বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ক্রিকেট ক্যারিয়ারের পর কোচিংয়ে আসার পরিকল্পনা কি সব সময়ই ছিল?

হেরাথ : আমি ৪০ বছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছি। আমার ক্যারিয়ারের শুরুর ১০ বছর খুবই কঠিন ছিল। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত আমি খুব বেশি ক্রিকেট খেলিনি। শ্রীলঙ্কা দলে আমি নিয়মিত ছিলাম না। ২০০৯ সালের পর ওই কঠোর পরিশ্রম, অপেক্ষা—এসবের প্রতিদান পেতে শুরু করি। পরের ১০ বছর আমার খুব ভালো কেটেছে। আমি ভেবেছিলাম আমার ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, জীবনের শিক্ষা তরুণদের অনেক কাজে আসতে পারে। আমি সেটাই করছি।

আমার মতো ক্রিকেটার শ্রীলঙ্কায় আছে, বাংলাদেশেও আছে। কেউ হারিয়ে যায়, কেউ টিকে থাকে। এ জন্যই হার না মানার মানসিকতা থাকা খুব দরকার।

আপনার ক্যারিয়ার তো যেকোনো তরুণ ক্রিকেটারের জন্য শিক্ষা…


হেরাথ : শুধু ক্রিকেট ক্যারিয়ার নয়, জীবনের শিক্ষাটাও ক্রিকেটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন ক্রিকেটার কয় বছরই-বা ক্রিকেট খেলে। খুব গেলে ৪০? এরপরও তো জীবন চলতে থাকে। ক্রিকেট যে শিক্ষাটা দেয়, সেটা কিন্তু সারা জীবনই কাজে লাগে। যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেখান থেকে অর্জিত শিক্ষা জীবনে কাজে লাগানো যায়। আমার ক্যারিয়ারেও সেটা কাজে লেগেছে।

ক্রিকেট আড্ডায় একটা কথা ঘুরেফিরে আসে, ‘কেউ যদি মুরালিধরন না হতে পারেন, তাহলে রঙ্গনা হেরাথ হও।’ ধৈর্যশীলতার শেষ কথা যেন হেরাথ।


হেরাথ : হা হা হা। বিষয়টা তেমন না। তবে মুরালি ৮০০ টেস্ট উইকেটের মালিক। আমি শুরুতে খুব বেশি সুযোগ না পেলেও ৪০০-এর বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছি। আমার জন্য কখনোই সহজ ছিল না। কিন্তু যদি হাল ছেড়ে দিতাম, তাহলে তো ৪০০ উইকেটও নেওয়া হতো না। ক্রিকেট বিশ্ব রঙ্গনা হেরাথকে মনেও রাখত না। আমার অর্জনে আমি খুশি। আমার মতো ক্রিকেটার শ্রীলঙ্কায় আছে, বাংলাদেশেও আছে। কেউ হারিয়ে যায়, কেউ টিকে থাকে। এ জন্যই হার না মানার মানসিকতা থাকা খুব দরকার। যখন আপনার মানসিকতা সে রকম হবে, তখন আপনি ব্যর্থ হলেও ফিরে আসার প্রথম যে ধাপ, সে ধাপে খুব দ্রুত, খুব সহজেই পা দিতে পারবেন।

default-image

বাংলাদেশকে বাঁহাতি স্পিনারের ঘাঁটি বললে ভুল হবে না। দায়িত্ব নেওয়ার আগে এ বিষয়টি কি মাথায় ছিল?

হেরাথ : বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকজন বিশ্ব মানের বাঁহাতি স্পিনার এসেছে। সাকিব তো আছেই। আবদুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ রফিকরা খেলেছেন। আমি জানতাম যে এখানে এলে আমার কাজটা সহজ হবে। তবে আমি উপভোগ করছি। এর বাইরেও আমি যা দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে বাংলাদেশি স্পিনারদের মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। তবে একই সময়ে স্পিনারদের মানসিকতা ও দক্ষতা নিয়ে কাজ করার জায়গা আছে।

টেস্টের তৃতীয় ও চতুর্থ দিনের খেলা কিন্তু অনেকটা ওয়ানডের মতো। শেষ দিন আবার টি-টোয়েন্টির মতো হতে পারে।

কিছুদিন আগেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। এখনকার ক্রিকেটটা চেনা থাকায় কি কোচিংয়ে সাহায্য করছে?

হেরাথ : আমি ১৯৯৯ সাল থেকে খেলছি। শুরুতে শুধু টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গেই পরিচয় ছিল। পরে নিয়মিত সব সংস্করণেই খেলেছি, যা আমাকে বর্তমানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করছে। আধুনিক ক্রিকেটের যে চাহিদা, ভাবনা, জ্ঞান—সবই কোচিং পেশায় কাজে আসছে।

প্রায় দুই দশক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। স্পিন বোলিংয়ের দিক থেকে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে এই সময়ে?

হেরাথ : আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে শুধু টেস্ট ক্রিকেটই খেলেছি। পরে ওয়ানডে অভিষেক হয়। তার পাঁচ-ছয় বছর পর আসে টি-টোয়েন্টি। তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে যদি আমি টেস্ট ক্রিকেটে সফল হই, তাহলে আমি বাকি দুই সংস্করণেও ভালো করব। কারণ, টেস্ট ম্যাচের মধ্যেই ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টির আবহ তৈরি হয়। ওই মুহূর্তগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলে সব সংস্করণেই ভালো করা সম্ভব। টেস্টের তৃতীয় ও চতুর্থ দিনের খেলা কিন্তু অনেকটা ওয়ানডের মতো। শেষ দিন আবার টি-টোয়েন্টির মতো হতে পারে। যদি আমার ক্যারিয়ারের দুই দশকের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় যে বোলাররা এখন অনেক বৈচিত্র্য ব্যবহার করে। ব্যাটসম্যান ও বোলারদের মধ্যে খেলাটা অনেক ভারসাম্যপূর্ণ। কৌশলগত বিশ্লেষণ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

default-image

ক্রিকেট বিশ্লেষণ ক্যারিয়ারের শুরুতে কেমন ছিল আর এখন কেমন?

হেরাথ : আগের তুলনায় অনেক বেশি। এখন ম্যাচের আগে প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়।

আপনি কী ধরনের কোচ? উপাত্তনির্ভর কোচ নাকি অভিজ্ঞতা, জ্ঞাননির্ভর?

হেরাথ : দুইটিই। আপনার তথ্যও দরকার। আবার সেটা প্রয়োগেরও ব্যাপার আছে। মূল কথা হলো, পরিষ্কার মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করা। নিজের সামর্থ্যে যদি বিশ্বাস থাকে আর সেটা যদি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কোনো দোটানা না থাকে, তাহলে সফল হওয়া যায়।

স্থানীয় কোচদের ধন্যবাদ দিতে চাই, স্পিনারদের সঙ্গে তাঁরা খুবই ভালো করেছেন।
হেরাথ

যে সময়টুকু পেয়েছেন, তাতে বাংলাদেশ দলের বেশ কয়েকজন তরুণ স্পিনারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

হেরাথ : মিরাজ, নাঈম, তাইজুলের সঙ্গে কাজ করেছি। নাসুম, মেহেদীরাও আছে। জিম্বাবুয়ে ও অস্ট্রেলিয়া সিরিজে ওদের সঙ্গে কাজ করেছি। ওরা ভালো করছে। কিন্তু এখন খুব বেশি টেস্ট নেই সামনে। টেস্ট খেলা থাকলে আসলে একজন স্পিনারকে চেনা যায়। কিন্তু তাদের যে দক্ষতা, তা দেখে ওদের স্থানীয় কোচদের ধন্যবাদ দিতে চাই, সোহেল ও অন্যান্য যারা আছেন, তরুণ স্পিনারদের সঙ্গে তাঁরা খুবই ভালো করেছেন। আমি এসেছি এক-দেড় মাস হলো। দক্ষতা ও কৌশলগত যেসব দিক দেখেছি, তাতে ওরা ভালো জায়গায়ই আছে। আমি ওদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কৌশলগত ও মানসিক দিকটা ঝালাই করার চেষ্টা করছি।

default-image

টেস্ট স্পিনারদের দেশের বাইরের রেকর্ড খুব উজ্জ্বল নয়। এ ক্ষেত্রে উন্নতির উপায় কী?

হেরাথ : এ ব্যাপারে উপমহাদেশের ধারণাই বদলাতে হবে। যখন উপমহাদেশে খেলবেন, তখন উইকেট থেকে আপনি সাহায্য পাবেন। যখন এর বাইরে যাবেন, তখন অতটা সাহায্য পাবেন না। তখন যে দায়িত্ব থাকবে, সেটি একটু ভিন্ন। সেই ভিন্ন দায়িত্বটা যেন শতভাগ দিয়ে পালন করতে পারি, সেই চেষ্টা থাকতে হবে। হয়তো দেশের বাইরের উইকেটে চাপ সৃষ্টি করার দায়িত্ব থাকবে স্পিনারদের ওপর। প্রথম দুই দিন হয়তো কিছু হবে না। কিন্তু ধৈর্য ধরে সেই সময়টা রান থামিয়ে রাখার কাজ করে যেতে হবে। যখন উইকেট থেকে সাহায্য পাওয়া শুরু করবেন, তখন আবার সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। দায়িত্বও তখন বদলাবে।

কদিন আগেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। আপনি সেই দলের অংশ ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

হেরাথ : মধুর অভিজ্ঞতা। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি, ১৯৯৯ সালে আমরা প্রথম অস্ট্রেলিয়াকে হারাই। সেই ম্যাচে আমি দ্বাদশ ব্যক্তি ছিলাম। এরপর ১৭ বছর পর ২০১৭ সালে আমরা অস্ট্রেলিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে হারাই। সেই দলে আমি ছিলাম। আমি বলে বোঝাতে পারব না সেই অভিজ্ঞতাটা কত মধুর ছিল। আমাদের জন্য এটা অনেক বড় অর্জন ছিল। এরপর বাংলাদেশ যখন অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজে হারাল, তখন কোচ হিসেবে দলের সঙ্গে ছিলাম আমি। আর পুরো দলের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর যে ক্ষুধা দেখেছি, সেটা অসাধারণ ছিল। দলের প্রত্যেকের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর একটা স্বপ্ন ছিল। দলের মধ্যে যে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়েছে, সেটা আমাদের নিউজিল্যান্ড সিরিজ ও সামনের বিশ্বকাপে কাজে লাগবে।

স্পিনাররা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অস্ট্রেলিয়া সিরিজে। মোস্তাফিজুর রহমানও অবিশ্বাস্য বোলিং করেছেন। যিনি অস্ট্রেলিয়া সিরিজে দৌড়ে এসে অনেকটা বাঁহাতি স্পিন বোলিংই করেছেন…

হেরাথ : মোস্তাফিজ অনেক বড় মাপের বোলার। সে নিয়মিত আইপিএল খেলছে। তাকে খেলা খুবই কঠিন। আর যে বোলিংটা সে করেছে, আমার মনে হয় তার কাছ থেকে আমার বাঁহাতি স্পিন শেখা উচিত (হাসি)।

default-image

সাকিব আল হাসানকে একজন বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে কীভাবে দেখেন?

হেরাথ : আমার কী বলা উচিত জানি না। তবে আমি সাকিবের বিপক্ষে খেলে ও এখন কোচ হিসেবে কাজ করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। তার পরিসংখ্যানই সব বলে দেয়। সাকিবের মানের ক্রিকেটার আপনি খুব কমই দেখতে পাবেন। আশা করছি তার সঙ্গে আমার জুটিটা ভালো জমবে।

নেটে খুব বেশি বোলিং করেন না। কিন্তু ম্যাচে ঠিকই কাজটা করে দেন…

হেরাথ : একটু আগেই যে আত্মবিশ্বাসের কথাটা বলছিলাম, সাকিবের ক্ষেত্রে এটাই সত্যি। নিজের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস। নিজের খেলাটাকে এত ভালো বুঝে সে! কৌশলগত ও মানসিক দিক থেকে সে খুবই শক্তিশালী।

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে উইকেট নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। যখনই বল বাঁক খায়, তখনই দেখা যায় যে সমালোচনা শুরু হয়। কিন্তু যখন বল বাউন্স করে, সিম ও সুইং হয়, তখন এই আলোচনা হয় না কেন?

হেরাথ : যেখানেই খেলি না কেন, সেটা ঘাসের উইকেট হোক অথবা বাউন্সি উইকেট, স্পিনারদের কিন্তু অভিযোগ করতে দেখা যায় না। উইকেট যেমনই থাকুক না কেন, আমাদের উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাই (হাসি)।

বাংলাদেশ দলের ফিঙ্গার স্পিনারদের ভিড়ে একমাত্র লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলাম। বিশ্বকাপে একজন লেগ স্পিনার কি দরকার হবে?

হেরাথ : এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে দেখবেন চাহাল, কুলদ্বীপরা আছে। শ্রীলঙ্কায় ওয়ানিন্দু, সান্দাকানরা আছে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে আমাদের দলে বিপ্লব আছে। আশা করি, সে দলে থাকলে ভালো করবে।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন