বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

দৌড়ানোর ট্র্যাকের পাশেই ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকার বুদ্ধি এঁটেছিলেন রোগোশেস্কে। দৌড় শুরু হওয়া মাত্র ঝোপঝাড় থেকে বের হয়ে দৌড়বিদদের দঙ্গলে মিশে যাবেন—ভ্যালেরি রোগোশেস্কের এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। সেবার ম্যারাথন শুরুর দুই সপ্তাহ আগে বোস্টন অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন মেয়েদের আনুষ্ঠানিকভাবে দৌড়ানোর অনুমতি দেয়। প্রথমবারের মতো আটজন নারী এই প্রতিযোগিতায় নাম নিবন্ধন করেন, যাঁদের মধ্যে ভ্যালেরি রোগোশেস্কেও ছিলেন।

এই এপ্রিলেই অনুষ্ঠিত সে দৌড়ে ৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন নিনা কুসিক। তবে রোগোশেস্কের মহিমা অন্য জায়গায়। সেই ম্যারাথন দৌড়ের ৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপনে এবারের বোস্টন ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন ৭৫ বছর বয়সী রোগোশেস্কে, তাঁর দুই কন্যা ও এক নিকট আত্মীয়ও দৌড়েছেন। সোমবার শুরু হওয়া ১২৪ বছরের পুরোনো এই ২৬.২ মাইল দৌড় প্রতিযোগিতায় রোগোশেস্কে যে অন্য মাত্রার সংযোজন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘বোস্টন এইট’ নামে পরিচিত সেই আট নারীর মধ্যে পাঁচজন থাকবেন এবারের প্রতিযোগিতায় নারীদের অংশ নেওয়ার ৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপনে, তবে দৌড়েছেন শুধু রোগোশেস্কে।

যে দৌড় প্রতিযোগিতা শুরুর পর ৭৬ বছর নারীরা অংশ নিতে পারেনি, সে প্রতিযোগিতায়ই প্রথমবার অংশ নেওয়া কোনো নারীদের মধ্যে কেউ এবার দৌড়েছেন, যেখানে এখন নারী প্রতিযোগীর সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি। ভাবা যায়!

default-image

রোগোশেস্কে মনেপ্রাণে দৌড়বিদ বলেই হয়তো পেরেছেন। বোস্টন ম্যারাথনে নারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নেওয়ার ২৫ বছর পূর্তিতেও তিনি এই প্রতিযোগিতায় দৌড়েছেন, ‘প্রথম বছর আমরা যে আটজন দৌড়েছিলাম, তখন আমি ২৫ বছর বয়সী। ২৫ বছর পূর্তিতে যখন ফিরলাম তখন আমার বয়স ৫০ বছর। যদিও অর্ধেক পথ পর্যন্ত গিয়ে আর পারিনি। এবার ৭৫ বছর বয়সে দৌড় শেষ করতে চাই।’ এই ৫০ বছরে মেয়েদের ম্যারাথন কতটা এগিয়েছে, তা নিয়েও বললেন রোগোশেস্কে, ‘৫০ বছর আগের কথা যদি ভাবি, মেয়েরা তখন ম্যারাথনে দৌড়াতে পারত না। এখন আমাদের কন্যারা বড় হচ্ছে হাইস্কুল ও কলেজ থেকেই এসব সুযোগ নিয়ে। এই ৫০ বছরে যদি ফিরে তাকাই, আমার মতে, আমরা অনেক দূর এসেছি আসলে। ১৯৭২ সালে সব মিলিয়ে দৌড়বিদ ছিল ১২০০। ৮ জন নারী থেকে এখন সংখ্যাটা ১৪০০।’

অথচ ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো দৌড়ানোর আমন্ত্রণ পাওয়ার পর একটু হতাশই হয়েছিলেন রোগোশেস্কে, ‘বলতে লজ্জা লাগছে, দৌড়ানোর আমন্ত্রণ পাওয়ার পর একটু হতাশই হয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকব, দৌড় শুরুর পর তাতে অংশ নেব। নিনা কুসিক, ক্যাথরিন সুইৎজার, সারা মায়ে বেরমানরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে। আমার যোগ দিতে একটু দেরি হলেও সুযোগটা ঠিকই পেয়েছিলাম।’

রোগোশেস্কে ঝোপঝাড় থেকে হুট করে বেরিয়ে ছেলেদের দৌড়ে অংশ নেওয়ার প্রেরণা ছিলেন ববি গিব। ১৯৬৬ সালে প্রথম নারী হিসেবে আনঅফিশিয়ালি বোস্টন ম্যারাথনে দৌড়ান এই নারী। সে সময় তাঁকে বলা হয়েছিল, ‘নারীরা ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম না।’ তাকে অফিশিয়ালি দৌড়াতে দেওয়া হয়নি। ববি গিবও পাত্তা দেননি। দৌড়ের স্টার্টিং লাইন শুরু হওয়ার পাশেই ঝোপে লুকিয়ে ছিলেন। প্রায় অর্ধেকসংখ্যক দৌড়বিদ দৌড় শুরুর পর যোগ দেন ববি গিব।

নারীরা দৌড়ানোর ছাড়পত্র পেয়ে যাওয়ায় ববি গিবের মতো আর হতে পারেননি রোগোশেস্কে। দৌড়ের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য পান জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে। প্রস্তুতির সুবিধার্থে রোগোশেস্কেকে কিছু বইপত্র জোগাড় করে দেন তাঁর স্বামী। এর আগে ম্যারাথনে দৌড়েছেন, এমন কিছু বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে পরামর্শও পান। ৪ ঘণ্টা ২৯ সেকেন্ডে ৩২ মিনিট সময় নিয়ে সেই দৌড়ে ষষ্ঠ হয়েছিলেন রোগোশেস্কে। তবে এই টাইমিংয়ের চেয়ে তাঁর বড় প্রাপ্তি ছিল দৌড়ে ওয়েলসলি কলেজ পার হওয়ার সময় সেখানকার ছাত্রীরা চিৎকার করে তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন, ‘এগিয়ে যাও বোন, এগিয়ে যাও!’

১৯৯৭ সালে হাঁটুর চোট নিয়ে বোস্টন ম্যারাথনে নারীদের অংশ নেওয়ার ২৫ বছর পূর্তিতে দৌড় শেষ করতে পারেননি রোগোশেস্কে। তবে ওয়েলসলি কলেজ পেরিয়ে গিয়ে থেমেছেন। কে জানে, হয়তো সেই সমর্থন তাঁকে থামতে দেয়নি, ‘২৫ বছর পর এখানে ফিরে ওয়েলসলি কলেজ পার হয়ে থেমেছিলাম। তখন সবাইকে দেখে নিজের মেয়ের বয়সী মনে হয়েছে। এ বছর আবারও জায়গাটা দৌড়ে পার হতে চাই, তখন সবাইকে দেখে নিশ্চয়ই নাতনির বয়সী মনে হবে।’

এই বয়সেও ম্যারাথনে দৌড়ানোর জন্য আলাদা একটি পদ্ধতি অবলম্বন করছেন রোগোশেস্কে। ১৯৭২ সালের অলিম্পিয়ান জেফ গ্যালওয়ে ‘রান ওয়াক রান’ নামের এই পদ্ধতি বের করেন। গোটা দৌড়ে তিনি ৩০ সেকেন্ড পরপর দৌড়াবেন এবং হাঁটবেন। ছয় মাস ধরে এই পদ্ধতিতে নিজেকে ঘষামাজা করে ২১ মাইল পর্যন্ত দৌড়েছেন রোগোশেস্কে।

এই না হলে দৌড়বিদ!

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন