default-image

অস্ট্রেলিয়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল পর্যন্ত ৩ হাজার ১৬৬ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে ধারণা করা হচ্ছে, শনাক্তের বাইরে রয়েছে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ। আর সেটা নিয়েই শঙ্কিত অস্ট্রেলিয়ার জনজীবন।

অপরিহার্য নয়, এমন পরিষেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও পুরোপুরি লকডাউন হয়নি অস্ট্রেলিয়ার প্রধান শহর সিডনির রাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলসসহ অন্য কোনো রাজ্য কিংবা শহর। কিন্তু তবু প্রাণচঞ্চল, তারুণ্যে ভরপুর সিডনি শহর এখন মানুষহীন থমথমে, নির্জন ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। গাড়ি-ঘোড়া, বিমান-জাহাজ প্রায় সব বন্ধ। এর মধ্যেই বাংলাদেশিরা ভালো আছেন। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই করোনাভাইরাসের ঢেউয়ে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশিরাও দুর্ভোগের মুখোমুখি হবেন বলে ধারণা করছেন বাংলাদেশি কমিনিটির অভিজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, যাঁরা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক কিংবা স্থায়ী অভিবাসী, তাঁরা হয়তো অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় উতরে যাবেন। কিন্তু এখানে পড়াশোনা করতে আসা বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী স্পষ্টতই কাজ হারাতে পারেন। আর কাজ হারিয়ে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিয়ে অভিভাবকদের পাশাপাশি এখানকার সচেতন মহলও চিন্তিত। তবে এই শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতে অস্ট্রেলিয়া সরকার, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন, বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে ব্যক্তি উদ্যোগেও ইতিমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন অনেকে।

করোনাভাইরাসের সর্বশেষ অবস্থা
এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৩ হাজার ১৬৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। সারা দেশের প্রায় অর্ধেকই আক্রান্ত হয়েছে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যে এবং এর ভরকেন্দ্র হচ্ছে সিডনির পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা। এই রাজ্যে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১ হাজার ৪০৫–এ। এ ছাড়া ভিক্টোরিয়ায় এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫৭৪, কুইন্সল্যান্ডে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫৫, সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় ২৫৭, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় ২৫৫, ক্যানবেরায় ৬২, তাসমানিয়ায় ৪৬ ও নর্দার্ন টেরিটরিতে ১২।

অন্যদিকে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের সিডনিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম ভাঙার কারণে এক প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা রেস্টুরেন্ট কিংবা অন্য কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি হারালেও দেশটির প্রধান ও বড় সুপার মার্কেটগুলো বিপুলসংখ্যক লোক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। ওলঅয়ার্থস সুপার মার্কেট এরই মধ্যে ২০ হাজার নতুন লোক নিয়োগের সার্কুলার জারি করেছে। এ ছাড়া কোলস ও অ্যাল্ডির মতো বড় সুপার মার্কেটগুলোও লোক নিচ্ছে। বোরহান খান লিমন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিডনির একটি অ্যাল্ডি সুপার মার্কেটের ম্যানেজার। তিনি এখনই অনলাইন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে সিভিসহ স্টোরগুলোতে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন। কোনো স্টোরে বাংলাদেশি কেউ চেনাজানা থাকলে তাঁর সহযোগিতা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগ
বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তারা। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার জন্য হাইকমিশনের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসের তিনটি টেলিফোন নম্বরে: +৬১ ৪১০ ৬১৬ ৮০৩, +৬১ ৪১৬ ২৮৫ ০৬৯, +৬১ ৪৭৬ ০২৫ ০৩২—সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা যাবে।

অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সুফিউর রহমান বলেন, ‘আমরা কাজ করছি এবং সামনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পরিকল্পনাও করছি। বাংলাদেশে এখন সাধারণ ছুটি, তবু আমরা দূতাবাস খোলা রেখেছি। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের নাগরিকদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করব।’

শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্য খাবারের আয়োজন
এই দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সিডনির বাংলাদেশি কমিউনিটির কিছু মানুষ। তাঁরা বাঙালিপাড়াখ্যাত লাকেম্বায় বিনা মূল্যে খাবারের আয়োজন করেছেন। আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৫ এপ্রিল থেকে পরবর্তী দুই মাস পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ও রাতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে প্যাকেটকৃত খাবার সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া কেউ কেউ ব্যক্তি উদ্যোগেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

বাসস্থানের বন্দোবস্ত
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যাঁরা বাসস্থান নিয়ে সংকটে পড়ছেন, তাঁদের সহযোগিতা করছেন কিছু মানুষ। তাঁদের একজন বাংলাদেশের প্রবীণ সাংবাদিক ফজলুল বারী। তিনি অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বাসস্থান ও কাজ পেতে সহযোগিতা করে আসছেন। তিনি বলেন, ‘রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন পার্টটাইম কাজগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য এখন কাজ খুঁজে দেওয়া জরুরি। আমি চেষ্টা করছি বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের কাজ দেওয়ার। অন্যদেরও আমি এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি। আর যাঁরা বাসস্থান নিয়ে সংকটে পড়ছেন, তাঁরাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে।’

ভিসা–সংক্রান্ত জটিলতা
এই সংকট পরিস্থিতির কারণে ভিসা–সংক্রান্ত জটিলতা লাঘবে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন বিভাগ কিছু জরুরি পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। ভিসার মেয়াদ শেষ কিংবা ভিসা বাতিল–সংক্রান্ত জরুরি পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অন্যরা দেশটির অভিবাসন বিভাগের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত জানতে পারবেন। অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওয়েবসাইট লিংক

সিডনিতে বসবাসকারী অভিবাসন আইনজীবী মোহাম্মদ নিজামউদ্দীন বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা–সংক্রান্ত কোনো জটিলতা দেখা দিলে, যত দ্রুত সম্ভব অভিবাসন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা শ্রেয়। এখন সবকিছুতেই অভিবাসন বিভাগ সহানুভূতিশীল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0