default-image

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর হঠাৎ থমকে যাওয়া ফলাফলের আবহে শেষ হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার ৪৬তম জাতীয় নির্বাচন। টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয় পেয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছে দেশটির লিবারেল ও ন্যাশনাল পার্টির জোট। নির্বাচনে বিরোধী লেবার পার্টির ভরাডুবির জের ধরে দলের নেতৃত্বে এসেছে পরিবর্তন। আজ সোমবার অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সময় দুপুরে লেবার পার্টির প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন অ্যান্থনি অ্যালবানিজ।

সরকারি দলের ফের ক্ষমতায় ফিরে আসা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে দেশটির জাতীয় অঙ্গনে। গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, গত প্রায় দুই দশকে এটিই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বেশি আশাহত নির্বাচনী ফলাফল। ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে একইভাবে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী পল কিটিং ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। দেশটির বেশির ভাগ জনগণকে মর্মাহত করেছিল সেই ফলাফল।

অস্ট্রেলিয়ার এবারের জাতীয় নির্বাচনের শুরু থেকেই শক্ত অবস্থানে ছিল প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি। দেশটির রাজ্য নির্বাচন থেকে শুরু করে ভোটার মতামত জরিপে এগিয়ে ছিল দলটি।

দেশটির বেশির ভাগ মানুষেরই মনে হচ্ছিল, এবার লেবার নতুন সরকার গঠন করবে। সেই আভাসে জয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত ধরে নেন তৎকালীন দলীয় প্রধান বিল শর্টেন। নির্বাচনের ফলাফলের আগ পর্যন্ত নতুন লেবার সরকারের অপেক্ষাতেই ছিল দেশটি। এমনকি শর্টেনকেও ভোট গণনা শুরুর আগে নিশ্চিন্ত মনে থাকতে দেখা যায়।

তবে ভোটের মাত্র ২ শতাংশ গণনার ফলাফলেই এগিয়ে যেতে শুরু করে সরকারি দল। এই ফল অবাক করতে শুরু করে অস্ট্রেলিয়াবাসীদের। ভোট গণনার পূর্ণ ফলাফল প্রকাশের আগেই জয় নিশ্চিত করে সরকার দল লিবারেল পার্টি।

লেবার দলের কল্পনাতীত পরাজয়ের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দুটি কারণকে মুখ্য হিসেবে উল্লেখ করছেন। অর্থনীতি ও পরিবেশ।

নির্বাচনের আগেই জাতীয় সংসদে দেশটির আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়। তারপর প্রধান দুই দল প্রকাশ করে তাদের রাজনৈতিক ইশতেহার। দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, চিকিৎসা, সামাজিক বিষয় ইত্যাদি ইস্যুতে দল ক্ষমতায় এলে করণীয় জানানো হয় জনগণকে।

লেবার পার্টির পরিকল্পনা ছিল উচ্চ আয় উপার্জনকারীদের কর বাড়িয়ে দেওয়া। এতে দেশটির অর্থ উপার্জনকারী ২০ শতাংশকে লেবারের পরিকল্পিত আয়ের ৭০ শতাংশের জোগান দিতে হতো। এ ছাড়া চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে লেবারের ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল।

নির্বাচনী ইশতেহারে লিবারেল পার্টির আয় কম থাকলেও সবার জন্য কর প্রদানে সমবণ্টন ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যম আয়ের জন্য কর হ্রাসের পরিকল্পনা দেখা যায়।

পরিবেশ নিয়ে লেবারের পরিকল্পনার চেয়ে লিবারেলের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত মনে হয় ভোটারদের কাছে।

নির্বাচনী ফলাফলে এটা স্পষ্ট যে এবার ভোটারেরা অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।

ভোট গণনা শুরু হলে পরাজয় নিশ্চিত জানতে পেরে লিবারেলের আসন্ন জয়ে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন বিল শর্টেন। সেখানেই দল পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দেন শর্টেন। তবে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকবেন বলে জানান। তাঁর স্থানে দলের হাল ধরতে প্রথম অবস্থায় উপনেতা তানিয়া প্লাইবারসেক, টনি বার্ক, ক্রিস বোয়েন্স ও ১৯৯৩ সালের বিরোধী নেতা হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অ্যান্থনি অ্যালবানিজের নাম শোনা যায়। পরে ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সরে দাঁড়ালে অনেকটাই নিশ্চিত হয়, অ্যান্থনি অ্যালবানিজই বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন।

লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণে অ্যালবানিজের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে প্রতিযোগিতায় নামেন দলের আরেক নেতা জিম চাল্মার্স। তবে শেষ পর্যন্ত অ্যালবানিজই লেবার পার্টির প্রধান নির্বাচিত হন।

লেবার পার্টির দলীয় প্রধান হিসেবে অ্যালবানিজকে নিয়ে দল ও দলের বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

আগামী বৃহস্পতিবার লেবার পার্টির ককাসে উপনেতা নির্বাচনের কথা রয়েছে। সম্ভাব্য নেতা হিসেবে রিচার্ড মার্লেসের নাম শোনা যাচ্ছে।

গত বছর দেশটির দুই দলের মধ্যেই দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে নানা ঘটনার সৃষ্টি হয়। দলীয় রেষারেষির ফলে তখনকার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। আকস্মিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। সে সময় বিরোধী দল লেবারেও শর্টেন আর অ্যালবানিজের মধ্যে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে দলীয় কোন্দল শুরু হয়েছিল। তবে জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যান অ্যালবানিজ।

আকস্মিক প্রধানমন্ত্রী থেকে নির্বাচনে লড়ে দেশটির ৩১তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন স্কট মরিসন। মরিসনের প্রধানমন্ত্রিত্বে খুব শিগগির দেশটির সরকার গঠিত হচ্ছে। গত সপ্তাহে তিনি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা জানতে একটি বৈঠক করেন। তিনি সেখানে বলেন, ‘সময় এসেছে আমাদের সবার কাজে ফেরার। আমাদের করার অনেক কিছু রয়েছে।’

মরিসনের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় তেমন একটা পরিবর্তন আসবে না। কেননা, মরিসনের গঠন করা আগের মন্ত্রিসভার এক বছর পূরণ হয়নি এখনো। তবে নতুন দুই নারী মন্ত্রী নিয়োগের কথা জানিয়েছেন মরিসন। এ ছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদগুলো প্রায় অপরিবর্তিত থাকছে। তবে পরিবেশমন্ত্রী মেলিসা প্রাইসকে হটিয়ে সুজান লিকে নতুন মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদে আসছেন লিন্ডা রেনোল্ডস। দেশটির প্রথম নারী কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাচ্ছেন ব্রিগেট ম্যাকেনজি।

এদিকে, নির্বাচনে হেরে দল থেকে ছিটকে পড়েছেন লিবারেলের অন্যতম নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট। তাঁর নির্বাচনে হেরে যাওয়া দলটির জন্য একটি ধাক্কা। অ্যাবট দলের জন্য এমন একজন নেতা ছিলেন, যিনি যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে শক্ত অবস্থানে থাকতেন। তবে বেশি সময় ধরে দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে বিতর্কিত ছিলেন তিনি। বলা হয়ে থাকে, গত বছরের দলীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনার প্রধান ইন্ধনদাতা ছিলেন অ্যাবট। এ ছাড়া নির্বাচনে হেরে আরও বাদ পড়েছেন সাবেক সিনেটর ফ্রেজার আনিং। নিউজিল্যান্ডে হামলার পর মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্যের কারণে এক তরুণ তাঁর মাথায় ডিম ফাটিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0