default-image

বন্ধুত্ব আর থাকল না। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা–ও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা প্রশ্নে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর মধ্যে এত দিন যে একতা ছিল, তা টিকল না। প্রথম ধাক্কাটা সেই ১৯৭৯ সালে, ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের চুক্তির মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় ধাক্কাটা আরও ১৫ বছর পর, ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে চুক্তিতে। এবার এই তালিকায় যুক্ত হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই করেছে দুই আরব দেশ আমিরাত ও বাহরাইন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে বিভক্তি সৃষ্টির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন অধ্যায়েরও সূচনা হলো। সেই অধ্যায়ে ফিলিস্তিন যেন দিন দিন বড্ড একা হয়ে যাচ্ছে।

বাণিজ্যিক-সামরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো অনুঘটক হিসেবে কাজ করলেও হোয়াইট হাউসে সম্পাদিত এই চুক্তির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকটি কারণ দেখিয়েছে বিবিসি।

বিজ্ঞাপন

উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্য–সুবিধা
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে আমিরাত। ইতিমধ্যে আরব বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে দেশটি। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উর্বর ভূখণ্ড আমিরাত এখন পর্যটন ব্যবসার জন্যও নিজেকে তৈরি করেছে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হওয়ার অভিলাষ আমিরাতের অনেক দিনের। আর সেই সুযোগটিই লুফে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে আগ বাড়িয়েই আমিরাতকে সহায়তা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ইএ-১৮জি ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান কিনতে চাইছে আমিরাত। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পাদিত সামরিক চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে তা কেনা সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু নতুন এই চুক্তির বদৌলতে আমিরাতের সেই আকাঙ্ক্ষা আর অপূর্ণ থাকছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে লিবিয়া ও ইয়েমেনে আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করেছে আমিরাত। কিন্তু আদতে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ইরান। তেহরানের সন্দেহজনক পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যে অস্বস্তি, সেই একই অস্বস্তিতে ভুগছে আমিরাতও। একই পথের পথিক বাহরাইনও। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইরানের দাবি ছিল, বাহরাইন তাদেরই ভূখণ্ডের অংশ। বাহরাইনের সুন্নি শাসকেরাও তাঁদের দেশের শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে ইরানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাত ও বাহরাইনের কূটনৈতিক সম্পর্ক এত দিন গোপনেই চলে আসছিল। কিন্তু এখন তা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। তারা জানান দিয়েই ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চাইছে। ইসরায়েলের আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ব্যবসা খাতের প্রতি নজর দেশ দুটির। আবার করোনা পরিস্থিতি কেটে গেলে ইসরায়েলিরাও ছুটি কাটাতে চলে যাবেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে। সেসব দেশের মরুভূমি, সমুদ্রসৈকত ও বিপণিবিতান ইসরায়েলি পর্যটকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ। এতে পক্ষগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসার জন্য বড় সুযোগ এনে দিয়েছে এ চুক্তি।

বিজ্ঞাপন
লাভের মধু ইসরায়েলেরই বেশি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বা সামরিক—যেটাই হোক না কেন। আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে আনাটা ইসরায়েলের জন্য বড় সাফল্যই।

আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার অবসান চায় ইসরায়েল
লাভের মধু ইসরায়েলেরই বেশি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বা সামরিক—যেটাই হোক না কেন। আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে আনাটা ইসরায়েলের জন্য বড় সাফল্যই। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের কৌশলগত বন্ধুর সম্পর্কের একজন কট্টর অনুসারী। ইসরায়েলের শক্তি অর্জন ও প্রদর্শনের প্রধান লক্ষ্যই হলো আরব বিশ্বের পক্ষে ইহুদি রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য করা। পক্ষান্তরে সাধারণ ইসরায়েলিরাও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চান না। এ লক্ষ্যে মিসর ও জর্ডানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল ইসরায়েল। কিন্তু সেই চুক্তির ফল কখনোই সুখকর হয়নি।

এখন আবার উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে আশাবাদী ইসরায়েল।

এ চুক্তির মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে জোট শক্তিশালী করাটাও ইসরায়েলের জন্য বড় সাফল্য। নেতানিয়াহুর কাছে ইসরায়েলের প্রধান শত্রুর নাম ইরান। মাঝেমধ্যে তিনি ইরানি নেতাদের জার্মানির নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে তুলনাও করে বসেন। তাই আমিরাতের সম্ভাব্য অস্ত্র চুক্তি নিয়ে আপত্তি তোলাই বন্ধ করেছেন তিনি।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতানিয়াহু বিপদে আছেন। দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিচার চলছে। দোষী প্রমাণিত হলে কারাভোগও করতে হতে পারে। তা ছাড়া করোনা মোকাবিলায় তিনি শুরুর দিকে পারদর্শিতা দেখালেও শেষের দিকে এসে খেই হারিয়ে ফেলেছেন। এ নিয়ে জেরুজালেমে তাঁর বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ করে তার সেই ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে বিরোধী শিবির।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতির বিজয়
এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও লাভবান হয়েছে। মিত্র দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাত ও বাহরাইনের চুক্তিটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের বিজয়। ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ সৃষ্টি করতে তাঁর জন্য এটা কৌশলগত দিক থেকে বড় সাফল্য। তা ছাড়া ইসরায়েলের নির্বাচনী বছরে নেতানিয়াহুর জন্য ‘রসদ’ হিসেবে কাজ করবে চুক্তিটি। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে বিশ্বের ‘সেরা মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। ইসরায়েল লাভবান হয়, এমন যে কাজই তিনি করুন না কেন, তা এই মুহূর্তে ভোটের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ইসরায়েলের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক উন্মুক্ত করা গেলে ইরানের বিরুদ্ধে মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে আরও সুষ্ঠুভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে ওয়াশিংটনের। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তথাকথিত ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ হচ্ছে একটি ব্যর্থ প্রয়াস। কিন্তু আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পাদিত চুক্তি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে এটা বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ফিলিস্তিনিদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল
চুক্তিটির মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিরা আরও একবার বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলো। তারা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’কে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেই নিন্দা করছেন। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে আরবদের মধ্যকার ঐক্য ভেঙে পড়ল। অথচ আরব বিশ্ব ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বিনিময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে ছিল অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে ইসরায়েল। আর ফিলিস্তিনিরা এখনো পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে অধিকৃত অবস্থায় আছে, যা গাজার মতোই একটি উন্মুক্ত কারাগারের শামিল।

আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (তিনিই মূলত আরব আমিরাতের শাসক) বলেছেন, এই চুক্তির ফলে ইসরায়েলকে পশ্চিম তীরের দখলদারি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু নেতানিয়াহু মনে হয় না দখলদারি থেকে পিছু হটবেন। বড়জোর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আপাতত এটা বন্ধ রাখতে পারেন।

আমিরাতের পর বাহরাইনও ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি করায় ফিলিস্তিনিদের উদ্বেগ আরও বাড়ল। বাস্তবে সৌদি আরবের সম্মতি ছাড়া এই চুক্তি স্বাক্ষর কখনোই সম্ভব হতো না। কিন্তু ইসলামের দুটি পবিত্র স্থানের রক্ষক হিসেবে বাদশা সালমানের মর্যাদা তাঁকে প্রচুর কর্তৃত্ব দিলেও তাঁর ক্ষেত্রে এই চুক্তির পক্ষে হুট করে অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনাও কম। তাঁর ছেলে ও সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মোহাম্মেদ বিন সালমানের ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটবে। অথচ ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় আরব শান্তি পরিকল্পনার অন্যতম কারিগর এই সৌদি আরব।

বিজ্ঞাপন

ইরানের নতুন কৌশলগত সংকট
চুক্তিটির কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব। চুক্তির ফলে নতুন করে চাপের মুখে পড়েছেন তাঁরা। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নানামুখী অবরোধে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা। এখন তাদের চাপ আরও বেড়ে গেল।

ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি থেকে ইরানের দূরত্ব অনেক। কিন্তু আমিরাত থেকে ইরানের অবস্থান নাগালের মধ্যে। উপসাগরের ওপারেই ইরানের অস্তিত্ব। তাই তাদের সন্দেহজনক পরমাণু স্থাপনাগুলোতে বিমান হামলার প্রয়োজন হলে কৌশলগত দিক থেকে আমিরাতের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় ইরানকে মোকাবিলায় ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, আমিরাত ও বাহরাইনের সামনে নতুন দরজা খুলে গেল। পক্ষান্তরে ইরানের শক্তির জায়গা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েল-সংযুক্ত আরব আমিরাত চুক্তি ফিলিস্তিনিদের জন্য হয়তো ‘ইসরায়েলি বসতি স্থাপন’ নামের দুঃস্বপ্নের আপাত অবসান ঘটাবে। তবে তা এক নতুন দুঃস্বপ্ন ডেকে আনবে। আর তা হলো, ফিলিস্তিনিদের বিবর্ণ ভবিষ্যতের বিষয়টি হয়তো আর কখনোই বিবেচনায় আনা হবে না।

মন্তব্য পড়ুন 0