বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিছু ভালো সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই পাওয়া গেছে, যেগুলোকে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে কেউ কেউ যুগান্তকারী বলে দাবি করছেন। তবে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে যাঁরা চিন্তিত, যাঁরা সত্যিই বিশ্বাস করেন, একটি দিনের বিলম্বও পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, তাঁদের হতাশা ও ক্ষোভ মোটেও উপেক্ষণীয় নয়। বিপন্নবোধ করেছে জলবায়ু–ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো। তাদের কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে মালদ্বীপের প্রতিনিধির কণ্ঠে যখন তিনি বলেন, মালদ্বীপের জন্য এতে খুব দেরি হয়ে যাবে।

default-image

সরকারি প্রতিনিধিরা কূটনৈতিক রীতিনীতির কারণে অনেক কথাই বলতে পারেন না। কিন্তু নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিরা তা বলতে পারেন, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সমাজে। বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোট কপ ২৬ কোয়ালিশনের মুখপাত্র আসাদ রেহমান বলেছেন, এই চুক্তি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। জলবায়ুজনিত জরুরি অবস্থার বিষয়ে ধনী দেশগুলোর ফাঁকা বুলিতে বিজ্ঞান এবং ন্যায়বিচার চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। ধনী দেশগুলো তাদের কারণে সৃষ্ট সমস্যায় সংকটে পড়া দরিদ্র দেশগুলোর অর্থায়নের প্রশ্নে ফাঁপা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

সম্মেলন থেকে যেসব পদক্ষেপের ঘোষণা এসেছে, তার মধ্যে আছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমিত রাখার লক্ষ্য অর্জনের প্রতি অঙ্গীকার; অভিযোজন, অর্থাৎ জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণে যে বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন, তার স্বীকৃতি এবং প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দিতে উৎসাহিত করা। কার্বন গ্যাসের লেনদেনে স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্যারিস রুল বুক নামে পরিচিত বিধিমালাও চূড়ান্ত হয়েছে গ্লাসগো সম্মেলনে। সর্বোপরি, এখন গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোসহ সংকট মোকাবিলায় প্রতিটি দেশকে প্রতিবছর তাদের জাতীয় ভূমিকার অঙ্গীকার বা এনডিসি হালনাগাদ করতে হবে, যাতে বার্ষিক পর্যালোচনার কারণে বড় দূষণকারীদের ওপর কিছুটা চাপ বাড়বে।

এ ছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে আরও কয়েকটি ঘোষণা এসেছে, সেগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে কার্বনসহ অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস উদ্‌গিরণ কমানোর লক্ষ্যে বন উজাড়করণ বন্ধ, মিথেন গ্যাস উদ্‌গিরণ বন্ধ, নেট জিরো (ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন যতটা হবে, বায়ুমণ্ডল থেকে ততটাই অপসারণ করে ভারসাম্য আনা) অর্জনে বেসরকারি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। গতকাল কপ সভাপতি অলোক শর্মা বিবিসিকে জানিয়েছেন, গ্লাসগো সম্মেলনের আগে নেট জিরোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল ৩০টি দেশ, যার সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৯০।

গ্লাসগোয় অবশ্য কূটনৈতিক দিক দিয়ে এক চমকপ্রদ অগ্রগতি আছে, যা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলেই সবার ধারণা। প্রায় সব বিষয়ে বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেওয়ায় অভ্যস্ত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিস্ময়কর সহযোগিতার ঘোষণা গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো ও বনাঞ্চল রক্ষার ক্ষেত্রে যেমন আশা জাগিয়েছে, তেমনই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে যে সিদ্ধান্তটি, সেটি হলো কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি অবসায়নের প্রস্তাব। শেষ মুহূর্তে ভারতের আনা সংশোধনী পর্যায়ক্রমে অবসায়নের (ফেজ আউট) বদলে পর্যায়ক্রমে কমানো (ফেজ ডাউন) নিয়ে যথেষ্ট নাটকীয়তাও দেখা গেছে। গত ৩০ বছরে অর্থাৎ আগের ২৫টি কপ সম্মেলনে কখনোই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো বা ভর্তুকির ইতি ঘটিয়ে তা নিরুৎসাহিত করার কথা আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় স্থান পায়নি। কিন্তু এবার এগুলোর অন্তর্ভুক্তিকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

গ্লাসগো সম্মেলনের খসড়াটি গৃহীত হওয়ার পর জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস তাঁর বিবৃতিতে বলেছেন, এসব পদক্ষেপকে স্বাগত জানাতে হয়, কিন্তু এগুলো যথেষ্ট নয়। জরুরি অবস্থায় যা করণীয়, তা না করলে নেট জিরোতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা শূন্য। তিনি বলেছেন, এই বিবৃতিতে বিভিন্ন স্বার্থ, পরিস্থিতি, দ্বন্দ্ব এবং বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গভীর দ্বন্দ্বগুলো কাটিয়ে ওঠার মতো যথেষ্ট সম্মিলিত রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাব ছিল না।

সম্মেলনে যা অর্জিত হয়নি, সেগুলোরও উল্লেখ পাওয়া যায় জাতিসংঘ মহাসচিবের বিবৃতিতে। এগুলো হলো জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করা, কয়লার অবসান, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহায়তায় ১০ হাজার কোটি ডলার অর্থায়নের অঙ্গীকার পূরণ।

শীর্ষ দূষণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলো এবং কম দূষণকারী কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট সম্মেলনের পুরোটা সময় জুড়ে শোনা গেছে। ধনী দেশগুলো কয়লাসহ জীবাশ্ম জ্বালানি দেদার ব্যবহার করে জলবায়ুর যে ক্ষতি করেছে, তার ঐতিহাসিক দায় গ্রহণ না করলেও গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে ক্ষতিকর গ্যাস উদ্‌গিরণ বন্ধের জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি তাই অনিষ্পন্ন থেকে যাচ্ছে।

১৩ নভেম্বর গ্লাসগো চুক্তি হয়েছে। ঠিক ৫১ বছর আগে (১২ ও ১৩ নভেম্বর) বাংলাদেশের উপকূলে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জোটের (সিভিএফ) নেতৃত্বেও এখন বাংলাদেশ। সিভিএফের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী গত শুক্রবার সম্মেলনে আহ্বান জানিয়েছিলেন যে জলবায়ু সংকটের আশু বিপদ বিবেচনায় নিয়ে সম্মেলনের সিদ্ধান্তকে গ্লাসগো জরুরি চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হোক। যে প্রত্যাশা থেকে তিনি প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন তা পূরণ হয়েছে কি না, প্রথম আলোর এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি একে চরম হতাশাজনক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ইউএনএফসিসিসির বিদ্যমান কর্মপদ্ধতিতে আমাদের কতটা সাহসী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, এখন সেই প্রশ্ন করার সময় এসেছে। কপ ২৬–এর ফলাফলে বিজ্ঞান যে কার্যক্রম দাবি করে, সেটাও যেমন প্রতিফলিত হয়নি, তেমনি প্রতিফলিত হয়নি আকাঙ্ক্ষা। সবাই সব বিষয়ে একমত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সমঝোতা না হওয়ার নীতির মানে হচ্ছে আপসরফা—ন্যূনতম যতটুকু সম্মত হওয়া যাবে, ততটুকুই অর্জন।

বোঝাই যাচ্ছে এ ধরনের বহুজাতিক কাঠামোয় জরুরি অবস্থা মোকাবিলাও কঠিন সংগ্রামের বিষয়। সে কারণেই সম্মেলনে প্রতিনিধিদের অনেকেই বলেছেন, তাঁরা লড়াইটা আগামী জলবায়ু সম্মেলনে (কপ ২৭) মিসরের শারম-আল শেখে নিয়ে যাবেন। আর জাতিসংঘের মহাসচিব এক টুইটে তরুণদের উদ্দেশে বলেছেন, লড়াইয়ে তিনি তাঁদের সঙ্গে আছেন।

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন