড়ে দেননি। একসময় ধীরে আবার সুইমিং পুলে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। সেটা ছিল ৪০৬ দিনের বিরতির পর আবার তাঁর সুইমিং পুলে সাঁতার কাঁটা। নতুন করে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর প্রশিক্ষণের সময় বাড়িয়ে দেন। ২০২০ সালের আগস্টে ১৯ মাসের বিরতি শেষে আবার সাঁতারের প্রতিযোগিতায় নাম লেখান।

এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে মেয়েদের ৫০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে আবারও জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। এরপর গত সপ্তাহে জাপানের জাতীয় সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে মেয়েদের ১০০ মিটার বাটারফ্লাই বিভাগে প্রথম স্থান দখল করার মধ্য দিয়ে বিলম্বিত ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে নিজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নিয়েছেন জাপানের এই বিস্ময়বালিকা।

রিকাকো ইকের ক্যানসারকে পরাজিত করে গভীর মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এই গল্প আমাদের বলে দিচ্ছে, চাইলে অসম্ভবকে অতিক্রম করে যাওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব। রিকাকো ফিরে এসেছেন। যে কথা মিজুনোর কর্মকর্তাদের দিয়েছিলেন, সেই কথা রেখেছেন। এখন বাকি অংশটুকু থাকছে ভাগ্যের হাতে। করোনার বাধা অতিক্রম করে অলিম্পিকের আয়োজন সম্ভব হলে অলিম্পিক পদকও হয়তো তাঁর হাতের মুঠোয় চলে আসবে। ফলে রিকাকোর জন্য এই অশ্রুভেজা শুভকামনা থাকছে, অলিম্পিক যেন অনুষ্ঠিত হতে পারে, অন্তত ক্যানসারকে জয় করে আবার আগের জীবনে ফিরে আসা এক তরুণীর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য হলেও সেটা দরকার।

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন