বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

টেস্ট সিরিজ পরে হওয়ায় সফর–পরবর্তী আলোচনাটা ব্যর্থতা নিয়েই বেশি। ওয়ানডে সিরিজ জয়ের সাফল্য যেন ভুলে গেছে সবাই। এসব ক্ষেত্রে নিজেদের কি একটু দুর্ভাগা মনে হয়?

তামিম: এসবে আমরা এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। শুধু এটাই বলব, দক্ষিণ আফ্রিকায় এবার ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের যে অর্জন, এটা ভোলার মতো নয়। আমাদের ওয়ানডে ইতিহাসেই সম্ভবত এটা সবচেয়ে বড় অর্জন। এটা এমন এক দলের বিপক্ষে এসেছে, যারা পূর্ণশক্তির ছিল এবং আমাদের ঠিক আগে তারা ভারতকে ৩–০–তে সিরিজ হারিয়েছে। দুটি টেস্টে খারাপ করায় সফরটাকে ছোট করে দেখা উচিত হবে না।

অধিনায়ক হিসেবে যদি দেখেন, ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পেছনে দলের কোন দিকটার ভূমিকা বেশি ছিল বলে মনে করেন?

তামিম: আত্মবিশ্বাস। প্রথম ওয়ানডে জয়ের পর সবার মধ্যে যে আত্মবিশ্বাসটা চলে আসে, ওটাই সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে। তবে অধিনায়ক হিসেবে এই সিরিজে আমার পক্ষে নির্দিষ্ট এক–দুজনকে কৃতিত্ব দেওয়াটা খুব কঠিন। খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, ম্যানেজমেন্ট—সবারই অবদান ছিল। বিশেষ করে খেলোয়াড়দের।

default-image

ওয়ানডে দলটাকে এবার আরও বেশি সংগঠিত মনে হলো…

তামিম: দেখুন, তিন সংস্করণের মধ্যে ওয়ানডেতেই আমরা বেশি ভালো খেলি। এই সংস্করণে আমরা আগেও ভালো খেলায় সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। আমি যে এখানে অধিনায়ক হিসেবে অনেক কিছু বদলে ফেলছি বা অধিনায়ক হিসেবে আমাকে অনেক কিছু করতে হচ্ছে, ব্যাপারটা সে রকম নয়। আমাদের ওয়ানডে দলটা বেশ থিতু একটা দল। আমার কাজ হলো দলের যে সম্পদ আছে, সেগুলোকে ভালোভাবে কাজে লাগানো।

আপনি বললেন দলের সম্পদ ভালোভাবে কাজে লাগানোই আপনার কাজ। তো খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনতে আপনার ফর্মুলা কী?

তামিম: বাংলাদেশ দলে খেললে এমনিতেই সবাই চায় ভালো কিছু করতে। আমি চেষ্টা করি, সবাই যেন মানসিকভাবে ভালো অবস্থায় থাকে, স্বস্তিতে থাকে। আমার কাছে প্রতিটি ম্যাচই শিক্ষণীয়। প্রতিটি খেলায়ই আমি নতুন নতুন পরিস্থিতিতে পড়ি। কিছু পরিস্থিতিতে আমার ভুল হয়, কিছু ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিই। একই ভুল যদি আমি বারবার না করি, তাহলেই বুঝতে হবে অধিনায়ক হিসেবে আমি ভালো করছি। ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে আমার বাড়তি সুবিধা দলটার অভিজ্ঞতা। মাঠে আমার যদি সিদ্ধান্ত নিতে কোনো সমস্যা হয়, আমি মুশফিকের কাছে যেতে পারি, সাকিবের কাছে যেতে পারি, মাহমুদউল্লাহর কাছে যেতে পারি। প্রয়োজনে লিটন, মিরাজদেরও পরামর্শ নিই। সঙ্গে কোচিং স্টাফরা তো আছেনই। ড্রেসিংরুমে এটা আমি বলেই রেখেছি, তাঁদের যদি কোনো কিছু মনে হয় মাঠে তাঁরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমি এমন অধিনায়ক নই যে বাইরে থেকে কোনো বার্তা এলে নেব না। তবে আমি পরিস্থিতি বুঝে ঠিক করি, সে বার্তা অনুযায়ী কাজ করব কি করব না।

দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সবার সঙ্গে সবার বোঝাপড়া তো এক রকম নয়। তাঁদের ক্ষেত্রে আপনার নীতি কী?

তামিম: আমার বিশ্বাস, আমার সঙ্গে সবার সম্পর্ক ভালো। বাংলাদেশ দলের কারও সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো নয়, এটা আমি মনে করি না। আমি যত দিন ধরে অধিনায়ক আছি, মাঠে আমি কখনো দেখিনি কারও মধ্যে কোনো অস্বস্তি আছে বা কাউকে আমি কিছু জিজ্ঞেস করে উত্তর পাইনি বা কারও কাছ থেকে সাহায্য পাইনি—এ রকম বললে ভুলই বলা হবে।

default-image

দল পরিচালনায় তরুণদের সাহায্যও নেন বললেন...

তামিম: এবারের সিরিজে মাঠে মুশফিকের পর আমার মনে হয় লিটনের সঙ্গেই বেশি কথা হয়েছে। যখন মাশরাফি ভাইয়ের অধিনায়কত্বে খেলেছি, আমি হয়তো দশটা পরামর্শ ওনাকে দিতাম। মাশরাফি ভাইয়ের যদি আমার কোনো পরামর্শ ঠিক মনে হতো, তাহলে উনি সেটা শুনতেন। যেটা মনে করতেন ঠিক না, ওটা করতেন না। একই রকমভাবে লিটন, মিরাজ, শান্তরাও (নাজমুল হোসেন) যখন যেটা মনে হয়, আমাকে এসে বলে। আমার যদি কোনোটা ঠিক মনে হয়, সেটা নিই।

তরুণদের কার মধ্যে নেতৃত্বগুণ বেশি দেখেন?

তামিম: কে ভালো অধিনায়ক হবে, এটা আগে থেকে বলা কঠিন। অনেকের মধ্যেই অনেক সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ না সে কাজটা করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আসলে কিছু বলা সম্ভব নয়। মিরাজ, শান্ত, লিটন—সুযোগ পেলে ওরা ভালো অধিনায়ক হতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ না তারা পরিস্থিতিটা মোকাবিলা করছে, ততক্ষণ বাস্তবতা বোঝা যাবে না।

default-image

টেস্ট দলের অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুল হককে কেমন দেখছেন? দক্ষিণ আফ্রিকায় মুমিনুলের অধিনায়কত্ব নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে, সেটা নিয়ে কী বলবেন?

তামিম: বাংলাদেশের হয়ে টেস্টের অধিনায়কত্ব করা খুব কঠিন। মুমিনুল যেটা করে, এটা অনেক অনেক কঠিন কাজ। আমি বা অন্য কেউ টেস্ট অধিনায়ক থাকলে আমাদের জন্যও কাজটা কঠিন হতো। আমি সব সময়ই জোর গলায় বলে আসছি, আমাদের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুলই সবচেয়ে উপযুক্ত। ও টেস্ট ক্রিকেটকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়, এতটা বাংলাদেশের ক্রিকেটে আর কেউ দেয় কি না, আমার প্রশ্ন আছে। টেস্ট ক্রিকেট সবাই পছন্দ করে, আমিও করি। কিন্তু ও শুধু এই একটা সংস্করণই খেলে বলে টেস্ট ম্যাচের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটাই আলাদা। মুমিনুলেরই তাই আমাদের টেস্ট দলের অধিনায়ক থাকা উচিত। হ্যাঁ, আপনাকে অনেক সময় অধিনায়ক তৈরি করতে হবে। আর কিছু তৈরি করতে হলে তো সময় লাগবেই। এখন ধরুন আপনি মিরাজ, লিটন বা অন্য কাউকে অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। এরপর যদি তারা তিন–চারটা টেস্ট হারে, তখন তো একই পরিস্থিতি দাঁড়াবে! ওদের সঙ্গে কি সেটা ঠিক হবে? হবে না। একই কথা মুমিনুলের ক্ষেত্রেও। মুমিনুলের সঙ্গে যা হচ্ছে, সেটা খুবই অন্যায়। আর এমন তো নয় যে আমরা বছরে চার–পাঁচটা করে টেস্ট ম্যাচ জিতি। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে যেটা হয়েছে, সেটা অবিশ্বাস্য।

default-image

টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুলের কোন দিকটা আপনার চোখে বেশি পড়ে?

তামিম: আজকে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের যে ভালো অবস্থা, ছয়–সাত বছর আগেও এটা ছিল না। এটা হয়তো অনেকেই জানেন না যে ওয়ানডেতে বা টেস্টে যে এখন আমাদের হাতে পর্যাপ্ত পেস বোলার আছে, এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব মুমিনুলের। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আগে দুই পেসারকে দিয়ে সর্বোচ্চ ৫ ওভার করে করিয়েই স্পিনার নিয়ে আসা হতো। জাতীয় লিগ বলেন, বিসিএল বলেন—সব জায়গায়ই এ রকম হতো। আমার দেখা মুমিনুলই প্রথম অধিনায়ক, যে পেস বোলারদের দিয়ে অনেক ওভার বোলিং করাত। এমনও হয়েছে মাঠে আমি মুমিনুলকে বলেছি, ‘ভাই, স্পিনার দিয়ে বল করা…।’ ও পাল্টা বলছে, ‘এখানে যদি পেসাররা না শেখে, টেস্ট ম্যাচে কীভাবে বোলিং করবে?’ পেসারদের দিয়ে বেশি বল করানোর একটা লক্ষ্য ছিল ওর। এতে হয়তো অনেক কোচেরও অবদান আছে। কিন্তু স্বপ্নটা ছিল মুমিনুলের। এটা ঠিক যে অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুলের এখনো অনেক কিছু শেখার বাকি, যেটা আমারও বাকি। সময় ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সঙ্গে সে অনেক কিছু শিখবে, বুঝবে…ঠিক যেটা আমিও বুঝব।

আমি সব সময়ই জোর গলায় বলে আসছি, আমাদের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুলই সবচেয়ে উপযুক্ত। ও টেস্ট ক্রিকেটকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়, এতটা বাংলাদেশের ক্রিকেটে আর কেউ দেয় কি না, আমার প্রশ্ন আছে।

মুমিনুল ভালো ব্যাটসম্যান, ভালো মানুষ, টেস্ট নিয়ে চিন্তা করেন—সবই ঠিক আছে। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে যে কর্তৃত্বটা দলে থাকতে হয়, সেটা কি তিনি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন?

তামিম: মুমিনুল এমনিতে খুব শান্ত চরিত্রের মানুষ। তার মানে এই নয় যে কেউ ভুল করলেও ও শান্ত থাকে। এখন সেটা তো সবার দেখার বা শোনার দরকার নেই। এটা দলের ভেতরের ব্যাপার। এমনকি আমি বা মুশফিকও যদি ভুল করি, সে আমাদের বলতে ছাড়ে না। আমরা সিনিয়র বলে হয়তো বলার ধরনটা ভিন্ন হয়। কিন্তু বলে সবাইকেই।

মাঝে কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর সঙ্গে আপনার সম্পর্কে শীতলতা এসেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে কি সেটা কিছুটা স্বাভাবিক হলো?

তামিম: বিশ্বের এমন কোনো দল নেই, যেখানে খেলোয়াড়–কোচের মধ্যে কথা–কাটাকাটি হয় না। বছরখানেক আগে আমার আর ডমিঙ্গোর মধ্যেও কিছু একটা হয়েছিল। কিন্তু আমরা দুজনই সেটা ভুলে গেছি এবং আমাদের মধ্যে এখন খুব ভালো বোঝাপড়া। আমাদের মধ্যে বিষয়টা নিয়ে অনেক লম্বা আলোচনা হয়েছে। আমরা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছি এবং সেটা নিশ্চয়ই আপনারা দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে দেখেছেন, আপনি নিজেও তো সেখানে ছিলেন। ওই ঘটনার আগেও ডমিঙ্গোর সঙ্গে আমার ভালো বোঝাপড়া ছিল, এখনো আছে। তারপরও যদি মানুষ এ নিয়ে কথা বলে, তাহলে তো কিছু করার নেই।

default-image

টি–টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে ছয় মাসের বিশ্রামে আছেন আপনি। এই সংস্করণের ক্রিকেট নিয়ে আপনার আসলে পরিকল্পনাটা কী? না খেললে একবারেই ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন, আর খেললে ছয় মাসের বিরতি কেন?

তামিম: (হাসি) কমবেশি তো আপনারাও বুঝতে পারছেন বিষয়টা কোন দিকে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই কিছু কারণ ছিল বলেই আমি ছয় মাসের বিশ্রামের কথা বলেছি। কিন্তু এটা তো রকেটবিজ্ঞান নয় যে কেউ বুঝবে না কী হতে যাচ্ছে। আমি বিসিবির একজন চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার। কোনো দিন যদি আমার বিশ্রাম দরকার হয়েছে, ধরুন কোনো সফরে যেতে চাইনি, আমি সব সময় বোর্ডকে আগে থেকে পরিষ্কারভাবে তা জানিয়েছি। এ ক্ষেত্রেও সবকিছু খুবই পরিষ্কার। বিশেষ করে, টি–টোয়েন্টি নিয়ে আমার ভাবনা কী, সে ব্যাপারে বোর্ড এবং নির্বাচকেরা এখন পুরোপুরি পরিষ্কার, তাঁরা জানেন আমি কী চাই, না চাই। তারপরও সামনে আমি আবারও ক্রিকেট বোর্ডকে জানিয়ে দেব, আমি আসলে কী চিন্তা করছি। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের জানাব।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন