default-image

‘যার হয় যক্ষ্মা, তার নেই রক্ষা’। একটা সময়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরত এ কথা। সংক্ষেপে ‘টিবি’ নামের এই সংক্রামক রোগ এতটাই ভয়ংকর ছিল। সেই রোগ রুখে দিতে উদ্ভাবিত হয়েছিল বিসিজি টিকা। ১৯২১ সালের এই টিকা এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রতিরোধের লড়াইয়ে।
বিবিসির এক প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী ইতিমধ্যে পরীক্ষা শুরু করেছেন বৈশ্বিক মহামারি করোনার হাত থেকে বিসিজি টিকা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে কি না। দেশটির ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের এক পরীক্ষামূলক প্রয়োগে (ট্রায়াল) অংশ নিচ্ছেন ১ হাজারের মতো মানুষ। আরও কয়েকটি দেশ মিলিয়ে মোট ১০ হাজার মানুষকে এই পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

বিসিজি টিকা যক্ষ্মা প্রতিরোধের উপযোগী করে তৈরি হলেও এটা আরও কিছু সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধেও কাজ করে বলে প্রমাণ রয়েছে। সাধারণত শিশু বয়সে এই টিক প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। শিশুকালে যাঁদের এই টিকা দেওয়া আছে, তাঁদের আবার এই টিকা দিলে উপকার মিলবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন
গিনি-বিসাউয়ে নবজাতকের মৃত্যুহার ৩৮ শতাংশ কমিয়ে দিতে পেরেছে বিসিজি টিকা। মূলত বিসিজি টিকা প্রয়োগ করে নিউমোনিয়া ও সেপসিস কমানোর মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়।

টিকা তৈরি করা হয় দেহের রোগপ্রতিরোধের ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে। একটা টিকা কোনো একটা বিশেষ সংক্রমণের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া দেহের প্রতিরোধব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনও ঘটিয়ে দেয়। দৃশ্যত এ কারণেই অন্যান্য সংক্রমণের ক্ষেত্রে একই টিকায় উপকার মিলতে পারে। যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা এই জায়গাতেই আশাবাদী হতে চাইছেন। তাঁদের আশা, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের দেহকে একটা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে বিসিজি টিকা।
এর আগের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, গিনি-বিসাউয়ে নবজাতকের মৃত্যুহার ৩৮ শতাংশ কমিয়ে দিতে পেরেছে বিসিজি টিকা। মূলত ওই টিকা প্রয়োগ করে নিউমোনিয়া ও সেপসিস (‍শরীরে ক্ষত সৃষ্টিকারী অসুখ) কমানোর মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকায় গবেষণায় দেখা গেছে, নাক, গলা ও ফুসফুসের সংক্রমণ ৭৩ শতাংশ কমে যাওয়ার সঙ্গে এই টিকার যোগসূত্র রয়েছে। আর নেদারল্যান্ডসের গবেষণায় বিসিজি টিকার কারণে দেহে হলুদ ভাইরাস জ্বরের পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।

সুনির্দিষ্টভাবে কোভিডের বিরুদ্ধে এই সুরক্ষা মিলবে, তা আমরা মনে করছি না। কিন্তু করোনার কার্যকর টিকা আবিষ্কার করতে এবং অন্যান্য চিকিৎসা তৈরি করতে হয়তো কয়েক বছর লেগে যাবে। তার আগপর্যন্ত বিসিজি টিকা একটা সম্ভাবনা দেখাতে পারে।
অধ্যাপক জন ক্যাম্পবেল, মেডিকেল স্কুল, ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার, যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক জন ক্যাম্পবেল বিবিসিকে বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে এটা হতে পারে একটা বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুনির্দিষ্টভাবে কোভিডের বিরুদ্ধে এই সুরক্ষা মিলবে, তা আমরা মনে করছি না। কিন্তু করোনার কার্যকর টিকা আবিষ্কার করতে এবং অন্যান্য চিকিৎসা তৈরি করতে হয়তো কয়েক বছর লেগে যাবে। তার আগপর্যন্ত বিসিজি টিকা একটা সম্ভাবনা দেখাতে পারে।’
যুক্তরাজ্যে বিসিজি টিকার এই পরীক্ষামূলক প্রয়োগ আন্তর্জাতিক একটা গবেষণার অংশ। এর আওতায় অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, স্পেন এবং ব্রাজিলেও কাজ চলছে। সব মিলিয়ে ১০ হাজার মানুষকে নিয়ে এই ট্রায়াল চলবে। মূলত স্বাস্থ্যকর্মীদের দেহে টিকা প্রয়োগ করা হবে, যাঁরা করোনাভাইরাসের ঝুঁকিতে আছেন সবচেয়ে বেশি। গবেষকেরা আশা করছেন, এই পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা দ্রুত বুঝতে পারবেন, আসলেই এই টিকা কার্যকর কি না।
ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের একজন স্যাম হিলটন। ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের এই চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন, ‘করোনায় সংক্রমিত হলেও বিসিজি টিকা নিলে আপনি খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বেন না, এর সপক্ষে একটা ভালো তত্ত্ব রয়েছে। সুতরাং, আমি কিছুটা হলেও সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা দেখছি।’

বিজ্ঞাপন
সমস্যাটা হচ্ছে, আমি এটা বলতে পারি না যে অন্য কোনো টিকা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আপনার রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতাকে উন্নত করতে পারবে। কারণ, আমাদের হাতে এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই।
অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড, অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ

সম্প্রতি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট–এ এক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, করোনার জন্য সুনির্দিষ্ট টিকা আবিষ্কারের আগের শূন্যতা পূরণ করতে পারে বিসিজি টিকা। ওই গবেষণা নিবন্ধের লেখকদের একজন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক চিকিৎসক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস নিজেও। নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিসিজি টিকা হতে পারে কোভিড-১৯ বা ভবিষ্যৎ কোনো বৈশ্বিক মহামারির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
তবে বিসিজি টিকা কোনোমতেই দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। এই টিকার কার্যকারিতা সময়ের ব্যবধানে কমে আসে। অর্থাৎ, শিশুকালে যাঁরা বিসিজি নিয়েছেন, বয়স বাড়লে যে তাঁদের শরীর সুরক্ষিত থাকবে, তা বলার সুযোগ নেই। তা ছাড়া করোনার বিরুদ্ধে লড়তে হলে দেহে অ্যান্টিবডি ও বিশেষায়িত শ্বেতরক্তকোষ উৎপাদনের দরকার পড়ে। দেহের রোগপ্রতিরোধের ব্যবস্থাকে সে পথে নিতে সক্ষম নয় বিসিজি টিকা।
অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড বলেন, ‘আপনি যে জীবাণু প্রতিরোধ করতে চাইছেন, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে সাড়া দেওয়ার উপযোগী করেই বেশির ভাগ টিকা তৈরি।...সমস্যাটা হচ্ছে, আমি এটা বলতে পারি না যে অন্য কোনো টিকা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আপনার রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতাকে উন্নত করতে পারবে। কারণ, আমাদের হাতে এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই।’

মন্তব্য পড়ুন 0