রুশদের কাছে হারের পর অলিম্পিকে রুশদের খেলা নিয়েই প্রশ্ন আমেরিকান-ব্রিটিশদের

সাঁতারে ছেলেদের ২০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে সোনা জিতেছেন রুশ সাঁতারু এভজেনি রাইলভছবি: রয়টার্স

মেয়েদের রোয়িংয়ে পঞ্চম হওয়ার পর গত পরশু যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ার মেগান কালমোই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। গতকাল একই কথা আবার যুক্তরাষ্ট্রের আরেক অ্যাথলেটের মুখে। এবার সাঁতারে রাশিয়ার এভজেনি রাইলভের কাছে হেরে রুপা জেতার পর কথাটা বললেন যুক্তরাষ্ট্রের সাঁতারু রায়ান মারফি। তাঁর পেছনে থেকে সাঁতারে ব্রোঞ্জ জেতা ব্রিটিশ অ্যাথলেট লুক গ্রিনব্যাকও প্রশ্নটা তুললেন একই সুরে।

প্রশ্ন রুশ অ্যাথলেটদের টোকিও অলিম্পিকে খেলা নিয়ে। রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে ডোপিংয়ের দায়ে রাশিয়া অলিম্পিকে নিষিদ্ধ। কিন্তু ডোপিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত নন, এমন রুশ অ্যাথলেটদের ঠিকই খেলার সুযোগ হচ্ছে অলিম্পিকে। তবে রাশিয়ার পতাকা বা নাম নিয়ে নয়, তাঁরা খেলছেন রুশ অলিম্পিক কমিটি (আরওসি) নামে। শীত ও গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক মিলিয়ে এ নিয়ে টানা তৃতীয় অলিম্পিকে রুশ অ্যাথলেটদের এভাবে খেলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

৩০টি খেলায় এবার সব মিলিয়ে ৩০০ জনের মতো রুশ অ্যাথলেট অংশ নিচ্ছেন টোকিওতে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১০টি সোনাসহ ৩৪টি পদক জিতে পদকের তালিকায় চার নম্বরে ছিল আরওসি। কিন্তু টোকিও অলিম্পিকে গত দুই দিনে রুশ অ্যাথলেটদের কাছে পদকের লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আমেরিকান-ব্রিটিশ অ্যাথলেটরা।

রাশিয়া নিষিদ্ধ, সে হিসেবে অন্য নাম নিয়ে হলেও রুশ অ্যাথলেটদের খেলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা। টোকিওতে যাওয়া রুশ অ্যাথলেটদের ঘিরে ডোপিংয়ের অভিযোগও তুলেছেন!

সাঁতারে ছেলেদের ২০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে সোনাজয়ী রাশিয়ার এভজেনি রাইলভের সঙ্গে রুপাজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের রায়ান মারফি (বাঁয়ে) ও ব্রোঞ্জ জেতা ব্রিটিশ অ্যাথলেট লুক গ্রিনব্যাক (ডানে)
ছবি: রয়টার্স

রাশিয়া নিষিদ্ধ বলে রুশ অ্যাথলেটরা কোনো পদক জিতলে পদকমঞ্চে রাশিয়ার পতাকা দেখা যায় না, বাজে না রাশিয়ার জাতীয় সংগীত। কিন্তু আরওসি নাম নিয়েই বা রুশ অ্যাথলেটদের খেলা নিয়ে গত পরশু প্রশ্ন তুলেছিলেন মেগান কালমোই। রোয়িংয়ে নিজেদের ইভেন্টে পঞ্চম হয় যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে জুটির অংশ ছিলেন কালমোই। সে ইভেন্টে রুপা জিতেছেন রুশ অ্যাথলেট ভাসিলিয়া স্তেপানোভা ও এলেনা ওরিয়াবিনসকাইয়া। এরপর কালমোই বলে বসেন, ‘যাঁর কি না এখানে থাকারই কথা নয়, তাঁকে রুপা জিততে দেখে খুবই জঘন্য লাগছে।’

এরপর কাল রায়ান মারফি প্রসঙ্গটাকে আরেক দফা এগিয়ে নিলেন। জানালেন তাঁর সন্দেহের কথা—রুশ সাঁতারুরা পারফরম্যান্সবর্ধক নিষিদ্ধ ড্রাগ নিয়ে টোকিওতে নামছেন! ছেলেদের ২০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে শুক্রবার রাশিয়ার এভজেনি রাইলভ অলিম্পিক রেকর্ড গড়ে সোনা জেতেন, ২০১৬ রিও অলিম্পিকে এই ইভেন্টে সোনা জেতা মারফি এবার জিতেছেন রুপা।

সরাসরি রাইলভকে নিয়ে সন্দেহের কথা অবশ্য জানাননি মারফি। তবে সাঁতারে ডোপিং হচ্ছে বলে তাঁর সন্দেহ আছে কি না—এমন প্রশ্নে মারফির উত্তর, ‘আমার মাথায় ১৫টা ভাবনা চলছে, এর ১৩টাই জনসমক্ষে এলে আমি ঝামেলায় পড়ব। পুলে আমি এমন একটা লড়াইয়ে নামছি, যেটা হয়তো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়—বছরজুড়েই এই ভাবনা মানসিকভাবে আমাকে ভুগিয়েছে।’

মেয়েদের জুটিবদ্ধ রোয়িংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেগান কালমোই ও ট্রেসি এইসার
ছবি: রয়টার্স

রাইলভের দিকে আঙুল তুলছেন না বোঝাতে পরে আবার বললেন, ‘আমার মন্তব্যটা ব্যাখ্যা করা উচিত। এখানে কোনো অভিযোগ তোলা আমার উদ্দেশ্য নয়। দেখুন, লুক (ব্রোঞ্জজয়ী ব্রিটিশ সাঁতারু লুক গ্রিনব্যাক) ও এভজেনিকে (রাইলভ) অভিনন্দন জানাই আমি। দারুণ সাঁতরেছে ওরা, দুজনই দারুণ প্রতিভাবান সাঁতারু। কিন্তু দিন শেষে...আমার বিশ্বাস ডোপিং সাঁতারে এখনো অনেক ভালোভাবেই আছে।’ তাঁর পরের কথাটা পুরোপুরি রাশিয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে, ‘একটা দেশের অনুমোদনে ডোপিং স্কিম চলছে, এটা জানলেই তো হতাশা ঘিরে ধরে।’

সোনাজয়ী রুশ সাঁতারু রাইলভ অবশ্য নিজেকে ‘স্বচ্ছ’ দাবি করেছেন, ‘আমি সব সময়ই স্বচ্ছ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পক্ষে। আমি (ডোপ) টেস্ট করিয়েছি, সব ফর্ম পূরণ করেছি। স্বচ্ছ খেলাই চাই আমি। পুরোটা জীবন এই খেলাটার পেছনে লেগে আছি।’ মারফির কথায়ও কিছু মনে করেন না রাইলভ, ‘রায়ান যেভাবে ভাবছে, যা বলছে, সেভাবে ভাবার বা বলার অধিকার ওর আছে। ও আমার বিরুদ্ধে তো কিছু নিয়ে অভিযোগ তোলেনি, সে কারণে ওর কথায় আমি কিছু মনে করছি না।’

সাঁতারে ব্রোঞ্জজয়ী লুকা গ্রিনব্যাকও অবশ্য রুশদের ডোপিংয়ে যুক্ত থাকা নিয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছেন, ‘আপনি যাঁর বিপক্ষে পুলে লড়ছেন, তিনি স্বচ্ছ কি না এটা না জেনেই পুলে নামা অবশ্যই অনেক কঠিন একটা ব্যাপার। রাশিয়ান ফেডারেশনের অলিম্পিকে আসা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক কথাই তো হচ্ছে। রাষ্ট্র অনুমোদিত একটা ডোপিং প্রোগ্রাম চলছে, এটার বিরুদ্ধে আরও কাজ করা যেত—এটা শুনতে পাওয়া একজন অ্যাথলেটের জন্য অনেক হতাশার।’

টোকিওর গরম আর নিজের পারফরম্যান্সে ঘাটতির পর মেদভেদেভের বিরক্তির কারণ হলো ডোপিং নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: রয়টার্স

তবে রুশদের ডোপিং ঘিরে সন্দেহ নিয়ে প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছেন রুশ টেনিস তারকা দানিল মেদভেদেভ। টোকিওতে রুশ অ্যাথলেটরা ‘প্রতারকদের চিহ্ন’ বয়ে বেড়াচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নে দুই দিন আগে খেপে গিয়ে মেদভেদেভের উত্তর, ‘জীবনে এই প্রথমবার আমি একটা প্রশ্নের উত্তর দেব না। (সাংবাদিকের উদ্দেশে) আপনার নিজেকে নিয়ে লজ্জা হওয়া উচিত। আপনাকে আর কখনো দেখতে চাই না আমি।’

রুশ অলিম্পিক কমিটিও গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের সাঁতারু মারফির মন্তব্যের পর কড়া ভাষায় জবাব দিয়ে টুইট করেছে। রুশ অ্যাথলেটরা টোকিওতে ‘যোগ্যতার বলেই আছেন’ জানিয়ে টুইটে আরওসি লিখেছে, ‘কেউ সেটা (রুশদের অলিম্পিকে খেলা) পছন্দ করুক বা না-ই করুক! হেরে গেলে হারটা মেনে নেওয়া শিখতে হয়, কিন্তু সবাই সেটা জানে না। রাশিয়ান ডোপিং নিয়ে পুরোনো হার্ডি-গার্ডি (এক ধরনের সংগীত) নতুন করে আবার বাজতে শুরু করেছে। কেউ একজন খুব দায়িত্ব নিয়ে কাজটা করছে।’

এ নিয়ে টানা তৃতীয় অলিম্পিকে রুশ অ্যাথলেটরা এভাবে খেলছেন। ২০১৪ সোচি অলিম্পিকের পর রুশদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে ডোপিংয়ের অভিযোগ ওঠে। ২০১৬ সালে এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে লেখা ছিল, চার বছর ধরে রুশ অ্যাথলেটরা এভাবে পারফরম্যান্সবর্ধক অবৈধ ড্রাগ নিয়ে আসছেন! এরপর ২০১৬ রিও অলিম্পিকে রাশিয়ার ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড অ্যাথলেটদের খেলা নিষিদ্ধ থাকে, অন্য খেলাগুলোতে অবশ্য ‘রাশিয়া’ নামের অধীনে না থেকেই খেলেছেন অ্যাথলেটরা। ২০১৮ পিয়ংচ্যাং শীতকালীন অলিম্পিকেও ডোপিংয়ের অভিযোগ নেই, এমন রুশ অ্যাথলেটদের ‘অলিম্পিক অ্যাথলেটস ফ্রম রাশিয়া’ নামে খেলতে দেওয়া হয়।

এবার টোকিওতে রুশ অ্যাথলেটরা এসেছেন ‘আরওসি’ নাম নিয়ে। কিন্তু নাম বদলালেও পুরস্কার জিতলেই তাঁদের দিকে ডোপিংয়ে সন্দেহের তির উঠছে!