দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত বছরের ২৭ মার্চ থেকে দেশটিতে এ মহামারিতে (কোভিড–১৯) মারা গেছেন ৫৫ হাজার মানুষ। সেই হিসাবে দেশটিতে প্রতি লাখে করোনায় মৃত্যুহার ৯২ দশমিক ৭। সাব–সাহারা আফ্রিকা অঞ্চলে এটি সর্বোচ্চ। আবার এটি করোনার প্রকৃত হিসাবের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবমূল্যায়নও। দৃশ্যত, এমন ধারণা করাই নিরাপদ হবে যে আফ্রিকার অন্য সব দেশেও করোনায় মৃতের হিসাবে এ রকম অবমূল্যায়নের ঘটনা ঘটেছে।

গত ৮ মে পর্যন্ত আগের এক বছরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৯৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এক বছরে বাড়তি এত মানুষের মৃত্যুর এই চিত্র অতীতে মানুষের মৃত্যুর স্বাভাবিক ধারা থেকে ভিন্ন রকমের। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মকর্তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এক বছরে এ বাড়তি মানুষের ৮৫–৯৫ শতাংশের মৃত্যুর পেছনে রয়েছে সার্স–কোভ–২ (কোভিড–১৯) ভাইরাস। এতে করোনায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যা হবে তিন গুণ বেশি। হিসাবের এই ফারাকের কারণ, করোনায় মৃত হিসেবে কারও নথিভুক্তির আগে তার করোনা পরীক্ষা এবং এ রোগে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দক্ষিণ আফ্রিকা করোনা পরীক্ষা করেছে অনেক বেশি। তারপরও পরীক্ষার হার এখন পর্যন্ত কম। যাঁরা অসুস্থ হয়ে বাসাবাড়িতে মারা যান, তাঁদের মৃত্যুর কারণও সমভাবে নথিভুক্ত করা হয় না।

করোনা পরীক্ষার কম হার বা হাসপাতালের বাইরে করোনায় মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্তির ক্ষেত্রে ঘাটতির চিত্র শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য প্রযোজ্য নয়। করোনায় মারা যাওয়া বাড়তি মানুষের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে যোগ না হওয়ার ঘটনা বিশ্বের সব দেশে না ঘটলেও অধিকাংশ দেশে ঘটেছে। সাম্প্রতিকতম তথ্য–উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২০ সালের মার্চের শুরু থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃত মানুষের বাড়তি সংখ্যা সরকারিভাবে ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

আরও কয়েকটি দেশে গবেষণায় এমন গরমিল প্রমাণিত হয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্যে দেখা গেছে, করোনার প্রথম দফা ঢেউ চলাকালে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে বেশি। কিন্তু দ্বিতীয় দফার ঢেউয়ে তা ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে কম। কারণ, দ্বিতীয় দফায় করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাতে অন্য বছর মৌসুমি ফ্লুর মতো রোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এ বছর এমন রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষকে বাঁচানো গেছে। দ্বিতীয় দফা করোনা ঢেউয়ে মৃতের হিসাব অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি সেভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফ্রান্সেও প্রায় একই রকমের চিত্র দেখা গেছে।

করোনায় দেশে দেশে মৃত মানুষের বাড়তি সংখ্যা বৈশ্বিক গণনায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার পেছনে অধিকাংশ দেশ, বিশেষত বেশির ভাগ দরিদ্র দেশের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ কারণ রয়েছে। তা হলো, বাড়তি সংখ্যার হিসাব দেশগুলো সময়মতো সরবরাহ করে না। বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সরবরাহ করা তথ্যই শুধু ব্যবহার করা হয়; যদিও এটা জানা, করোনায় ৩৩ লাখ মৃত্যুর বর্তমান সংখ্যাটি প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম।

করোনায় মৃত্যুর বৈশ্বিক পরিসংখ্যান থেকে কতজন বাদ পড়েছে, মৃতের সত্যিকার সংখ্যাই–বা কত, তা বিশেষ মডেলিংয়ের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চালিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। এতে দেখা গেছে, করোনায় এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৭১ লাখ থেকে ১ কোটি ২৭ লাখের মধ্যে। এ সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য সংখ্যাটি ১ কোটি ২০ লাখ। বিভিন্ন দেশের সরকারি পরিসংখ্যানে মৃতের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা প্রকৃত সংখ্যার বড়জোর অর্ধেক। আর নিদেনপক্ষে এক–চতুর্থাংশ।

এই মডেলিং করোনা মহামারির সার্বিক আকার সম্পর্কে যেমন একটি নতুন ধারণা দেয়, তেমনি করোনার প্রভাব ও সার্বিক গতিধারার ওপরও আলোকপাত করে।

এটি বিস্ময়ের নয়, করোনায় মারা গেছেন অথচ করোনায় মৃত ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত হননি—এমন ঘটনার অধিকাংশ ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। আমাদের হিসাবে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ধনী দেশে মৃতের সংখ্যা সরকারঘোষিত সংখ্যার চেয়ে ১ দশমিক ১৭ গুণ বেশি। সাব–সাহারা অঞ্চলে মৃতের এই আনুমানিক হার ১৪ গুণ বেশি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে করোনার প্রথম এবং দ্বিতীয় দফার চিত্র এই মডেলের পরিসংখ্যানে তুলনামূলকভাবে অনেক কম দৃশ্যমান হয়েছে। সার্বিকভাবে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে এ মহামারি ক্রমেই বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং এর সংক্রমণ বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।

সাধারণভাবে, যদি দেখা যায় ব্যাপকসংখ্যক পরীক্ষায় পজিটিভ ফল আসছে, তবে ন্যায্যভাবে এটা ধরে নেওয়া যায়, আরও অনেক পজিটিভ ব্যক্তি আছেন, যাঁরা পরীক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। কেননা, যাঁরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হাসপাতালে আসছেন, শুধু তাঁদেরই এ পরীক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে।

কিছু স্থানে বিশেষ ধরনের জরিপ চালানো হয়েছে। কতজনের দেহে শনাক্তযোগ্য সার্স–কোভ–২ অ্যান্টিবডি রয়েছে, তা জরিপে উঠে এসেছে। এই অ্যান্টিবডি ইতিপূর্বে করোনায় সংক্রমিত হওয়ার একটি লক্ষণ। অথচ এ ধরনের অনেকের করোনা পরীক্ষা করা হয়নি। করোনা পরীক্ষা থেকে দূরে থাকার নানা কারণের একটি হতে পারে, মহামারির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে বিভিন্ন দেশের সরকারের আরোপ করা বিধিনিষেধ। যেমন স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া, জনসাধারণের চলাচল সীমিত করা ইত্যাদি।

কোনো দেশের সরকারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও মৃতের সঠিক পরিসংখ্যান তৈরিতে ভূমিকা রাখে। সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে রাশিয়ার কথা বলা যায়। দেশটিতে করোনায় মৃত মানুষের বাড়তি সংখ্যা সরকারঘোষিত সংখ্যার চেয়ে ৫ দশমিক ১ গুণ বেশি।

গবেষণায় দুই শতাধিক দেশ ও অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ১২১টি নির্দেশকের ওপর। এরপর এসব নির্দেশক এবং যেসব দেশ থেকে বাড়তি মৃতের সংখ্যার তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ে বিশেষ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব দেশ থেকে বাড়তি মৃতের সংখ্যার তথ্য পাওয়া যায়নি, সেসব ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে এ মডেল।

আমাদের ধারণা, এশিয়ায় ১০ মে পর্যন্ত এ মহামারিতে অতিরিক্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ থেকে ৭১ লাখ। এই সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এশিয়ায় মৃতের সংখ্যা ৬ লাখ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত মৃতের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ১৮ লাখ; সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ৬ লাখ। আফ্রিকায় অতিরিক্ত মৃতের সংখ্যা ০–২১ লাখ, সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ। ইউরোপে অতিরিক্ত মৃতের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ১৬ লাখ, সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ১০ লাখ। আমেরিকা ও কানাডায় অতিরিক্ত মৃতের সংখ্যা ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ, সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ৬ লাখ। ওশেনিয়ায় সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২১৮। কিন্তু গবেষণা মডেলের অনুমান, এটি হবে ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার।

এশিয়া ও আফ্রিকার ক্ষেত্রে মৃতের হিসাবের ফারাক নাটকীয়ভাবে অনেক ব্যাপক। এ দুই স্থানে বিরাট ফারাক হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা, যে তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে মজবুত ধারণা করা সম্ভব, এই স্থানগুলো থেকে সেসব তথ্য পাওয়া সহজলভ্য ছিল না। এ দুই অঞ্চলের কোনো কোনো দেশ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়াই যায়নি। হিসাবে বিরাট ফারাক থাকলেও গবেষণায় পাওয়া এ চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানে পাওয়া চিত্র থেকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।

২০২০ সালে ৫২ সপ্তাহের মধ্যে ৩৩ সপ্তাহেই প্রতিদিন করোনায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে। ২০২১ সালের শুরুতে স্বল্প সময়ের জন্য মৃতের সংখ্যা তেমন বাড়তে দেখা না গেলেও পরে আবারও এর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ প্রবণতার বড় অংশজুড়ে আছে ভারতের পরিস্থিতি। আমাদের মডেলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, দেশটিতে দৈনিক ৬ হাজার থেকে ৩১ হাজার অতিরিক্ত মানুষ মারা যাচ্ছেন। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে তা ৪ হাজারের মতো বলা হচ্ছে। গবেষণা বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ভারতে করোনায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা গিয়ে থাকতে পারেন।

আশপাশের দেশে সংক্রমণ কম থাকায় ভারতের বর্তমান বিপর্যয়কর পরিস্থিতিও হয়তো শেষ পর্যন্ত কমে আসবে। তার অর্থ এই নয় যে বৈশ্বিক পরিস্থিতিরও রাতারাতি উন্নতি ঘটবে। করোনার বিভিন্ন ঢেউ চলাকালে একই স্থানে সংক্রমণ পরিস্থিতির উত্থান–পতন হতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রথম দফার ঢেউয়ে কোনো কোনো দেশ খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে যায়। পরে কঠোর পদক্ষেপে দেশগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে। কড়াকড়ি যখন শিথিল করা হয়, তখন দ্বিতীয় দফা ঢেউয়ের সূত্রপাত ঘটে। এ কারণে এখন পর্যন্ত ১৫ মাসের মধ্যে ১০ মাসেই বিশ্বজুড়ে দৈনিক মৃত্যুহার বেড়েছে।

এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে করোনায় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো সার্বিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ধনী দেশগুলোতে। উদাহরণ হিসেবে, এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রতি ১০ লাখ মানুষে মৃতের যে গড় আনুমানিক সংখ্যা, তা ইউরোপের (রাশিয়াসহ) প্রায় অর্ধেক। এ ক্ষেত্রে অন্তত এ মুহূর্তে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ভারতের তুলনা করা যায়।

ইউরোপীয়দের কাছে এটি বিস্ময়ের। কেননা, বছরের একটা বড় সময় ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউন চলেছে। দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও উন্নত। বিপরীতে, দরিদ্র দেশসমূহে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ায় ছিল নানান ঘাটতি। স্বাস্থ্যব্যবস্থাও ভুগছে আর্থিক সংকটে। তবে ইউরোপীয়দের বিস্ময়ের জবাব সম্ভবত লুকিয়ে আছে দরিদ্র দেশগুলোর জনসংখ্যার বেশির ভাগ মানুষের বয়সের মধ্যে। যদি দুটি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার মান একই হয়, তবে যে জনগোষ্ঠীতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি, তাতে মৃতের সংখ্যা বেশি হবে। কিন্তু জনগোষ্ঠীর বয়সই যদি মৃত্যুহার বেশি হওয়ার একমাত্র কারণ হয়, তবে জাপানে (মধ্যবয়স ৪৮ বছর) মৃতের সংখ্যা উগান্ডার (মধ্যবয়স ১৭ বছর) চেয়ে ১৩ গুণ বেশি হওয়া উচিত।

পরিশেষে বলতে হয়, করোনাভাইরাসে বাড়তি মৃত মানুষের সংখ্যা নিয়ে এ পরিসংখ্যান আমাদের জানামতে এটি প্রথম। তবে শুধু এ পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে করোনায় মোট মৃত মানুষের সংখ্যা বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না। কেননা, পরিসংখ্যান যেভাবেই তৈরি করা হোক, অনুমান তথ্য–উপাত্তের বিকল্প হতে পারে না।

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌