বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক মাইকেল বুস্তামান্তে বিবিসিকে জানান, ১৯৯৪ সালের পর কিউবায় এত বড় পরিসরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়নি। শুধু রাজধানীতে নয়, পুরো কিউবায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

‘দিয়াজ–ক্যানেল পদত্যাগ করুন’ স্লোগানে মুখর কিউবার রাজপথ। হাভানায় বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন নাচের শিক্ষক মিরান্ডা লাজারা। ৫৩ বছর বয়সী এই নারী বলেন, ‘আমরা আসলেই ভীষণ কঠিন সময় পার করছি। আমরা প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই।’

তবে প্রশ্ন হলো হঠাৎ কেন কিউবাবাসী ফুঁসে উঠলেন? কেনইবা রাজপথে নজিরবিহীন প্রতিবাদ–বিক্ষোভ দেখা গেল? আজ সোমবার প্রকাশিত বিবিসির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিক্ষোভের পেছনে করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা—মোটাদাগে এই তিনটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

করোনা মহামারি
করোনা মহামারির জের ধরে কিউবার মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতে তৈরি হয়েছে গভীর সংকট। এই পরিস্থিতি সরকারের বিরুদ্ধে কিউবার সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। যদিও গত বছর দেশটিতে করোনা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে গেছে।

গত রোববার দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ৬ হাজার ৭৫০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন ৩১ জন। অভিযোগ রয়েছে, কিউবা সরকার করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা লুকোচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কেননা গত সপ্তাহে দেশটিতে করোনার দৈনিক সংক্রমণ শনাক্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে। হাসপাতালে রোগীর ভিড় বেড়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক করোনা রোগী প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে কিউবার বাসিন্দা লিসভেইলিস একেনিক ও লেনিয়ারা মিগুয়েল পি রেজের সঙ্গে কথা বলেছেন বিবিসির প্রতিনিধি। লিসভেইলিসের ৩৫ বছর বয়সী ভাই ও লেনিয়ারের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাড়িতেই মারা গেছেন। তাঁরা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, হাসপাতালে শয্যা খালি ছিল না। সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা মিলেনি। সেবা না পেয়ে বাড়িতেই মারা গেছেন তাঁদের স্বজনেরা।

এই সংকটে মানবিক সহায়তা পেতে সম্প্রতি দেশটিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘#এসওএসকিউবা’ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। হাসপাতালে করোনা রোগীদের অনেক ভয়াবহ ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এই পরিস্থিতি সরকারের বিরুদ্ধে কিউবানদের ক্ষোভের মাত্রা বাড়িয়েছে; যার বহিঃপ্রকাশ রোববারের উত্তাল রাজপথ।

তবে রোববারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে দেশটির প্রেসিডেন্ট দিয়াজ–ক্যানেল দাবি করেন, অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় কিউবার করোনা পরিস্থিতি এখনো সহনীয় রয়েছে। এমনকি কিউবা করোনার বিরুদ্ধে লড়তে নিজস্ব টিকা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে।

সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
কিউবার অর্থনীতির অন্যতম আয়ের উৎস পর্যটন। তবে করোনা মহামারির কারণে পর্যটন খাত পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশটির পর্যটনকেন্দ্রিক জনজীবন ও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দেশটিতে চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে।

খাবার–ওষুধ–জ্বালানির মতো নিত্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুর সময় থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে গেছে। কিউবা সরকার অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা জানিয়েছে। মজুরি বৃদ্ধি ও বাড়তি দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানার কথা জানিয়েছে। তবে সরকারি এসব উদ্যোগে জনগণের ক্ষোভ কমেনি।

কলম্বিয়ার পন্টিফিশিয়া জাভেরিয়ানা ইউনিভার্সিটি অব কালির অর্থনীতিবিদ পাভেল ভিদাল বলেন, আগামী কয়েক মাসে কিউবায় নিত্যপণ্যের দাম ৫০০ থেকে ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে সরকারের প্রতি জনরোষ আরও বাড়বে।

গত বছরের শেষ নাগাদ কিউবা সরকার দেশজুড়ে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দোকান খুলেছে। এসব দোকানে বিদেশি মুদ্রা ব্যবহার করে খাবার ও নিত্যপণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে। তবে কিউবানরা নিজস্ব মুদ্রা পেসোতে পণ্য কিনতে চান। এটাও কিউবানদের ক্ষোভের অন্যতম একটি কারণ।

গমের আটার না পাওয়ায় কিউবার অনেক জায়গায় কুমড়া থেকে তৈরি রুটি বিক্রি হচ্ছে। মহামারির সময় দেশটিতে তেল, সাবান ও মুরগিও প্রয়োজনের তুলনায় কম পাওয়া যাচ্ছে। ওষুধের দোকান ও হাসপাতালে মিলছে না অ্যাসপিরিনের মতো প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। এসব কারণে জনগণের মনে ধীরে ধীরে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন।

কয়েক বছর ধরে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে কিউবা। গত বছর দেশটির অর্থনীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। আর চলতি বছরের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত এই হার ২। তবে দেশটির সরকারের দাবি, চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে করোনা মহামারি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার মতাদর্শিক বিরোধ চলে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটির বিরুদ্ধে চলমান নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে ওয়াশিংটন।

ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
কিউবাবাসী সবশেষ বড় বিক্ষোভ দেখেছিল ১৯৯৪ সালের আগস্টে। তবে ওইসময় রাজধানীর হাভানার অনেক মানুষ জানত না দেশে কী হচ্ছে। এখন সময় বদলেছে। বিশেষত সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর আমলে দেশটি অনেকটাই উদার নীতি নিয়েছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগামোগমাধ্যম ব্যবহারের অনুমতি মিলেছে; যা কিউবার বর্তমান প্রজন্মকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে।

এসব উপায়ে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিতি বেড়েছে কিউবার তরুণদের। একই সঙ্গে বেড়েছে সরকারের প্রতি হতাশা ও ক্ষোভ। বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে তাঁরা ক্ষোভ ঝাড়ছেন। রোববারের বিক্ষোভে তরুণদের সংগঠিত হতে ভূমিকা রেখেছে ইন্টারনেট এবং ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারের মতো সামাজিক যোগামোগমাধ্যম।

বিষয়টি কিউবা সরকারের নজরেও এসেছে। বিক্ষোভের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে দিয়াজ–ক্যানেল বলেন, বিক্ষোভকারীদের অনেকেই সচেতন। তবে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র সমর্থকদের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছেন। এ সময় তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, কোনো উসকানি সহ্য করা হবে না।

উসকানির অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ রয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ করেছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ–ক্যানেল। তাঁর ভাষ্য, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিরোধী পক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে উসকে দিচ্ছে। এটা সিআইএর (মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা) অন্যতম একটি কৌশল।

এদিকে কিউবায় চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও তা দমনে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, কিউবার জনগণের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রয়েছে। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করায় ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সোমবার বলেন, ‘আমরা কিউবার জনগণের পাশে আছি। নিজ দেশের জনগণের অভাব ও নিপীড়ন দূর করার নজিরবিহীন ডাক দেশটির স্বৈরাচারী সরকারের শোনা উচিত।’
* বিবিসি ও রয়টার্স অবলম্বনে অনিন্দ্য সাইমুম

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন