বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার তো এখন নাতি–নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা। অথচ সব ছেড়ে বিকেএসপিতে অনুশীলন করাচ্ছেন দেশের শীর্ষ অ্যাথলেটদের। কীভাবে এত অনুপ্রেরণা পান?

সুফিয়া খাতুন: অনুপ্রেরণা আমি নিজেই। ছোট থেকেই খেলাধুলা ভালোবাসি। খেলাই আমার জীবন। ফলে কখনো মনে হয় না যে আমার বয়স ৭২ হয়ে গেছে।

তারপরও একটা সময় থামতে হয়। অবসর নিয়ে কিছু ভেবেছেন?

সুফিয়া খাতুন: ওই রকম কিছু ভাবিনি। যত দিন বাঁচে থাকব, ট্র্যাকেই থাকব। আসলে খেলার বাইরে অন্য কিছুতে আমার মন বসে না। ভালো লাগে না। খেলা ছাড়া এক দিনও বাঁচি না। জীবনের শেষ দিনটা পর্যন্ত ট্রেনিং করাতে চাই।

default-image

কিন্তু ট্রেনিং করানোর সুযোগ পাওয়া তো কঠিন। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন ২৯ বছর পর এবার আপনাকে জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব দিয়েছে। ভেবেছিলেন দায়িত্বটা পাবেন?

সুফিয়া খাতুন: অতটা ভাবিনি। তবে আমার একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, জাতীয় দলের দায়িত্ব আবার পাব। কিন্তু আমার মনের বাসনা যতই থাকুক, অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন না দিলে দায়িত্বটা পেতাম না। তারা আমার কাজের মূল্যায়ন করেছে। মনে করেছে আমি এই কাজের উপযুক্ত। এখন দায়িত্বটা সততার সঙ্গে পালন করতে চাই।

আপনি ১৯৯৩ সালে ঢাকা সাফ গেমসে বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন। ওই বছর বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি আপনাকে সেরা কোচের পুরস্কার দেয়। স্মৃতিগুলো মনে পড়ে?

সুফিয়া খাতুন: খুব মনে আছে। ’৯৩ সাফ গেমসে বিমল চন্দ্র তরফদার দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানব হলো। ওর কোচ ছিলাম আমি। আসলে সেই সময়ে আমাদের অ্যাথলেটিকসে অনেক সাফল্য এসেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা এখন আর নেই। তাই অতীতের সঙ্গে এখনকার সময়টা তুলনা করলে খারাপ লাগে।

জাতীয় দলের কোচ হয়ে কেমন দেখছেন অ্যাথলেটদের?

সুফিয়া খাতুন: আমাদের সময় আর এখনকার সময়ে অনেক পার্থক্য। আমরা যেমন গভীর মনোযোগ দিয়ে অনুশীলন করেছি, কোথাও যেতাম না, ২৪ ঘণ্টাই খেলা নিয়ে থাকতাম, এখনকার অ্যাথলেটরা তেমন নয়। ওরা বারবার ছুটি চায়। আজ এই সমস্যা, কাল ওই সমস্যা। এভাবে আসলে হয় না।

বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসে সাফল্য–খরা চলছে অনেক বছর। কী মনে হয়, সামনে এই খরা দূর হবে?

সুফিয়া খাতুন: ইংল্যান্ডপ্রবাসী ইমরানুরের টাইমিং ভালো। আগামী দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ওকে নিয়ে আশা করাই যায়। হাই জাম্পেও আমাদের ছেলেমেয়েরা ভালো করছে। স্প্রিন্টে শিরিন, সুমাইয়া চেষ্টা করছে। ওদের টাইমিংয়ে উন্নতি হচ্ছে। তবে আরও অনেক পরিশ্রম করতে হবে ওদের।

default-image

১৯৬৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান অলিম্পিকে আপনি পাকিস্তানের দ্রুততম মানবী হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রথম দ্রুততম মানবী হন। ১৯৭৮-৮২ পর্যন্ত দ্রুততম মানবী হয়েছেন টানা পাঁচবার। এই যে ট্র্যাকের রানি হয়ে উঠেছিলেন, এর পেছনে রহস্য কী?

সুফিয়া খাতুন: রহস্য কিছু নয়, আমি নিয়মিত অনুশীলন করতাম। কখনো ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতাম না। পায়ের পেশির শক্তি বাড়াতে রাজশাহীর বালুচরে গিয়ে কত যে অনুশীলন করেছি, হিসাব নেই। আসলে সাধনা ছাড়া কোনো সাফল্য আসে না। মনে আছে, ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে পাকিস্তানের ডলারেস আলমিদাকে পেছনে ফেলে আমি প্রথম হই ১০০ মিটার স্প্রিন্টে। সেই গেমসে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে হয়েছিলাম দ্বিতীয়।

ছোটবেলাতেই অ্যাথলেট হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে সাড়া ফেলেছিলেন আপনি। সেই সময়টা কেমন ছিল?

সুফিয়া খাতুন: অসাধারণ। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে আমার জন্ম। সেখানে সাদিখাঁরদেড়ার প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমার নাম ছড়ায় সারা ভারতে। ভারতে জুনিয়র অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নও ছিলাম। আনন্দবাজারসহ অনেক পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হয়। ১৯৬৫ সালে সম্পত্তি বিনিময় করে আমরা পাবনায় চলে আসি।

default-image

কিন্তু আপনার শিকড় রয়ে গেছে মুর্শিদাবাদেই। সেখানে আপনার পরিবারের কে কে আছেন?

সুফিয়া খাতুন: বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। তিনি চালের ব্যবসা করতেন। অনেক জমিজমা ছিল আমাদের। দুই ভাই আর চার বোনের মধ্যে এখন বেঁচে আছি আমি (ভাইবোনদের মধ্যে চতুর্থ)। সবার বড়জন বোন। তাঁর ডাকনাম লতা। ভালো নামটা অবশ্য ভুলে গেছি। বহরমপুরেই থাকেন। অনেক বয়স হয়ে গেছে তাঁর। আমার আত্মীয়স্বজন সব ওখানেই থাকেন।

আর আপনার ছেলে-মেয়ে?

সুফিয়া খাতুন: একমাত্র ছেলে রাজশাহীর বাড়িতে থাকে। আর একমাত্র মেয়ে থাকে মুর্শিদাবাদে। মেয়ের স্বামী মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী থানার সিপিএম নেতা। ওরা নিজ নিজ জীবনে ভালোই আছে। মেয়ে কদিন আগে বাংলাদেশে এসে বিকেএসপিতেও ঘুরে গেছে। এসে আমাকে বলে, ‘তুমি তো ভালোই আছ।’ আমি বলি, আমি ভালোই থাকি (হাসি)।

ছেলে–মেয়েদের ছেড়ে একা থাকেন। খারাপ লাগে না?

সুফিয়া খাতুন: একা আমি অনেক আগে থেকেই। ২০০৩ সালে স্বামী মারা যান। সেই থেকেই সঙ্গীহীন। তবে একা থাকতেই আমার ভালো লাগে। বাসায় কেউ এলে উসখুস লাগে, কখন যাবে কখন যাবে (হাসি)। চলতে–ফিরতে আমার আসলে কারও সহায়তা লাগে না। আমি একাই এক শ।

আপনি মুর্শিদাবাদ যান?

সুফিয়া খাতুন: করোনার আগে ২০১৯ সালে গিয়েছিলাম। এরপর গত বছর গিয়েছিলাম।

default-image

ষাটের দশকে আনন্দবাজার পত্রিকায় দেখলাম আপনার ছবি।

সুফিয়া খাতুন: হ্যাঁ, মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের সাদিখাঁরদেড়ার প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় দৌড়ে প্রথম হই। তখন কলকাতার পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হতো। চণ্ডীগড়ে সর্বভারতীয় জুনিয়র অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আনন্দবাজারসহ কলকাতার অনেক পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হয়। সেসব ছবি যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

সাদিখাঁরদেড়ার স্কুলের কোন স্মৃতিটা বেশি মনে পড়ে?

সুফিয়া খাতুন: দৌড়ের স্মৃতি। স্কুলে বিরাট মাঠ ছিল, এখনো আছে। দৌড়ে সব সময় প্রথম হতাম। স্কুলে খুব আদর পেতাম। এখনো প্রতিবছর স্কুলে অ্যাথলেটিকস হলে আমাকে স্মরণ করা হয়। আমার আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে স্কুল থেকে।

এই বয়সেও আপনি নিজেকে ফিট রাখেন কীভাবে?

সুফিয়া খাতুন: নিয়মিত রুটিন মেনে চলি। শারীরিকভাবে তাই ফিট আছি, ভালো আছি। সারা বছরই ভালো থাকি। ২০১০ সালে সর্বশেষ অসুস্থ হয়ে একবার বারডেমে ভর্তি হই। এর পর থেকে আর কোনো সমস্যা হয়নি। আমি কাজের মধ্যে থাকি। হাঁটাহাঁটি করি। গত বছর ভারতে গিয়ে চোখের পরীক্ষা করে লেন্স লাগিয়েছি। এখন চোখ ভালো। শারীরিকভাবে কোনো সমস্যা নেই আমার।

default-image

আপনার দৈনন্দিন রুটিন কী?

সুফিয়া খাতুন: খুব তাড়াতাড়ি ঘুমানো মানুষ আমি। রাত নয়টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি। উঠি ভোর সাড়ে চার–পাঁচটার দিকে। নামাজ পড়ে হাঁটতে বেরোই। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ফিরে আসি। নাশতা বানাই।

রান্নাবান্না কি নিজেই করেন?

সুফিয়া খাতুন: সব নিজেই করি। সকালে নাশতা বানাই। রুটি, সবজি। দুপুরে ভাত, মাছ, ডাল, সবজি। রাতে রুটি, সবজি। দুই বেলা রুটি, এক বেলা ভাত। আর এমনিতে কই মাছ , শিং মাছ, ডাল, কলা খেতে ভালো লাগে। খিচুড়ি খাই মাঝেমধ্যে। তবে গরু, খাসি, মুরগির মাংস খাই না। ২০১০ সালে অসুস্থ হলে চিকিৎসক বলেছিলেন এসব খাবার না খেতে।

আপনি সর্বশেষ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শারীরিক শিক্ষক ছিলেন। সেই চাকরি ছেড়ে দিলেন কেন?

সুফিয়া খাতুন: ২০১২ সাল থেকে ওই স্কুলে কাজ করে আমি হাঁপিয়ে উঠি। স্কুলের চাকরি তো, একঘেয়েমি এসে গিয়েছিল। তাই ২০১৯ সালে ছেড়ে দিই। তারপর বিকেএসপির পাশেই সাভারের জিরানি বাজারের এখানে চলে আসি থাকার জন্য।

জিরানি বাজারে কেন?

সুফিয়া খাতুন: এখানে আসার কারণ, দূষণমুক্ত পরিবেশ। বিকেএসপির কাছাকাছি থাকার জন্যই এত দূর আসা। প্রথমে এক রুমের একটা বাসা নিয়েছিলাম, যাতে এখানে থেকে প্রতিদিন আমি বিকেএসপিতে এসে হাঁটতে পারি। এখানে থাকলে জিমও করতে পারি। তবে সেই বাসা বদল করে পাশে অন্য একটা বাসা নিয়েছি দুই দিন আগে। খেলা ছেড়ে ২২ বছর বিকেএসপির কোচ ছিলাম, তাই এখানে সবাই আমাকে চেনে। লোকজন দেখে জানতে চায়, এত দিন কোথায় ছিলাম। শুনে ভালোই লাগে। এই বয়সে এর চেয়ে আর কিছু চাওয়ার নেই আমার।

default-image

জীবনে কোনো স্বপ্ন দেখেন এখন?

সুফিয়া খাতুন: এখন আর চাওয়া–পাওয়া তেমন কিছু নেই। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কোনো পদে থাকার ইচ্ছা নেই। অত গ্যাঞ্জামের মধ্যে কে যায়, বলুন! আমৃত্যু অ্যাথলেটিকসেই থাকার ইচ্ছা। আর কোথায় থাকব! আর তো জায়গা নেই।

কিন্তু আপনি চাইলে অন্য পেশায় যেতে পারতেন।

সুফিয়া খাতুন: পারতাম, আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স, মাস্টাস করেছি। মাস্টার্স করেছি ১৯৮৫ সালে, যখন আমার বয়স ৩৫। কিন্তু আমি অন্য পেশায় যাইনি। কারণ, খেলার বাইরে জীবনে অন্য কিছু ভাবিনি।

জীবনে কোনো অপূর্ণতা আছে?

সুফিয়া খাতুন: অপূর্ণতা নেই বলব না, একটা আছে। সেটা বলার আগে তোমার কাছে আমার একটাই প্রশ্ন। একটা ফেডারেশনের কাউন্সিলর হতে কী লাগে বলো? দেখো, আমি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছি। প্রথম আলোর আজীবন সম্মাননা পেয়েছি (২০১৬ সালে)। অনেক অর্জন আছে জীবনে। কিন্তু এত বছরে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ফেডারেশনের নির্বাচনে কাউন্সিলর হতে পারিনি। এই একটা আক্ষেপ আমার রয়ে গেছে।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন