বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফেসবুকের এই হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, এ ধরনের মাধ্যম যদি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে কি বিশ্ব আরও বেশি সুন্দর স্থান হয়ে উঠবে? যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ এক প্রতিবেদনে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।

ফেসবুকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযোগ হচ্ছে, এখানে ব্যাপকভাবে ভুয়া খবর, অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। ফেসবুক জেনেবুঝেও তা নিয়ে ব্যবস্থা নেয় না। রাজনীতিবিদেরা এ নিয়ে ক্ষুব্ধ। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফেসবুক এ নিয়ে কোনো সমন্বয় করেনি। ইকোনমিস্ট বলছে, ফেসবুক ঘিরে নেতিবাচক খবরের ছড়াছড়ি থাকলেও বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নেননি। কিন্তু এতে ফেসবুকের স্বস্তিতে থাকার অবকাশ নেই। ফেসবুকের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ সমালোচনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে তাতে এর ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। এর সম্মান রক্ষার বিষয়টি এখন ফেসবুকের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

ফেসবুক উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের বেশ কিছু তথ্য লুকিয়েছে। ফেসবুকের অভ্যন্তরীণ কিছু গবেষণা তথ্য তুলে ধরে ইতিমধ্যে বেশি কিছু প্রতিবেদন সামনে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুকের ছবি শেয়ার করার অ্যাপ্লিকেশন ইনস্টাগ্রাম প্রতি পাঁচ মার্কিন কিশোরের মধ্যে একজনকে তাদের নিজের সম্পর্কে খারাপ ভাবতে বাধ্য করে। এ গবেষণার ফল তারা সামনে আনেনি। ফেসবুকের সমালোচকেরা বলছেন, ফেসবুককে আরও বেশি উন্মুক্ত হতে হবে। কিন্তু ফেসবুক তাতে নারাজ। তারা মনে করে, এই ধরনের গবেষণা করা তাদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। এতে ফেসবুকের সর্বনাশ হতে পারে।

ফেসবুকের বিরুদ্ধে অন্য যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো আসলে ইন্টারনেটভিত্তিক অন্য সেবাগুলোর জন্যও প্রযোজ্য। শিশুদের জন্য ক্ষতিকর ভাইরাল কনটেন্ট কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই প্রশ্ন শুধু ফেসবুকের জন্যই নয়, তা ইউটিউবের মতো সাইটের বেলাতেও উঠতে পারে। কারণ, অনেক অভিভাবক সন্তানকে ইউটিউব কনটেন্ট দেখতে দেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কনটেন্ট ফিল্টারিং করতে গেলে বাক্‌স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রশ্নটিও ওঠে। দ্বিধার জায়গাটি হচ্ছে বাক্‌স্বাধীনতা রক্ষা করে কীভাবে ক্ষতি কমানো যায় তা নিয়ে। ফেসবুক বারবার কংগ্রেসের কাছে শিশুদের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো কোম্পানির কাছে ছেড়ে দেওয়ার বদলে কংগ্রেসকে ঠিক করে দেওয়ার কথা বলে আসছে। এ ছাড়া জবাবদিহি অধিকতর হারে নিশ্চিত করার জন্য ইনডিপেনডেন্ট ওভারসাইট বোর্ড (স্বাধীন পর্যবেক্ষক বোর্ড) ফেসবুকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর উদ্দেশ্য হলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট মডারেশন–সংক্রান্ত ইস্যুগুলো মোকাবিলা করা।

ফেসবুকের সাবেক কর্মী হাউগেনের অভিযোগ, তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহার কমেছে। সে তথ্যও গোপন করেছে ফেসবুক। হাউগেন অভ্যন্তরীণ একটি পূর্বাভাসের কথা সামনে তুলে আনেন, যাতে আশঙ্কা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র তরুণদের মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহার কমতে থাকলে দেশটিতে আগামী দুই বছরের মধ্যে মার্কিন ফেসবুক ব্যবহারকারী ৪৫ শতাংশ কমে যাবে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরেই ফেসবুকের কাছ থেকে খুব বেশি তথ্য জানতে পারছিলেন না। এতে বিজ্ঞাপনদাতারা বড় ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন। তবে ফেসবুক এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়, ফ্রান্সেস হাউগেন ফেসবুকের প্রোডাক্ট ম্যানেজার ছিলেন। তিনি যখন বললেন ফেসবুক এবং তাদের অ্যাপগুলো শিশুদের ক্ষতি করছে, বিভেদ বাড়াচ্ছে এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে, তখন বিশ্বজুড়ে হইচই পড়া স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে সিনেট কমিটির সামনে সম্প্রতি শুনানিতে ফেসবুকের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন হাউগেন।

হাউগেন বলেছেন, সম্প্রতি তিনি ফেসবুকের বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের কাছে হস্তান্তর করেছেন। সেসব নথিপত্রের ভিত্তিতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সংবাদ প্রকাশ করেছে, ইনস্টাগ্রামের নিজেদের চালানো গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে এই অ্যাপটি মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কর্তাব্যক্তিরা জানেন, কীভাবে এগুলোকে আরও নিরাপদ করা যায়, কিন্তু তারা সেসব পদক্ষেপ নেননি। কারণ, তারা জনগণের ভালোর চেয়ে নিজেদের মুনাফার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘জাকারবার্গ নিজে ছাড়া সেখানে তাঁকে জবাবদিহি করার মতো আর কেউ নেই। ইন্টারনেট থেকে ফেসবুক কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি জানি না, সেটা কীভাবে হয়েছে, কিন্তু পাঁচ ঘণ্টার জন্য হলেও ফেসবুক বিভক্তি ছড়াতে পারেনি, গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে পারেনি এবং নারী ও শিশুদের তাদের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারেনি।’

ফেসবুক বলছে, হাউগেন যে বিভাগগুলো নিয়ে কথা বলছেন, সেসব বিভাগ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। হাউগেন যেভাবে অনেক বিষয়ে চরিত্রাঙ্কণ করেছেন, তার সঙ্গে তারা একমত নয়। তবে তারাও মনে করে, ইন্টারনেটের জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন তৈরির সময় এসেছে।

ইকোনমিস্ট বলছে, ফেসবুক যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তাতে কী এসে যায়? ফেসবুকের শেয়ারের দাম অন্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। যদিও গত এক বছরে এর মোট মূল্য ৩০ শতাংশ বেড়েছে। রাজনীতিবিদেরা এখন ফেসবুককে ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ফেসবুকের বিরুদ্ধে যে অ্যান্টিট্রাস্ট মামলা হয়েছে, সেটি ত্রুটিপূর্ণ। মার্কিন বিচার বিভাগের দাবি, ফেসবুক একচেটিয়াভাবে ব্যবসা করছে, যা প্রতিযোগিতার নিয়মের লঙ্ঘন।

ফেসবুক বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় অন্য সাইটগুলোর গুরুত্ব বেড়ে যায়। মানুষ তখন টেলিগ্রাম, টিকটক, টুইটারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটি প্রতিযোগিতা আইনকে শক্তিশালী করার বদলে হতাশার বহিঃপ্রকাশ থেকেই বেশি ঘটে।

ফেসবুকের প্রতি মানুষের ক্ষোভ বা আস্থাহীনতা এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফেসবুক এমন একটি আস্থার জায়গায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে ফেরার উপায় নেই। হাউগেনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া তাই এখন বড় করে দেখা হচ্ছে। ফেসবুক এখন তার সংস্কৃতির কারণে তরুণ ও উদার কর্মী হারানোর বড় ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। বয়স্ক গ্রাহকেরা ফেসবুক আঁকড়ে পড়ে থাকলেও জনমত বিরুদ্ধে যেতে শুরু করলে তরুণ ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমবে ফেসবুকের। এতে তাদের বড় লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে।

ফেসবুককে এখন তাই তাদের নিজের খোঁড়া গর্ত থেকেই বেরিয়ে আসতে হবে। হতে হবে দায়িত্বশীল। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ অবশ্য সে কথাই আবার নতুন করে শুনিয়েছেন। হাউগেনের বক্তব্যের বিষয়ে মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, তাঁদের বিষয়ে যেসব তথ্যপ্রমাণ সম্প্রতি প্রচার করা হচ্ছে, তাতে ফেসবুকের কাজ ও উদ্দেশ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যেভাবে কোম্পানিকে তুলে ধরা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তাঁরা সব সময়ই নিরাপত্তা, মঙ্গল ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেন।

ফেসবুক ঘিরে সমালোচনার ফল ইতিমধ্যে দেখতে শুরু করেছে বিশ্ব। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও তারকাদের ওপর অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও নির্যাতন ঠেকাতে নতুন সুরক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে ফেসবুক।

ফেসবুকের কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে কাউকে হয়রানি ও নির্যাতন করলে বন্ধ করে দেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান অ্যান্টিগোন ডেভিস গত বুধবার এসব কথা জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র-সম্পর্কিত ও যেসব অ্যাকাউন্ট সংঘবদ্ধভাবে হয়রানির সঙ্গে যুক্ত কিংবা কারও কণ্ঠরোধে ব্যবহার হচ্ছে, সেসব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে শুরু করেছে বলেও জানান ডেভিস। তিনি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের নীতির বিরুদ্ধে গেলে কিংবা বারবার নিয়ম ভঙ্গ করলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

তথ্যসূত্র: ইকোনমিস্ট, বিবিসি ও এএফপি

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন