১৯০৪ অলিম্পিকে আলবার্ট কোরের অংশ নেওয়ার ছবি এবং তার পদক।
১৯০৪ অলিম্পিকে আলবার্ট কোরের অংশ নেওয়ার ছবি এবং তার পদক।ফাইল ছবি: এএফপি

ফ্রান্স কি নতুন এক অলিম্পিক পদকজয়ী পাবে? তিনি অলিম্পিক পদক জিতেছিলেন ১১৭ বছর আগে!

আলবার্ট কোরের এই গল্প নিয়ে সিনেমা হতে পারে। ক্রীড়া-সাহিত্যিকেরা চাইলে সিনেমার মতো তাঁর জীবনের গল্প নিয়ে বই-ও লিখতে পারেন। লোকটি মারা গেছেন ৯৫ বছর হয়ে গেল। কিন্তু এমন এক জীবন কাটিয়ে গেছেন, যার কিছু অংশ নিয়ে আজও আলোচনা, যুক্তি-তর্ক চলছে। কোরের পদক দুটি তাহলে কার—ফ্রান্সের না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের?

জন্মস্থান বিবেচনা করলে ফ্রান্সের, কিন্তু ১১৭ বছর আগে অনুষ্ঠিত হওয়া সেন্ট লুইস অলিম্পিকে কোরের নামের পাশে দেশ হিসেবে লেখা হয় যুক্তরাষ্ট্রের নাম। সেটি চিরস্থায়ী হিসেবে বসে গেলেও মানুষ তো হাল ছাড়ার পাত্র নয়।

শখের এক ঐতিহাসিক, ইঞ্জিনিয়ার ও কাউন্সিলর কোরেকে ১৯০৪ অলিম্পিকে ফ্রান্সের জাতীয়তা দিতে উঠে পড়ে লাগেন। তাঁর যুক্তি, কোরের জন্ম ফ্রান্সের কোট ডি’অর অঞ্চলের মাঁসোতে, পদক তো তাহলে ফ্রান্সেরই!

বিজ্ঞাপন

ঘটনাটা খুলে বলা যাক। সেটা ছিল আধুনিক অলিম্পিকের তৃতীয় আসর। শুরুতে শিকাগোয় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা গড়ায় মিসোরির সেন্ট লুইসে। সেখানে দুটি রুপার পদক জেতেন কোরে। ৩ ঘণ্টা ৩৪ মিনিটে ম্যারাথন দৌড় শেষ করে দ্বিতীয় হন এবং ৪ মাইলের দলীয় দৌড়েও একই ফল পান।

কিন্তু পদক দেওয়ার সময় আয়োজকেরা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এই ভুলটা সংশোধনে উঠেপড়ে লাগেন মাঁসোর স্থানীয় অপেশাদার ঐতিহাসিক ক্লেঁম গেন্টি। তাঁর কাছে একটি সাদাকালো ছবি আছে ১৯০৪ অলিম্পিকের। অপেশাদার অ্যাথলেটদের মতো শারীরিক গড়নের কোরে হাতাবিহীন গেঞ্জি, শর্টস ও ফিতাওয়ালা জুতো পরে সেই অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছেন—এই ছবিটা সংবাদ সংস্থা এএফপিকে দেখিয়েছেন ক্লেঁম গেন্ট।

default-image

ওয়াইন তৈরির জন্য বিখ্যাত ফ্রান্সের বার্গোন্ডি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত মাঁসো। ওয়াইন তৈরি করা এক পরিবারে ১৮৭৮ সালে জন্ম কোরের। সে বছর আঙুরের রোগ ফাইলোক্সেরা প্রথমবারের মতো মাঁসোর সব বাগানের সর্বনাশ করে দেয়। ভীষণ অর্থকষ্টে পতিত হওয়ায় মাঁসো ছেড়ে ১৮৯৬ সালে পরিবার নিয়ে প্যারিসে চলে যান আলবার্ট কোরের বাবা এতিয়েনে কোরে।

১৮ বছর বয়সে আলবার্ট কোরে যোগ দেন ফরাসি সেনাবাহিনীর অষ্টম পদাতিক ব্যাটালিয়নে। চার বছর সেনাবাহিনীতে থাকতে কোরে আবিষ্কার করেন দূরপাল্লার দৌড়ে নিজের সামর্থ্য। ১৮৯৯ সালে ১৬০ কিলোমিটার দৌড়ানোর রেকর্ড ভাঙেন কোরে।

কিন্তু ১৯০৩ সালে কাউকে কোনো কিছু না বলেই উধাও হয়ে যান এই অ্যাথলেট। বছরখানেক পর তাঁর দেখা মেলে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয়, এক কসাইখানায় চাকরি জুটিয়ে নিয়েছেন। কোরের মূল গল্পটা এরপর। ক্লেঁম গেন্টের ভাষায়, ‘খুব সুন্দর গল্প। সংবাদপত্রে তাঁর সমন্ধে জানার পর গবেষণা শুরু করি।’

অ্যাথলেট হয়েও ভাঙা ভাঙা ইংরেজির কারণে স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে শুরুতে সহজে মিশতে পারেননি কোরে। ১৯০৫ সালে ওয়াশিংটন টাইমস তাঁর সমন্ধে লিখেছিল, ‘বাস্তবিক অর্থেই একজন ভবঘুরে।’ সে যাই হোক যুক্তরাষ্ট্রে এবার অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হবে জানার পর কোরে সবাইকে বলেছিলেন, ১৯০০ সালে তিনি প্যারিস ম্যারাথনে দৌড়েছেন।

১৮৯৬ সালে যাত্রা শুরু করা প্যারিস ম্যারাথন তখন সেভাবে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন না করলেও কোরে বোঝাতে সক্ষম হন, প্রতিযোগিতাটি অলিম্পিকে দৌড়ানোর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাতে কাজও হলো। শিকাগোর ফার্স্ট রেজিমেন্ট অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে সেন্ট লুইস অলিম্পিকে পা রাখেন কোরে।

বিজ্ঞাপন

খরচ ও ভ্রমণ ভীষণ কঠিন হওয়ায় তখন উত্তর আমেরিকা মহাদেশের বাইরে থেকে অলিম্পিকে অংশ নেওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। খুব কম-ই আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, এর মধ্যে একমাত্র ফরাসি হিসেবে ছিলেন কোরে।

তবু যুক্তরাষ্ট্রের কেন—সে বিষয়টি এএফপিকে ব্যাখ্যা করেন গেন্ট, ‘সে আমেরিকান ক্লাবের একজন ছিল। সে সময়ের আইন অনুযায়ী তাঁকে আমেরিকানই বলা হয়েছে।’

এই অলিম্পিকেই প্রথমবারের মতো সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জের পদক চালু করা হয়।
সেন্ট লুইস অলিম্পিক ভীষণ গরমের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর ম্যারাথন দৌড় গড়িয়েছিল আগস্টের শেষ দিকে পাহাড়ি অঞ্চলে। তখন এই দৌড়ের সঠিক দূরত্বও ঠিক হয়নি, ৪০ কিলোমিটার ঠিক করা হয়েছিল।

default-image

গোটা পথে পানি খাওয়ার বিরতি মাত্র একবার। অংশ নেওয়ার ৩২ জন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে অর্ধেকের বেশিসংখ্যক দৌড় শেষ করতে পারেননি। অন্যদিকে কোরে বলেছিলেন ‘আমি আরও এক ল্যাপ দিতে পারব।’

তৃতীয় হয়ে দৌড় শেষ করেছিলেন কোরে। কিন্তু প্রথম হওয়া ফ্রেড লোর্জ অযোগ্য ঘোষিত হন, কারণ দৌড়ের সময় তিনি চুরি করে কারের সাহায্য নিয়েছিলেন। সোনার পদক পান ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া আমেরিকান থমাস হিকস।

অবশ্য এখনকার নিয়ম হলে তিনিও অযোগ্য ঘোষিত হতেন। নিষিদ্ধ অ্যালকালয়েড স্ট্রাইচিন ব্র্যান্ডির সঙ্গে মিশিয়ে দৌড়ের সময় পান করেছিলেন হিকস। সে ক্ষেত্রে প্রথম হতেন কোরে, কিন্তু ব্রোঞ্জজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৩ মিনিট আগে দৌড় শেষ করা কোরেকে দ্বিতীয় হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

অলিম্পিকের ঐতিহাসিকেরা কোরেকে ফরাসি হিসেবে চিহ্নিত করলেও রেকর্ড বইয়ে তিনি আমেরিকান। এমনকি আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিও (আইওসি) তা পাল্টাতে রাজি নয়।

সংস্থাটির প্রেস অফিস থেকে এএফপিকে বলা হয়েছে, ‘যে দেশের হয়ে তিনি পদক জিতেছেন তা পাল্টানোর প্রশ্নই ওঠে না।’ ১৯০৮ লন্ডন অলিম্পিকে কোনো পদক জিততে পারেননি কোরে। এর মধ্যে তিনি ফ্রান্সের হয়ে অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার অনুরোধ নাকচ করে দেন যুক্তরাষ্ট্রকে মাথায় রেখে।

সে বছর শিকাগো ম্যারাথন জেতেন কোরে। পরের বছর গাড়ি দুর্ঘটনায় বড় চোট পাওয়ার পর নিজের সেই পুরোনো ঝলক আর দেখাতে পারেননি এই অ্যাথলেট। ফ্রান্সে ফিরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ১৯২৬ সালে মারা যান কোরে, অনেকে বলেন ‘খুনি’টা যক্ষ্মা।

১৯০৪ সেন্ট লুইস অলিম্পিকে কোরেকে মার্কিন হিসেবে চিহ্নিত করার একটি কারণও ব্যাখ্যা করেন গেন্ট, ‘সে সময় অ্যাথলেটের জাতীয়তা কেউ পাত্তা দেয়নি। অংশ নেওয়া অ্যাথলেটের ক্লাব কোন দেশের সেটা প্রাধান্য দেওয়া হতো।’

গেন্ট তবু দাবি তোলার পর গত ২৫ জানুয়ারি এক চিঠিতে বিষয়টি মেনে নেয় অলিম্পিক স্টাডি সেন্টার (আইওসির অংশ), ‘এটা দুর্ভাগ্যজনক যে তিনি যে দেশের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন বলে সবাই জানেন, সেটা ভুল। তবে এ কথা সত্য যে ১৯০৪ অলিম্পিকে একমাত্র ফরাসি হিসেবে অংশ নিয়ে পদক জিতেছিলেন কোরে।’

ফ্রান্স ১৯০৪ অলিম্পিকে কোনো পদক জিততে পারেনি। গেন্টের দাবি মেনে কোরেকে ফ্রান্সের ঘোষণা করলে সেই অলিম্পিকেও পদক টেবিলে দেশটির নাম থাকত। তবে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে তেমন কিছু হলেও কোরের পদকগুলো ফ্রান্স পাবে না।

default-image

১৯০৪ অলিম্পিকে তাঁর নামের পাশে সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাই থাকবে। কারণ, এটা শুধু একজন পদকজয়ীর বিষয় নয়। দেশগুলোর পদক জয়ের হিসাব ও ক্রম-তালিকাও তাহলে ওলট–পালট করতে হবে।

অলিম্পিক ও প্যারা-অলিম্পিকের মিনিস্ট্রিয়াল ডেলিগেটসদের একজন থিয়েরি টেরেট বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন, ‘এখন সেটি সংশোধন করার অর্থ হলো, সেই অলিম্পিকের যে তালিকা আমরা দেখে এসেছি সেটি পাল্টে যাবে।’

তা যাক, কিন্তু কোরের জন্মস্থান তো কেউ পাল্টাতে পারবে না!

বিজ্ঞাপন
অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন