default-image

করোনাভাইরাসের মহামারির ধাক্কায় আবারও টালমাটাল বিশ্ব। এই মহামারি মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি টিকা আশার সঞ্চার করলেও সরবরাহের ঘাটতি সে আশাও ফিকে করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিকতম তথ্য বলছে, টিকার সরবরাহের ঘাটতির কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভ্যাক্স কর্মসূচিও বড় সংকটে পড়েছে।


চীনের উহান থেকে গত বছরের গোড়ার দিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাসের মহামারি। এই মহামারির সার্বক্ষণিক তথ্য প্রকাশকারী ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারস ডট ইনফোর তথ্যমতে, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ১৪ কোটি ৫০ লাখের বেশি করোনা সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ ৮০ হাজার রোগীর। সুস্থ হয়ে উঠেছেন প্রায় ১২ কোটি ৩১ লাখ রোগী।


ওয়ার্ল্ডোমিটারসের তথ্য বলছে, গত বুধবার থেকে গতকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বজুড়ে ৮ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি করোনা সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। যা করোনা মহামারি শুরুর পর বিশ্বজুড়ে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সর্বোচ্চ সংখ্যা। এই ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ১৪ হাজারের কিছু বেশি করোনা সংক্রমিত রোগীর।

বিজ্ঞাপন


এই পরিস্থিতিতেই আরেকটি আশঙ্কার খবর হয়ে এসেছে কোভ্যাক্স কর্মসূচির সংকটে পড়ার বিষয়টি। করোনা মহামারি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সুষ্ঠু ও সমহারে টিকা বণ্টনের জন্য গত বছরের মাঝামাঝি কোভ্যাক্স কর্মসূচি শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটা দেশকে চলতি বছরের শেষ নাগাদ মোট জনসংখ্যার কমপক্ষে ২০ শতাংশ টিকার সরবরাহ করার কথা।


যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় আগামী মে মাস নাগাদ যে পরিমাণ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সরবরাহের কথা ছিল, তার মাত্র এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে এ পর্যন্ত।

মলডোভা, টুভালু, নাউরু ও ডোমিনিকা কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার সবগুলো ডোজের সরবরাহই পেয়েছে। তবে ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় দেশগুলো মে মাস নাগাদ যে পরিমাণ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পাওয়ার কথা, তারা পেয়েছে মাত্র ওই পরিমাণের এক-দশমাংশ। এমন আরও অনেক দেশই রয়েছে, যারা বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ বা তার কম টিকার সরবরাহ পেয়েছে। আর বাংলাদেশ, মেক্সিকো, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত এক ডোজ টিকাও পায়নি।


বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এয়ারফিনিটি এবং কোভ্যাক্স কর্মসূচি পরিচালনায় সহযোগিতাকারী দুই সংস্থা ইউনিসেফ ও জিএভিআই-এর বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গার্ডিয়ান জানায়, টিকার এই সংকট তৈরি হয়েছে মূলত উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং ধনী দেশগুলোর টিকা মজুতের হিড়িকে।

default-image


করোনা মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কায় ভারতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক হাসপাতালেই শয্যা খালি নেই। অক্সিজেন সংকটেও পড়েছে অনেক হাসপাতাল। এনডিটিভির খবর অনুযায়ী, দিল্লির সরকার গতকাল সন্ধ্যায় জানিয়েছে, সেখানে ছয়টি বেসরকারি হাসপাতাল অক্সিজেন শূন্য হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে টিকা প্রয়োগ জোরদার করতে ভারত বেশ কিছুদিন ধরেই টিকা রপ্তানি বন্ধ রেখেছে।


তবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকার সরবরাহের এই ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করতে চলেছে। অনেক দেশের সরকারই ভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা করতে বাধ্য হচ্ছে।

default-image


গার্ডিয়ান জানায়, মলডোভা, টুভালু, নাউরু ও ডোমিনিকা কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার সবগুলো ডোজের সরবরাহই পেয়েছে। তবে ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় দেশগুলো মে মাস নাগাদ যে পরিমাণ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পাওয়ার কথা, তারা পেয়েছে তার মাত্র এক-দশমাংশ। এমন আরও অনেক দেশই রয়েছে, যারা বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ বা তার কম টিকার সরবরাহ পেয়েছে। আর বাংলাদেশ, মেক্সিকো, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত এক ডোজ টিকাও পায়নি।

কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় টিকার সরবরাহে নাটকীয় ঘাটতি তৈরি হওয়ায় এখন ধনী দেশগুলোর উচিত তাৎক্ষণিকভাবে মজুত টিকা দান করা।
লিয়াম সলিস, নীতি নির্ধারণী বিভাগের প্রধান, ইউনিসেফ ইউকে


আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা পেয়েছে মাত্র বরাদ্দের ৩২ শতাংশ টিকা। এই মহাদেশে এই দেশটিই শতকরা হিসাবে সবচেয়ে বেশি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার সরবরাহ পেয়েছে। নাইজার, কেনিয়া, ইথিওপিয়া এবং গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো পেয়েছে বরাদ্দের ২৮ শতাংশ টিকা।


সার্বিকভাবে গত বুধবার পর্যন্ত কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় ৪ কোটি ২ লাখ ডোজ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। অথচ আগামী মে মাস নাগাদ এই কর্মসূচির আওতায় ১৮ কোটি ৭২ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহের কথা ছিল। অর্থাৎ এ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করতে পেরেছে কোভ্যাক্স কর্মসূচি।

বিজ্ঞাপন


গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, টিকার এই সরবরাহ ঘাটতি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একটি সূত্র বলেছে, বাংলাদেশে নতুন করে টিকার সরবরাহ না এলে ১৫ দিনের মধ্যে টিকার মজুত ফুরিয়ে যাবে।

default-image


গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোভ্যাক্স কর্মসূচি সরকার ও টিকা প্রস্তুতকারী শিল্পের সহযোগিতায় এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উভয় পক্ষই এই কর্মসূচিকে অগ্রাহ্য করেছে। ধনী দেশগুলো কোভ্যাক্স কর্মসূচিতে অংশও নিয়েছে, আবার টিকা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। ফাইজারের মতো টিকা উৎপাদকেরা কোভ্যাক্স কর্মসূচির কাছে মুনাফাহীন টিকা বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে খুব অল্প পরিমাণেই এসব উৎপাদকের কাছ থেকে টিকা পাওয়া যাবে। তাদের সিংহভাগ টিকা কিনে নিয়েছে ধনী দেশগুলো। এদিকে মডার্নার মতো উৎপাদকেরা এখন পর্যন্ত এক ডোজ টিকাও কোভ্যাক্স কর্মসূচিতে সরবরাহ করেনি।

সার্বিকভাবে গত বুধবার পর্যন্ত কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় ৪ কোটি ২ লাখ ডোজ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। অথচ আগামী মে মাস নাগাদ এই কর্মসূচির আওতায় ১৮ কোটি ৭২ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহের কথা ছিল। অর্থাৎ এ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করতে পেরেছে কোভ্যাক্স কর্মসূচি।


এদিকে কোভ্যাক্স এ পর্যন্ত ১৫৩ কোটি ডোজ টিকার সরবরাহ প্রাপ্তির চুক্তি করতে পেরেছে। এসব টিকার সিংহভাগের সরবরাহ যাওয়ার কথা ভারতের পুনেভিত্তিক টিকা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য টিকা উৎপাদনের শর্তে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কাছ থেকে রয়্যালটি ছাড়া টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স পেয়েছে। কিন্তু টিকার সরবরাহ বৃদ্ধিতে সেরাম ইনস্টিটিউট অনেকখানিই ধীর। অবশ্য তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে টিকার কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সে দেশের সরকারের নিষেধাজ্ঞা এই ধীর গতির কারণ। এই পরিস্থিতির মধ্যেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রকট আকার ধারণ করায় ভারত সরকার টিকা রপ্তানিতে দিয়েছে নিষেধাজ্ঞা।


ইউনিসেফ ইউকের নীতি নির্ধারণী বিভাগের প্রধান লিয়াম সলিস গার্ডিয়ানকে বলেন, কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় টিকার সরবরাহে নাটকীয় ঘাটতি তৈরি হওয়ায় এখন ধনী দেশগুলোর উচিত তাৎক্ষণিকভাবে মজুত টিকা দান করা।

default-image


ইউনিসেফের এক মুখপাত্র গত বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে অবশ্য বলেছেন, ভারতের বাইরে থেকে টিকার সরবরাহ পেতে তাঁরা বিকল্প উৎসের সন্ধান পেয়েছেন। মে মাসের শেষ নাগাদ ওই সব উৎস থেকে সাড়ে ৬ কোটি ডোজ টিকার সরবরাহ পাওয়া যাবে।


এদিকে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটও বলেছে, মে মাসের শেষ নাগাদ তারা টিকার মাসিক উৎপাদন ১০ কোটি ডোজে বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। তবে এই বাড়তি উৎপাদনের কী পরিমাণ টিকা কোভ্যাক্স কর্মসূচিকে সরবরাহ করা হবে, তা পরিষ্কার নয়।

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন