গণহত্যাসংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর ভোটাভুটিতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা ত্যাগ করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনটির এক প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ব্যাপারে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ‘লজ্জাকর ও অকার্যকর’ বলেও মন্তব্য করেছে লন্ডনভিত্তিক সংগঠনটি। খবর বিবিসি ও আল-জাজিরার।
অ্যামনেস্টির বার্ষিক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল ছিল ‘বিপর্যয়কর’। বাড়তি উদ্বাস্তুদের আশ্রয় না দেওয়ার মাধ্যমে ধনী দেশগুলো ‘ঘৃণ্য’ অবস্থান নিয়েছে। ২০১৫ সালটাও খারাপ যাবে বলে ধারণা অ্যামনেস্টির।
৪১৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটিতে অ্যামনেস্টি ১৬০টি দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিবরণ দিয়েছে। সংঘাত ও সহিংসতার শিকার মানুষের জন্য ২০১৪ একটা বিপর্যয়কর বছর ছিল উল্লেখ করে প্রতিবেদনে সংগঠনটি বলেছে, সশস্ত্র সংঘাতের প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় বিষয়টিকে মোকাবিলা করতে বিশ্বনেতাদের অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠনটির মহাসচিব সলিল শেঠী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সহিংসতার মধ্যে পড়া লাখ লাখ মানুষের জন্য ২০১৪ ছিল একটি বিপর্যয়কর বছর। বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আইএসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিপরীতে বৈশ্বিক জবাব ছিল লজ্জাকর ও অকার্যকর। মানুষ ক্রমবর্ধমানভাবে বর্বর হামলা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথাযথ ভূমিকা দেখা যায়নি।’
অ্যামনেস্টি মহাসচিব আরও বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বেসামরিক মানুষকে রক্ষায় ‘করুণভাবে ব্যর্থ’ হয়েছে। পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যদেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স বেসামরিক মানুষকে রক্ষার চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
উল্লিখিত পাঁচটি দেশ জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন। অর্থাৎ নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব তোলা হলে পাঁচটি দেশের যেকোনো একটি তার ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করে একাই প্রস্তাবটি আটকে দিতে পারে। অন্য সব দেশ প্রস্তাবের পক্ষে থাকলেও কোনো কাজ হয় না।
অ্যামনেস্টি বলেছে, সমস্যা সমাধানের একটা উপায় হচ্ছে, গণহত্যাসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে এই দেশগুলোর ভেটো প্রদানের ক্ষমতা নিজে থেকে পরিত্যাগ করা। এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়েছে, এভাবে ভেটো দেওয়া বন্ধ করা গেলে সিরিয়ায় সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘ বারবার যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেগুলো রাশিয়া আটকে দিতে পারত না।
আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি মেনে চলতে সব রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর থেকে কার্যকর হওয়া চুক্তিটি মেনে চলা হলে সিরিয়া ও ইরাকের মতো দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র যাওয়া ঠেকানো যাবে।
অ্যামনেস্টির গণমাধ্যমবিষয়ক পরিচালক সুজানা ফ্লাড বলেন, ‘অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের বাণিজ্যের ওপরে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল থাকায় বছরে গড়ে অন্তত ১০ লাখ লোকের মৃত্যু হচ্ছে। এ ছাড়া আহত, ধর্ষণের শিকার ও বাড়িঘরছাড়া হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ।’ তিনি জানান, বিশ্বের শীর্ষ ১০ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে পাঁচটি এরই মধ্যে অস্ত্রবাণিজ্য চুক্তি নামের চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চূড়ান্ত অনুমোদন না দিলেও এরই মধ্যে এতে সই করেছে। তবে চীন, কানাডা ও রাশিয়ার মতো অন্যান্য বড় অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ এখনো তা করেনি।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তুর সংখ্যা পাঁচ কোটি ছাড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর এই প্রথম এত বড় সংখ্যায় মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন