সোনিয়া আক্তার
সোনিয়া আক্তারছবি: শামসুল হক
পুলে নেমে সোনা জেতা তাঁর অভ্যাস। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসেও জিতেছেন ৮টি সোনা। সোনার সংখ্যার বিচারে গেমসের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার কথা সাঁতারু সোনিয়া আক্তারেরই। কিন্তু এত যে সোনার পদক জিতলেন, এই সাফল্য কতটা বদল আনবে ঝিনাইদহের এই তরুণীর জীবনে? কাল টেলিফোনে স্বর্ণকন্যা সোনিয়ার কণ্ঠে হতাশার সুরই শোনা গেল বেশি—

বাংলাদেশ গেমসে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন। কেমন লাগছে?

সোনিয়া আক্তার: খুবই ভালো। এবারের গেমসে আমি ব্যক্তিগত ইভেন্টে ৫টি সোনা জিতেছি। রিলেতে জিতেছি ৩টি সোনা ও ৩টি রুপা। ব্যক্তিগত সোনাগুলো এসেছে ৪০০, ৮০০ মিটার ফ্রিস্টাইল, ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডল, ২০০ মিটার বাটারফ্লাই ও ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে। এই সাফল্যে ভীষণ অনুপ্রাণিত হচ্ছি।

কিন্তু এবার তো আপনাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলেন আরেক সোনিয়া...

সোনিয়া: ওহ্, সোনিয়া খাতুন। ব্যক্তিগত ৪টি ও রিলেতে জিতেছে ৩টি সোনা। সব মিলিয়ে মোট ৭টি সোনা জিতেছে ও।

বিজ্ঞাপন

এবারের গেমসে সবাইকে ছাপিয়ে যাবেন, এই আত্মবিশ্বাস ছিল?

সোনিয়া: অবশ্যই ছিল। ২০১৩ সালে সর্বশেষ বাংলাদেশ গেমসেও আমি ৬টি সোনা জিতেছিলাম। সেবার আমি আর মাহফুজুর রহমান ভাই সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলাম। সাগর ভাই পেয়েছিলেন ৭টি সোনা। তিনি হন ছেলেদের বিভাগে সেরা, আমি মেয়েদের বিভাগে। এবার আমি ১১টি ইভেন্টে অংশ নিই। ২০১৬ ও ২০১০ ঢাকায় এসএ গেমসে মোট ৩টি ব্রোঞ্জ পেয়েছিলাম। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকেও গিয়েছি।

সাঁতারে সোনিয়া মানেই সোনার উৎসব। সাফল্যের রহস্য কী?

সোনিয়া: ছোটবেলা থেকেই আমি কঠোর পরিশ্রম করছি। সেটারই ফল এই সাফল্য। এবারের ৮টিসহ জাতীয় স্তরে সিনিয়রে আমার সোনার সংখ্যা এখন ৭৬।

গত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে আপনি মাত্র ১টি ব্যক্তিগত সোনা জিতেছেন। বাংলাদেশ গেমসে এত ভালো ফল কীভাবে হলো?

সোনিয়া: গত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ব্যক্তিগত ১টি ও রিলেতে ৩টি সোনা জিতেছিলাম। বাংলাদেশ গেমসে এবার একটু বেশি ইভেন্টে খেলেছি। আগেরবার এত ইভেন্ট ছিল না। তা ছাড়া এবার অল্প সময়ে অনেক কঠিন অনুশীলন হয়েছে। সব মিলিয়েই এই সাফল্য।

default-image

এই যে প্রতিবার সাঁতার প্রতিযোগিতায় আসেন আর একগাদা সোনা জিতে বাড়ি ফেরেন, এখন পর্যন্ত শীর্ষ স্তরে কতগুলো সোনার পদক হলো আপনার?

সোনিয়া: এত দিন সিনিয়র ন্যাশনালে ৬৮টি সোনা ছিল আমার। এবারের ৮টি যোগ করলে ৭৬টি। রুপা, ব্রোঞ্জের হিসাব বাদই দিলাম।

৮-৯ বছর বয়স থেকেই তো পুল মাতাচ্ছেন। নিজেকে এত দিন কীভাবে ধরে রাখলেন?

সোনিয়া: আমার বাড়ির পাশেই নদী। পানির সঙ্গে একটা সখ্য ছোটবেলা থেকেই ছিল। এ ছাড়া সব সময় ভেবেছি, সেরা হব, সেরা থাকব। নিজেকে ধরে রাখার জন্য তাই সব রকম চেষ্টাই করে গেছি। ফিটনেস ঠিক রেখেছি। ২০০৭-১৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সাঁতারে সেরা খেলোয়াড় হয়েছি। ২০০৩ সালে ঢাকায় প্রথম জাতীয় জুনিয়রে খেলতে আসার পর থেকেই আমি সব সময় ভেবেছি, আমি ফিট থাকব। সব সময় চেষ্টা করেছি নিজের সেরাটা দিতে। সেই লক্ষ্য নিয়েই জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলি ২০০৭ সাল থেকে। ২০০৬ সালে জুনিয়রে সেরা খেলোয়াড় হই ১১টি সোনা পেয়ে। ২০০৭-১৪ পর্যন্ত জাতীয় সাঁতারে আমি সেরা খেলোয়াড় হয়েছি। সাফল্যের পেছনে আমার পরিশ্রম আর প্রতিজ্ঞাই বেশি কাজ করেছে।

পুলের এই বিপুল সাফল্য আপনার জীবনে কতটা বদল এনেছে?

সোনিয়া: কিছু বদল তো এনেছেই। আমাদের দেশে মানুষ ক্রিকেট নিয়েই বেশি উৎসাহী থাকে। তারপরও সাঁতার করি বলে আজ অনেকে চেনেন। তবে এত সোনা পেয়েও আমাদের তেমন প্রাপ্তি নেই। আমার দল নৌবাহিনী যতটুকু দিচ্ছে, ততটুকুই পাচ্ছি। বাড়তি কিছু নেই। গেমস খেলে আমি একটা চকলেটও তো পাইনি। এখন হয়তো সবাই চিনছে। দুদিন পর কেউ আর খোঁজও নেবে না।

বিজ্ঞাপন

নৌবাহিনী থেকে নিশ্চয়ই কিছু পাবেন...

সোনিয়া: আশা তো করি। তারা তো আমাদের পাশে আছেই। কিন্তু এত বড় একটা গেমস হচ্ছে, আয়োজকেরা কোনো ঘোষণা দেয়নি। শুধু খেলা হচ্ছে, আর আমরা এসে খেলছি। নিজেকে ফিট রাখতে আমরা নিজেরাও তো অনেক টাকা খরচ করি। জায়গা ধরে রাখতে কষ্ট করতে হয়। কিন্তু কোনো অর্থ পুরস্কার পাই না। সাঁতারে সিনিয়রদের বছরে একটিমাত্র প্রতিযোগিতা হয়। তা-ও অনেক সময় হয় না।

আপনার স্বামী আসিফ রেজাও একজন সাঁতারু। আপনারা দুজনই তো মাতিয়ে দিয়েছেন গেমসটা!

সোনিয়া: আসিফও নৌবাহিনীর সাঁতারু। এই গেমসে ৪টি সোনা জিতেছে ও। ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল জিতে আমরা দুজনই গেমসের দ্রুততম সাঁতারু হয়েছি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি আমাদের বিয়ে হয়েছে।

চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে বসলে কেমন লাগে?

সোনিয়া: অনেক কিছু পেয়েছি খেলায় এসে। ২০১৬ ও ২০১০ ঢাকায় এসএ গেমসে মোট ৩টি ব্রোঞ্জ পাই। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে গিয়েছি। তবে অপ্রাপ্তিই বেশি। এত কষ্ট করি। কিন্তু আমরা কী পাই কেউ ভাবে না। ক্রিকেটে কোনো কিছুর অভাব নেই। আর আমাদের দেশের সবাই ক্রিকেট নিয়েই উৎসাহী বেশি। সাঁতার নিয়ে কে ভাবে! সাঁতারে বছরে সিনিয়র পর্যায়ে খেলাই হয় একটা, অনেক সময় হয়ও না। তাই নতুন খেলোয়াড় সেভাবে উঠে আসছে না। এটা ভাবলে খারাপ লাগে।

default-image

পরিবারে কে কে আছেন?

সোনিয়া: বাবা-মা, আমরা দুই বোন আর এক ভাই। বাবার মুদিদোকান আছে। মা গৃহিণী। আমার ছোট বোন বিকেএসপির ছাত্রী, সে-ও সাঁতারু।

সাঁতারে এলেন কীভাবে?

সোনিয়া: আমি আমার ভাইয়ের হাত ধরেই সাঁতারে আসি। ঝিনাইদহে নবগঙ্গা নদীতে সাঁতার কাটতাম ছোটবেলায়। কোচ জাহিদ মোল্লার কাছে শিখেছি সাঁতার। ২০০৪ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে ২০১০ সালে বের হই। সাঁতার নিয়েই ছিলাম, আছি, থাকব।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন