default-image

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাবও পড়েছে জনজীবনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, করোনা মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে গত বছর প্রায় ১৪ লাখ যক্ষ্মা রোগী চিকিৎসাবঞ্চিত হয়েছে। অন্যান্য রোগ হিসাবে ধরলে এ সংখ্যা আরও অনেক বড় হবে।
বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস ২৪ মার্চ। এ দিবস সামনে রেখে ইউএন নিউজে বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই তথ্য তুলে ধরা হয়।

২০২০ সালের গোড়ার দিকে চীনের উহান থেকে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দ্রুতই রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে দেশে দেশে। ফলে চাপ বেড়ে যায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর। এ পরিস্থিতিতে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হতে থাকে।

করোনা মহামারির মধ্যে ২০২০ সালে যক্ষ্মার চিকিৎসাবঞ্চিত রোগী সবচেয়ে বেশি ছিল ইন্দোনেশিয়ায়। দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যক্ষ্মার চিকিৎসা নেওয়া রোগী আগের বছরের চেয়ে ৪২ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কমেছে ৪১ শতাংশ। আর ফিলিপাইন ও ভারতে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়েছেন যথাক্রমে ৩৭ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন

৮০টির বেশি দেশে যক্ষ্মা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪ লাখ যক্ষ্মা রোগী চিকিৎসাসুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় গত বছর বিশ্বজুড়ে যক্ষ্মার চিকিৎসা নেওয়া রোগী কমেছে ২১ শতাংশ।

এ সময় চারটি দেশের যক্ষ্মা পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারির মধ্যে ২০২০ সালে যক্ষ্মার চিকিৎসাবঞ্চিত রোগী সবচেয়ে বেশি ছিল ইন্দোনেশিয়ায়। দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যক্ষ্মার চিকিৎসা নেওয়া রোগী আগের বছরের চেয়ে ৪২ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কমেছে ৪১ শতাংশ। আর ফিলিপাইন ও ভারতে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়েছেন যথাক্রমে ৩৭ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ।

সংস্থাটির বরাতে ইউএন নিউজে বলা হয়েছে, কম রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন মানে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে, বিষয়টা এমন নয়। বরং করোনাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যক্ষ্মার চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এটা যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে আগের অর্জনগুলো ম্লান করে দিতে পারে।

এ বিষয়ে ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, গত বছর বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ করোনা সংক্রমিত হয়েছে। ওই সব দেশের অনেকেই যক্ষ্মার চিকিৎসাসেবা পাননি। অথচ দরিদ্র মানুষ যক্ষ্মার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।

যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে চলমান কার্যক্রমের কারণে ২০০০ সাল থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। অথচ করোনা মহামারিতে এসব কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনেক জায়গায় থমকে গেছে।

অগ্রাধিকার নির্বাচনে পিছিয়ে থাকা
করোনার মতো যক্ষ্মা ভাইরাসজনিত রোগ। ছোঁয়াচে ও প্রাণঘাতীও। ডব্লিউএইচও বলছে, প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৮ হাজার মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। মারা যান প্রায় ৪ হাজার মানুষ। তবে সময়মতো শনাক্ত করা গেলে ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে যক্ষ্মা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

এ জন্য যক্ষ্মা রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। চিকিৎসা নিতে হয়। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে চলমান কার্যক্রমের কারণে ২০০০ সাল থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। অথচ করোনা মহামারিতে এসব কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনেক জায়গায় থমকে গেছে।

ডব্লিউএইচওর মতে, করোনা, নাকি অন্যান্য রোগের চিকিৎসা—এ অগ্রাধিকার নির্বাচনে গত বছর করোনা এগিয়ে ছিল। এতে দেশে দেশে যক্ষ্মার মতো অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসা বিঘ্নিত হয়েছে। মহামারিতে একদিকে মানুষ সেবা নিতে কম আগ্রহী ছিল, অন্যদিকে অনেক দেশে স্বাস্থ্যসেবাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যা চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে।

তবে কয়েকটি দেশ করোনার মধ্যেও যক্ষ্মার চিকিৎসাসেবায় ভারসাম্য রাখতে সচেষ্ট ছিল। বুকের এক্স–রে করতে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার, বাসা থেকে যক্ষ্মার চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ অনেক দেশকে এগিয়ে রেখেছে। তা না হলে বৈশ্বিক যক্ষ্মা পরিস্থিতি আরও নাজুক হতো বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

গত বছর বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ করোনা সংক্রমিত হয়েছে। ওই সব দেশের অনেকেই যক্ষ্মার চিকিৎসাসেবা পাননি। অথচ দরিদ্র মানুষেরা যক্ষ্মার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক
বিজ্ঞাপন

বছরে এক কোটি শনাক্ত
নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নানা রকম উদ্যোগের পরও প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এক কোটি মানুষের নতুন করে যক্ষ্মা শনাক্ত হয় বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি বলছে, গত বছর বিশ্বজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাননি। তবে এটা নতুন সমস্যা নয়। করোনা মহামারির আগেও যক্ষ্মায় আক্রান্ত ও আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্তের সংখ্যায় ফারাক ছিল। তবে করোনা মহামারি এ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

শনাক্ত বাড়াতে মনোযোগ দিতে হবে
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে রোগটি শনাক্তকরণে আরও মনোযোগ দেওয়া জরুরি বলে মনে করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির মতে, নির্দিষ্ট কয়েকটি গোষ্ঠীর মানুষের যক্ষ্মা পরীক্ষা বাড়াতে হবে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাড়ির দৈনন্দিন কাজে জড়িত মানুষ, যাঁরা যক্ষ্মা ও এইডস রোগীর দেখভাল করেন, কারাবন্দী, খনিশ্রমিক প্রভৃতি।

এ ছাড়া শহরতলির দরিদ্র মানুষ, বস্তিবাসী, অভিবাসী, গৃহহীনদের মতো ঝুঁকির মুখে থাকা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষেরও যক্ষ্মার কমিউনিটিভিত্তিক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রোগটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মুখে খাওয়ার ওষুধের বিস্তৃত ব্যবহার আশা জাগাতে পারে।

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন