নতুন করোনাভাইরাস মানবদেহে নিয়ে এসেছে কোন প্রাণী, তা এখনো ধাঁধা হয়ে রয়েছে বিজ্ঞানীদের কাছে। শুরুতে বলা হয়েছিল, এটা সাপ হয়ে এসেছে, পরে বলা হয় বনরুই থেকে। এরপর এই কাতারে আসে নিশাচর প্রাণী বেজিসদৃশ ব্যাজারের নাম। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টা কী? কী উঠে আসছে গবেষণাগুলোতে? আর কী-ই বা বলছেন চীনের উহান পরিদর্শন করা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা?

বাদুড় থেকে মানবদেহে এই ভাইরাস সংক্রমণের বাহক হিসেবে কুকুর, বিড়াল এবং বাঘ–সিংহের নামও আলোচনায় এসেছে। অপর দিকে শঙ্কা থেকে নিধন করা হয়েছে লাখ লাখ বেজিসদৃশ আরেক প্রাণী মিঙ্ক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ দলের এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন সোমবার প্রকাশিত হয়। সেখানে উঠে আসা আলোচনাগুলো তুলে ধরা হলো—

সাপ
চীনের উহানে ২০১৯ সালের শেষ দিকে যখন করোনাভাইরাসের কথা জানাজানি হয়, তখন এর উৎস খুঁজে বের করতে তৎপর হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানীরা। পরের মাসে চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের পৃষ্ঠপোষকতায় করা এক গবেষণায় বলা হয়, কোভিড-১৯ রোগটি ঘনিষ্ঠভাবে করোনাভাইরাসের এমন একটি ধরনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেটা বাদুড়ে রয়েছে। এই প্রাণীটিই ভাইরাসটি নিয়ে আসতে পারে। বাদুড় আরও অনেক ধরনের করোনাভাইরাসের পোষক।

কিন্তু প্রথম গবেষণার অল্প দিনের মধ্যেই প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলেন, কোভিড-১৯ মানবদেহে আসার ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্তর্বর্তী আরেকটি পোষক রয়েছে। তাঁদের সন্দেহের এই তালিকায় সাপের নাম উঠে আসে।

জার্নাল অব মেডিকেল ভাইরোলজিতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এই গবেষণা প্রকাশের পরপরই তৃতীয় আরেকটি গবেষণা এসে হাজির হয়। সেখানে বলা হয়, বাদুড় বা সাপ নয়; ঘটনাটি ঘটেছে কোনো স্তন্যপায়ীর প্রাণীর মাধ্যমে। যেমনটি ঘটেছিল সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে। সার্স এসেছিল স্তন্যপায়ী ছোট প্রাণী খাটাশ থেকে। নিশাচর এই প্রাণীর মাংস চীনে বেশ মূল্যবান।

বিজ্ঞাপন
default-image

বনরুই
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাউথ চায়না অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা বলেন, বাদুড় থেকে মানবদেহে নতুন করোনাভাইরাস আসার ক্ষেত্রে বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী বনরুইয়ের ভূমিকা থাকতে পারে। বনরুইয়ের আঁশ চীনে ওষুধে ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়া উহান শহরের হুনান বাজারে যেসব বন্য প্রাণী বিক্রি হয়ে থাকে, তার মধ্যে বনরুই অন্যতম। তবে বনরুই আসলেই করোনাভাইরাসের মধ্যবর্তী পোষক কি না, তা আর নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

default-image

ঝুঁকিতে কুকুর-বিড়াল
পোষা প্রাণী কুকুর, বিড়ালের পাশাপাশি বাঘ, সিংহ, হ্যামস্টার (একধরনের ইঁদুর) ও বেজিজাতীয় প্রাণী ফেরেটের শরীরে কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গৃহপালিত প্রাণীরা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তবে এসব প্রাণী থেকে মানুষের সংক্রমণ ঘটার কথা নয়।

মিঙ্ক
সন্দেহের এই কাতারে বেজিজাতীয় ছোট প্রাণী মিঙ্কও রয়েছে। মূল্যবান পশমের জন্য এই প্রাণীর চাষ করা হয়ে থাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। গত জুনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, নেদারল্যান্ডসে খামারের মিঙ্ক থেকে অনেক শ্রমিক সংক্রমিত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। অন্য প্রাণী থেকে মানবদেহে নতুন করোনাভাইরাস ছড়ানোর নিশ্চিত ঘটনা এটাই প্রথম হতে পারে। এরপর ডেনমার্ক, ফ্রান্স, গ্রিস, ইতালি, লিথুয়ানিয়া, স্পেন, সুইডেনসহ ইউরোপের অনেক দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে মিঙ্কের খামারে কোভিড–১৯ শনাক্ত হয়।

গত জুলাই ও আগস্টে নেদারল্যান্ডসে হাজার হাজার মিঙ্ক নিধন করা হয়। পরে বছরের শেষ দিকে ডাচ সরকার সব খামার বন্ধ ঘোষণা করলে লাখ লাখ মিঙ্ক নিধন করা হয়।
ডেনমার্ক সরকার গত নভেম্বরে দেশটিতে থাকা দেড় থেকে পৌনে দুই কোটি মিঙ্ক নিধনের নির্দেশ দেয়। দেশটির মোট জনসংখ্যার চেয়ে মিঙ্কের সংখ্যা তিন গুণ বেশি।

ডেনমার্ক সতর্কতা জারি করেছিল যে মিঙ্কে মিউটেশনের মাধ্যমে কোভিড-১৯–এর ‘ক্লাস্টার-৫’ ধরন আসে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের টিকার কার্যকারিতার জন্য হুমকি হতে পারে।

এখনো অজানা অন্তর্বর্তী পোষক
কোভিড-১৯–এর উৎস জানতে ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিনিধিদল চীনের উহান পরিদর্শন করেছেন। করোনার পোষক হিসেবে তাঁদের সন্দেহের তালিকায় বেজিসদৃশ ব্যাজার, র‌্যাকুন ও খাটাশ সবই ছিল। সোমবার এই গবেষক দলের একটি প্রতিবেদন এএফপির হাতে আসে। তাতে বলা হয়, ভাইরাসটি বাদুড় থেকে অন্তর্বর্তী কোনো প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই অন্তর্বর্তী পোষক কী, তা তাঁরা চিহ্নিত করতে পারেননি। বাদুড় থেকে সরাসরি ভাইরাসটি মানবদেহে আসার সম্ভাবনাও তাঁরা নাকচ করেননি।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন