বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১.

প্রথমেই আমি বলে নিতে চাই, বার্মার সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দেশটির স্বাধীনতার স্থপতি প্রয়াত অং সান আমার নানার এক ছোট ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহপাঠী ছিলেন। আমার নানার আরও এক ছোট ভাই সাবেক সিনিয়র জেনারেল থান শয়ের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। আমার এক আপন মামা ছিলেন জান্তা সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নে উইনের বিমানের ভিআইপি পাইলট।

এ কারণে আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং সাক্ষাৎকারে যখন বললেন, ‘আমরা তাদের “রাখাইনের মুসলমান বাসিন্দা” বলে থাকি’, তখনই মনে হয় তিনি রাজনৈতিক ঘড়ির কাঁটা সেই ১৯৫০-এর দশকের দাঙ্গার সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, আরাকান আর্মি এই ‘মুসলিম বাসিন্দাদের’ কাউকে কাউকে আরাকান আর্মির পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোতে নিয়োগ করার চেষ্টা চালিয়েছে।

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ উপনিবেশবাদবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামকে দমন করার জন্য জাপানের ফ্যাসিস্ট সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় বার্মার সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পরও শুধু নিজেদের কায়েমি স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে ও সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর লোকেরা সব ধরনের দমনপীড়ন জারি রাখে।

২.

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য রাখাইন জনগণের চলমান সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি আরাকান আর্মি প্রধানের সমরকৌশল নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে তাঁর বক্তব্যের যেসব জায়গাকে আমার ঐতিহাসিক সত্যের ব্যত্যয় বলে মনে হয়েছে, শুধু সেদিকে আলোকপাত করব।

কিন্তু সত্যটা হলো, ৫০০ বছর ধরে রাখাইনে স্থানীয় রাখাইন ও রোহিঙ্গারা বাস করছে। তারা সাংস্কৃতিকভাবে মিলেমিশে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের জাতীয়তাবাদীরা জোর করে আলাদা করেছে। আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইংয়ের কণ্ঠে সেই বিভাজনের সুর স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে।

প্রথমত, এটা বলা বাস্তবিকভাবে ভুল যে রাখাইন জাতীয়তাবাদীদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম শুধু সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম দশকে (জানুয়ারি ১৯৪৮-মার্চ ১৯৬২) এবং সামরিক শাসন (১৯৬২ থেকে এখন পর্যন্ত) উভয় সময়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক বার্মায় প্রভাবশালী বার্মিজদের সহযোগিতা করেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং জাপানি ফ্যাসিস্ট দখলদার সেনাবাহিনীর সামরিক পরাজয়ের পরপরই সার্বভৌমত্ব-সচেতন রাখাইনরা তাদের মুক্তিসংগ্রাম শুরু করে।

default-image

প্রাচীন আরাকান এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাখাইন রাজ্যটি সব সময় দুটি প্রধান জাতি-ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায়—রাখাইন এবং রোহিঙ্গাদের জন্মস্থান ও পৈতৃক ভূমি ছিল। এ কারণে আরাকান বা রাখাইনের রাজনৈতিক বিষয়গুলোর বোঝাপড়া প্রিজমের মতো ত্রিমাত্রিক নিরিখে দেখতে হবে। রাজ্যের শাসনক্ষমতার জন্য উপনিবেশ স্থাপনকারী বামার (বেসামরিক এবং সামরিক উভয়), স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী রাখাইন বৌদ্ধ এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই ত্রিমুখী লড়াই চলে আসছিল। অবশ্য রাখাইনের সমতল ও নদী উপকূলীয় অঞ্চলে চিন, ম্রো, ম্রানমা, মুসলিম কামান ইত্যাদি কিছু গোষ্ঠী আছে। তবে তারা রাজ্যের প্রাদেশিক রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা বা রাজনৈতিক ব্লক গঠনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগতভাবে অতি নগণ্য।

জনসংখ্যাগতভাবে, স্বাধীনতা-উত্তর রাখাইন রাজ্যটিকে ভাগ করা উচিত এবং তিনটি স্থানীয় রাজনৈতিক কেন্দ্রের ক্লাস্টার হিসেবে ভালোভাবে বোঝা উচিত। এই তিনটি এলাকার দিকে তাকালে দেখা যাবে উত্তর রাখাইন রাজ্য ঐতিহাসিকভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল ছিল। এদের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ভাষাগত, ধর্মীয় এবং জনসংখ্যাগত সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে রাখাইন জনগণের প্রাণকেন্দ্র হলো রাজ্যের কেন্দ্রীয় উপ-অঞ্চল। এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যের দক্ষিণ অংশে জাতিগত বামারদের প্রাধান্য রয়েছে।

৩.

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থান—এই ১৪ বছরের সংসদীয় গণতন্ত্রের সময়জুড়ে ইয়াঙ্গুনে পার্লামেন্টে রাখাইন রাজনীতিবিদেরা রাখাইনকে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের মর্যাদা দাবি করে আসছিলেন। তাঁদের সেই সংগ্রাম থেকেই আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং ‘অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব’ কথাটি ধার করেছেন বলে মনে হয়।

জাতিগতভাবে বামার-নিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনী রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করার পর রাখাইন ও রোহিঙ্গা রাজনীতিবিদেরা পার্লামেন্টকেই তাঁদের ক্ষমতা ও শাসনের ন্যায্য অংশীদারত্ব দাবির জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

‘বৌদ্ধ’ নৃ-জাতীয়তাবাদী রাখাইন সংসদ সদস্যরা জাতিভিত্তিক রাখাইন রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে তাঁদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সিংহভাগ দাবি করে আসছিলেন। অন্যদিকে পার্লামেন্টে মুসলিম রোহিঙ্গা রাজনীতিবিদেরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তাঁদের হিস্যা পাওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছিলেন।

লক্ষণীয়, রোহিঙ্গারা বৌদ্ধপ্রধান রাখাইনে নিজেদের দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত করতে পারেনি। বৌদ্ধ রাখাইনদের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রোহিঙ্গাদের রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক লড়াই হয়েছিল।

রোহিঙ্গা রাজনীতিবিদেরা তখন বুঝতে পারছিলেন, তাঁরা উভয়সংকটে রয়েছেন। মুসলমান রোহিঙ্গারা অবিভক্ত পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁদের ভূখণ্ডকে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পশ্চিম বার্মাকে বিচ্ছিন্ন করে সেটিকে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার আকাঙ্ক্ষার প্রতি পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিংবা তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেউই সহানুভূতিশীল হননি।

স্মরণ রাখা দরকার, বার্মার সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এর আগে রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা জাতিগত জাতীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর বাইরে তারা পশ্চিম বার্মার স্থানীয় একটি গঠনমূলক এবং অবিচ্ছেদ্য জাতিগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিয়েছে।

উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর পরিচয় এবং তাদের জাতিসত্তার ইতিহাসকে সমর্থন করে এমন সরকারি নথির পাহাড় এখনো জমা রয়েছে।

এ কারণে আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং সাক্ষাৎকারে যখন বললেন, ‘আমরা তাদের “রাখাইনের মুসলমান বাসিন্দা” বলে থাকি’, তখনই মনে হয় তিনি রাজনৈতিক ঘড়ির কাঁটা সেই ১৯৫০-এর দশকের দাঙ্গার সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, আরাকান আর্মি এই ‘মুসলিম বাসিন্দাদের’ কাউকে কাউকে আরাকান আর্মির পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোতে নিয়োগ করার চেষ্টা চালিয়েছে।

তাঁর এই কথায় বোঝা যায়, যে এলাকায় রোহিঙ্গারাই সংখ্যায় বেশি (সর্বশেষ গণহত্যার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার আগে সেখানে রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধ রাখাইনদের অনুপাত ছিল ৩: ১), সেখানে তাদেরই শান্তিশৃঙ্খলা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে দ্বিধা প্রকাশ করে তিনি জাতীয় নেতার মতো কথা বলেননি।

আবু গফুর, সুলতান আহমেদের মতো কলকাতা এবং ইয়াঙ্গুনে উচ্চশিক্ষা নেওয়া অনেক রোহিঙ্গা নেতা জেনারেল অং সানের সঙ্গে প্রাক্-স্বাধীনতার গণপরিষদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং বার্মার মূল সংবিধান প্রণয়নে সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁদের অবদানের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা যখন চলছে, সে মুহূর্তে আরাকান আর্মির গঠিত অতি নিম্নস্তরের আইন প্রয়োগকারী এজেন্ট হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিয়োগ করার কথা বলে ওয়াং ম্রা নাইং মিয়ানমারে ও মিয়ানমারের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের আঘাত ও অপমান করেছেন।

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আদলে যে গণহত্যা চালিয়েছে, তাতে হাজার হাজার বৌদ্ধ রাখাইন যে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে, জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং সে কথা স্বীকার না করার পথে হেঁটেছেন। এ কথা সর্বজনবিদিত যে বর্ডার গার্ড, পুলিশ এবং সামরিক-পুলিশ যখন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল, তখন স্থানীয় রাখাইন জাতীয়তাবাদীরা সমস্ত স্তরে সেই গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে। এসব কথা ওয়াং ম্রা নাইং একবারও বলেননি।

৫.

সাক্ষাৎকারে ওয়াং ম্রা নাইং ‘রাখাইন রাজ্যের মুসলিমদের মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা’ জানালেও, এটি বোঝা গেছে তিনি নিশ্চিতভাবেই জানেন না, রোহিঙ্গাদের তথ্য-প্রমাণসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে অস্বীকার করা সুস্পষ্টভাবে তাদের মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

বারবার শুধু ‘রাখাইন রাজ্যের মুসলমান’ বলে জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং রাখাইন জাতীয়তাবাদীদের রোহিঙ্গাবিদ্বেষী ভাষ্যকেই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। এটি গণহত্যায় সমর্থন করা ভাষ্য প্রতিষ্ঠার হীন চেষ্টার নামান্তর।

২০১২ সালে রাখাইন জাতীয়তাবাদীরা ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার’ মাঝে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল, ইসরায়েল তাদের প্রেরণা। ইসরায়েলের সরকারি ভাষ্যমতে, ফিলিস্তিনি বলে কোনো জাতির অস্তিত্বই নেই। তারা বলে সেখানে শুধু ‘আরবরা’ থাকে। এরপর ইসরায়েলি অথবা ইহুদিবাদীরা স্লোগান দেয়, ‘আরবরা নিপাত যাক’। ঠিক একইভাবে রাখাইনের জাতীয়তাবাদীরা রোহিঙ্গাদের বহিরাগত মুসলমান হিসেবে তকমা দিচ্ছে।

মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত থাকায় উভয় সীমান্তে রাখাইন ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোক আছে। বাংলাদেশে রাখাইন সম্প্রদায়ের যেসব লোক আছে, তাঁরা শুধু পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা উপভোগ করছেন না, তাঁদের অনেকেই অনেক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মিয়ানমার ঠিক উল্টো আচরণ করেছে। শুধু সেনাবাহিনী নয়, গণতন্ত্রের মানসকন্যা অং সান সু চি পর্যন্ত ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নন।

কিন্তু সত্যটা হলো, ৫০০ বছর ধরে রাখাইনে স্থানীয় রাখাইন ও রোহিঙ্গারা বাস করছে। তারা সাংস্কৃতিকভাবে মিলেমিশে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের জাতীয়তাবাদীরা জোর করে আলাদা করেছে। আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইংয়ের কণ্ঠে সেই বিভাজনের সুর স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে।

মং জার্নি, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী

ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন