নজর রাখতে হবে ১০ সংঘাতের দিকে

বিজ্ঞাপন

কোনো নির্দিষ্ট এক সময়ে বৈশ্বিক প্রবণতা কেমন হবে, তার অনুমান কঠিন এক কাজ। তবে আঞ্চলিক বিভিন্ন ঘটনার দিকে নজর রাখলে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক পরিসরে আঞ্চলিক বিভিন্ন ঘটন-অঘটনকেই বৈশ্বিক প্রবণতার দর্পণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটের উত্থান, আবর্তন ও সমাধানের পথই আদতে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের নবায়ন ঘটায়।

বলা নিষ্প্রয়োজন, বিশ্বের বিদ্যমান ও আশু পরাশক্তিগুলো বরাবরই পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে তাদের ভূমিকা এবং ওই সংঘাতে বিজয়ী ও বিজিত পক্ষের পরিচয়ই এ প্রতিযোগিতায় নিয়ে আসে নতুন সমীকরণ।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাটির নির্মাতা মোটাদাগে যুক্তরাষ্ট্র। তাই দেশটির শত্রু-মিত্রনির্বিশেষে সবার দৃষ্টিই থাকে এর অনুসৃত বিভিন্ন নীতির ওপর। মুশকিল হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কারও পক্ষেই আর নিশ্চিত হওয়ার সুযোগটি থাকছে না। বিভিন্ন বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রাখতে না পারা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে তার নিজেকে প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্পষ্টত তার বর্তমান অবস্থান ‘দায়হীন মোড়লিপনার’ দিকে।

ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের পথেই বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজছে। আর এই সমাধান খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে অস্থিরতা। এই অস্থিরতাগুলোই নিশ্চিতভাবে আগামী দিনের বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চটি তৈরি করছে। সে হিসেবে গোটা বিশ্ব এখন এক অবস্থান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলা যায়। এ হিসেবে ২০২০ সালের প্রাক্কালে বসে ভাবি, বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ে করা যেকোনো অনুমান আদতে আর একটি বছরে আবদ্ধ থাকছে না, এটি বর্ধিত হয়ে দশকের ব্যাপ্তি নিয়ে নিচ্ছে।

আর এই বিস্তৃত পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্য খেলোয়াড়দের নাম করতে গেলে শুরুতেই আসবে চীন এবং তারপরই অবধারিতভাবে রাশিয়া। কিন্তু এই শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মঞ্চ হিসেবে হাজির হবে অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো ও তাদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা। এসব আঞ্চলিক মঞ্চে মূল শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জয়-পরাজয়ই নির্ধারণ করে দেবে যে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতোই এক মেরু বিশ্বকাঠামো ধরে রাখতে পারবে কি না, নাকি তা একাধিক শক্তির মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রশক্তিগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে, যারা নতুন প্রেক্ষাপটে নিজেরাই স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে হাজির হতে পারে। ন্যাটোর ৭০ বছর পূর্তির বছর জোটটি নিয়ে যে অস্বস্তি দেখা গেল, তা অন্তত এমন সম্ভাবনাকে খারিজ করে না। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান ১০টি সংঘাতের দিকে আগামী বছর নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছে ফরেন পলিসি।

default-image

আফগানিস্তান
বিশ্বে চলমান সংঘাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে আফগানিস্তানে। আগামী বছর এ সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান আসার সম্ভাবনা থাকলেও বৈশ্বিক রাজনীতিতে আফগান ইস্যু এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গত দুই বছরে দেশটিতে তালেবান ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হামলার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ওয়াশিংটন ও কাবুলের যৌথ অভিযানের সংখ্যা। বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দুর্দশা আগের চেয়ে বেড়েছে বৈ কমেনি। এর মধ্যেই দেশটিতে হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর আশরাফ ঘানি জিতেছেন। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল জানুয়ারির শেষ দিকে পাওয়া যাবে। এই নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে, যা আসছে বছরে দেশটিতে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয় না। দেশটির পরিস্থিতির আরেকটি নিয়ামক হচ্ছে তালেবান। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্প্রতি আলোচনা শুরু করেছে ওয়াশিংটন। এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল। কথা ছিল আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তালেবান গোষ্ঠী আল-কায়েদার সঙ্গে নিজেদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের জের ধরে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুই মাসের মাথায় তা আবার শান্ত হয়ে এলেও তা যে শেষ পর্যন্ত একটি কার্যকর শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। মার্কিন সমর্থিত সরকার থাকা অবস্থায় শেষ পর্যন্ত দুপক্ষ এমন চুক্তিতে সম্মত হলে তা নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় হিসেবে প্রতীয়মান হবে।

default-image

ইয়েমেন
নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে অমানবিক পরিস্থিতিটি এখন বিরাজ করছে ইয়েমেনে। দেশটিতে চলা গৃহযুদ্ধে বড় কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি পরোক্ষভাবে লিপ্ত। ২০২০ সালে সেখানে শান্তি স্থাপনের এক বিরল সুযোগ আসছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের আলোচনা আশার আলো দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়া দেশটির মানুষের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী আছে, তা অবশ্য এখনো অনেকটাই নির্ভর করছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। কারণ, এ দুই পক্ষই দেশটিতে পরোক্ষ যুদ্ধ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সেখানে লড়ছে সৌদি আরব ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা। আর হুতিদের সমর্থন দিচ্ছে ইরান। মুশকিল হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালে লোহিত সাগরপারের বন্দরনগরী হোদেইদায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি (স্টকহোম চুক্তি) ও সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের সঙ্গে থাকা সমঝোতা দুইই ভেঙে পড়তে পারে। তবে আশার কথা এই যে, ইয়েমেনের মানসুর হাদি সরকার ও হুতি বিদ্রোহী উভয় পক্ষই এখন বুঝতে পারছে যে, তারা আদতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর শিকারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই উপলব্ধি কত দিন টিকবে তা বলা যাচ্ছে না।

default-image

ইথিওপিয়া
পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল ও প্রভাবশালী দেশ ইথিওপিয়াও আছে আসছে বছরটি কাটাবে শঙ্কা ও সম্ভাবনার দোলাচলে। ২০১৮ সালে ক্ষমতায় বসার পর থেকে ইথিওপিয়ার দরজা বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। ২০১৯ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী এ নেতার সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে কয়েক দশকের অচলাবস্থার নিরসনকে। কিন্তু রাজনৈতিক বন্দীদের বিনা শর্তে কারামুক্তিও নিঃসন্দেহে অনেক বড় অর্জন। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তিনি পরিবর্তনকামীদের নিযুক্ত করেছেন, বিরোধী পক্ষগুলোকে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু এসবের মধ্য দিয়ে তাঁর সামনে থেকে চ্যালেঞ্জগুলো হাওয়া হয়ে যায়নি। তাঁর সামনে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জাতিগত সংকটও। বিশেষত দেশটির আমহারা ও ওরোমিয়া অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর নেতারা তাকিয়ে আছেন বহু বছরের টিগ্র্যারি শাসনের অবসানের। টিগ্র্যারিরা ওই অঞ্চলের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হলেও ক্ষমতায় গুরু। এটি একটি বড় সংকট হয়ে দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে আবি আহমেদ যে জাতিগত ক্ষমতায়নের পথে হাঁটছেন, তা–ই বুমেরাং হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, এর মাধ্যমে বিভিন্ন আঞ্চলিক নেতৃত্ব সুগঠিত ও সক্ষম হয়ে উঠলেও কেন্দ্রের কাঠামোটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর এমনটি হলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জাতিগত দ্বন্দ্ব, যা এরই মধ্যে বহু স্থানে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ২০২০ সালের মে মাসেই অনুষ্ঠিত হবে ইথিওপিয়ার নির্বাচন। কেন্দ্রের দুর্বল শাসন ও জাতিগত দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের সময় দেশটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এটি মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে আবি আহমেদ একা নন, দেশটির প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠা পশ্চিমা শক্তিগুলোকে নিয়েই পতিত হবেন।

default-image

বুরকিনা ফাসো
আফ্রিকার আরেকটি দেশ বুরকিনা ফাসো সম্প্রতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। দেশটিতে জঙ্গিবাদী কিছু গোষ্ঠী দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে অবধারিতভাবেই দেশটি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমীকরণে ঢুকে পড়েছে। বর্তমানে সেখানে আনসারুল ইসলামের মতো একটি জঙ্গিগোষ্ঠী বেশ সক্রিয়, যাদের সংযোগ রয়েছে প্রতিবেশী মালির সঙ্গে। মালিতে সক্রিয় ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়েদার প্রভাব বলয়েও রয়েছে দেশটির একাংশ। এর প্রতিক্রিয়ায় আবার দেশটির অভ্যন্তরে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের জন্ম হয়েছে, যারা সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিসর বিস্তৃত করছে। এদিকে দেশটির সরকার ও তার বিরোধীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দিন দিন বাড়ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আসছে বছরের নভেম্বরে দেশটিতে অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ নির্বাচন, যেখানে ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অস্থির পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো চাইছে দেশটিতে নিজেদের ভিত মজবুত করতে, যাতে সেখান থেকে পুরো অঞ্চলে তারা কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক এ অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক শক্তির খেলার একটি বড় মঞ্চ হয়ে উঠবে।

default-image

লিবিয়া
লিবিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে শিগগির উত্তরণের তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং আগামী কয়েক মাসে দেশটিতে অস্থিতিশীলতা বাড়বে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা। মূলত ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকেই দুটি সমান্তরাল প্রশাসনের অধীনে থাকা দেশটিতে অস্থিরতাই একমাত্র বাস্তবতা। জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে দেশটিতে দুটি সরকার রয়েছে, এর একটি ফায়েজ আল-সাররাজের নেতৃত্বাধীন। এই প্রশাসনকে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মহল। পূর্ব লিবিয়ায় থাকা বিদ্রোহী সরকারের পেছনে রয়েছে রাশিয়াসহ অন্য শক্তিগুলো। বিদ্রোহী এ সরকারকে নানাভাবে সমর্থন জানাচ্ছে মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। বিদায়ী বছরে মিসরের আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সরকারের সঙ্গে ত্রিপোলির সরকারের আলোচনা কিছুটা আশ্বাস দিলেও নতুন করে তুরস্কের হুমকি শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। দুই বড় বিভাজনের পাশাপাশি রয়েছে গোষ্ঠীগত নানা দ্বন্দ্বও। আর ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো এখনো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি। আসছে বছর এই নানামাত্রিক সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

default-image

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, ইসরায়েল ও পারস্য উপসাগর
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক ২০১৯ সালে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আসছে বছরও এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ইরান-চীন-রাশিয়ার যৌথ মহড়া ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে সম্পর্কের বরফ শিগগির গলার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে রয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে ইরানের দ্বন্দ্বের বিষয়টি। সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রী এবং ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব এ ক্ষেত্রে বড় প্রভাবক হয়ে উঠবে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, আসছে বছর পারস্য কিংবা আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধাবস্থা থাকবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

default-image

যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং–উনের পারস্পরিক মুগ্ধতার কাল বিগত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার ও নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সম্পর্কে যে ধারণা ছড়িয়েছে, তাতে করে কিম উনের পক্ষে আর ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তারা আবার নিজের পথেই ফিরে যাচ্ছে। নতুন করে পরমাণু কর্মসূচি শুরুর কথা ভাবছে তারা। তেমনটি হলে উত্তর কোরিয়া আবারও বেইজিংয়ের ঘরেই প্রবেশ করবে। যুক্তরাষ্ট্র খুব করেই চাইবে, তেমনটি যেন না হয়। কিন্তু শান্তিচুক্তিতে দুদেশ সম্মত না হলে, অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল উত্তর কোরিয়ার সামনে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। সে ক্ষেত্রে আরেকটি ফ্রন্টে চীনের কাছে হেরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র।

default-image

ভারত ও এর প্রতিবেশীরা
ভারতের বর্তমান নরেন্দ্র মোদি সরকার বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে এমন অবস্থান নিয়েছে, যা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি হচ্ছে কাশ্মীর। পাকিস্তানের সঙ্গে বিবদমান অঞ্চলটির বিভাজন, সেখানে কেন্দ্রের শাসন আরোপ ইত্যাদির মাধ্যমে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সেখানে সৃষ্টি হয়েছে। কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের পুরোনো বৈরী সম্পর্কটি আবার জাগিয়ে তুলেছে। বিষয়টির শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের শুরুতে ভারতের প্যারামিলিটারি বাহিনীর ওপর পাকিস্তানভিত্তিক ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠীর আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে। সে সময় দু দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি সামলানো গেলেও আবার উত্তেজনা শুরু হয় ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে সেখানে কেন্দ্রের শাসন জারি করলে। শুধু এই ইস্যুই নয়, বছরের শেষ দিকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে ভারত তার মুসলিমপ্রধান তিন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এই মুহূর্তে এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। উত্তাল হয়ে আছে খোদ দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চল।

default-image

ভেনেজুয়েলা ও দক্ষিণ আমেরিকা
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যাওয়া ভেনেজুয়েলার অবস্থা বেশ সঙিন বলা যায়। দেশটির ক্ষমতায় এখনো নিকোলা মাদুরো সরকার থাকলেও তারা সাধারণ মানুষ থেকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। গত এপ্রিলে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। সেই বিক্ষোভ সামাল দিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাদুরো সরকার এখনো টিকে থাকলেও তা কত দিন টিকে থাকবে, তা বলা যাচ্ছে না। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হুয়ান গুইদাদোকে স্পষ্টত সমর্থন জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা। মাদুরোর পাশে এখন সেনাবাহিনী রয়েছে। কিন্তু মার্কিন সমর্থনপুষ্ট গুইদাদো ও তাঁর অনুসারীদের হাত থেকে কত দিন ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন তিনি, তা একেবারেই অনিশ্চিত। আর গুইদাদোর হাতে ক্ষমতা গেলে নিশ্চিতভাবেই ভেনেজুয়েলা ও দক্ষিণ আমেরিকার একটি যুগের পতন হবে। একই অবস্থা বলিভিয়ারও। সেখানে কিছুদিন আগেই ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েছেন ইভো মোরালেস। আন্তর্জাতিক করপোরেট পুঁজিই তাঁকে ক্ষমতা থেকে হটিয়েছে বলা যায়। অঞ্চলটিতে মার্কিন মিত্র হিসেবে কাজ করছে ব্রাজিল ও কলম্বিয়া।

default-image

ইউক্রেন
এই সময়ের যেকোনো আন্তর্জাতিক সমীকরণেই ইউক্রেন থাকবে। কারণ, অঞ্চলটি ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালের এপ্রিলে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির ক্ষমতায় বসেন মার্কিন সমর্থনপুষ্ট ভ্লাদোমির জেলেনস্কি। তিনি কতটা মার্কিন পুতুল, তা যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা অভিশংসন তদন্তই বলে দেয়। ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ইউক্রেন ঘিরে আসছে বছরও ওয়াশিংটন-মস্কো দ্বৈরথ অব্যাহত থাকবে। বছরের শেষ মাসে ভ্লাদিমির পুতিন ও  জেলেনস্কির মধ্যকার আলোচনায় কোনো সমাধান না আসাটা অন্তত সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন