মার্কিন সিনেটের গোয়েন্দা কমিটি সম্প্রতি সিআইএর গোপন নির্যাতন কার্যক্রমের ওপর যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তার বিভিন্ন অংশ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাতে কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এই প্রতিবেদনের উন্মুক্ত অংশ থেকে এ কথা গোপন থাকেনি যে তথ্য আদায়ের নামে সিআইএ শুধু তথাকথিত জোরদার নির্যাতন কৌশলই ব্যবহার করেনি, তারা মানবদেহ ও মনস্তত্ত্ব নিয়েও গোপন পরীক্ষা-িনরীক্ষা চালায়। নিউইয়র্কের প্রগতিশীল সাপ্তাহিক দ্য নেশন এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছেপেছে।
পত্রিকাটি জানিয়েছে, নাইন-ইলেভেনের পর সিআইএ তার তথাকথিত ‘রেন্ডিশন’ কর্মসূচির অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গোপন জেলখানা প্রতিষ্ঠা করে, সেখানে মানবদেহ ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে গোপন পরীক্ষা চালানো হয়। এ পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন দুজন মনস্তত্ত্ববিশারদ, জেমস মিচেল ও ব্রুস জেসন। সিআইএ দাবি করেছে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তথ্য সংগ্রহের কাজে এ দুই বিশেষজ্ঞের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অথচ এ বিশেষজ্ঞরা সন্ত্রাসবাদ বা আল-কায়েদা প্রশ্নে তাঁদের গবেষণার জন্য আদৌ পরিচিত নন। এমনকি আরবি ভাষা পর্যন্ত তাঁদের জানা নেই। একমাত্র যে ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা আছে, তা হলো মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের ওপর নির্যাতন কী প্রভাব ফেলে, সে প্রশ্নে গবেষণা। পত্রিকাটি জানিয়েছে, তাদের তথ্য প্রমাণের জন্য সিআইএর ভাড়া করা এই দুই মনস্তত্ত্ববিদ যে কৌশল ব্যবহার করেন, তার লক্ষ্য ছিল বন্দীদের মনে ‘মানসিক দুর্বলতা, দিশাহীনতা ও ভীতি’ সৃষ্টি করা।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জেমস মিচেল ‘ভাইস নিউজ’ ওয়েব পত্রিকাকে জানান, তাঁরা ‘বদ লোকের কাছ থেকে ভালো লোকের জন্য তথ্য সংগ্রহ’ করার কাজে সাহায্য করেছেন। বস্তুত, বুশ প্রশাসন তার তথাকথিত ‘জোরদার জেরা কৌশল’ ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিল, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। সিআইএ জেরা কর্মসূচির অধীনে যেসব কৌশল ব্যবহার করে, তার মধ্যে ছিল পানিতে চুবানো, গুহ্যদ্বারে জল প্রবেশ, মাসের পর মাস অন্ধকার ও নির্জন কক্ষে কারাবাস ইত্যাদি। এ দুই মনস্তত্ত্ববিদ জোরদার জেরা কৌশলের ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন। অবশ্য সিনেট কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই টেকনিক ব্যবহারে অর্থপূর্ণ কোনো গোয়েন্দা তথ্যই মেলেনি। অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতন এড়াতে বন্দীরা মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে।
নেশন পত্রিকায় ক্যালিফোর্নিয়া সান্তা বারবারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক লিসা হাজ্জর বলেন, মানবদেহ ও মন নিয়ে পরীক্ষা-িনরীক্ষায় সিআইএ দীর্ঘদিন থেকে লিপ্ত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর জার্মান বিজ্ঞানীদের সাহায্যে তারা তথাকথিত ‘অপারেশন পেপারক্লিপ’ পরিচালনা করে। সোভিয়েত ও চীনারা তাদের রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর যেসব মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালাত। এই কার্যক্রমে তার অনুকরণে সম্মোহন, তড়িৎপ্রবাহ ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ব্যবহার করে। পরে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সিআইএ তথাকথিত ‘ফিনিক্স প্রোগ্রাম’ চালু করে, যেখানে বন্দীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার পাশাপাশি কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’তে সিআইএ তার পূর্বের অভিজ্ঞতা শুধু কাজে লাগায় তা নয়, তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
সিনেট কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর পর্যবেক্ষকেরা অভিমত প্রকাশ করেছেন, নির্যাতন, তা তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তা বেআইনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমলে নানাভাবে নির্যাতনকে ন্যায়সংগত ‘গোয়েন্দা কার্যক্রম’ বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। রক্ষণশীল তথ্যমাধ্যমে, বিশেষত টেলিভিশনে এর সপক্ষে ক্রমাগত প্রচারণার ফলে আমেরিকার সাধারণ মানুষের একাংশ এখনো মনে করে জোরদার জেরা কার্যক্রম ন্যায়সংগত। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি দুই সপ্তাহ আগেও সিনেট রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এ কার্যক্রম মোটেই নির্যাতন নয় এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেক বেশি সুরক্ষিত। তাঁর সে কথা শুধু সিনেট রিপোর্টেই প্রত্যাখ্যাত হয়নি, কোনো কোনো রিপাবলিকান সিনেটর পর্যন্ত যেকোনো ধরনের নির্যাতন অবৈধ, সেহেতু তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দিয়েছেন। এঁদের অন্যতম হলেন অ্যারিজোনার সিনেটর জন ম্যাককেইন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের শত্রুরা নির্যাতন করে এবং তার সাফাই গায়। তাদের এই অবিবেচক কাজকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি। আমরা আমেরিকানরা নির্যাতন করি না, করব না।’
নির্যাতন অবৈধ ও অনৈতিক—সিনেট গোয়েন্দা কমিটির প্রতিবেদনে সে স্বীকৃতি থাকলেও যাঁরা এই নির্যাতন কার্যক্রম অনুমোদন করেন অথবা যাঁদের হাতে নির্যাতন ঘটে, তাঁদের কেউই এখন পর্যন্ত বিচারের সম্মুখীন হননি। অধ্যাপক হাজ্জর দাবি করেছেন, সিআইএর নির্যাতন কার্যক্রমে যে মানবদেহ ও মন নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালানো হয়, এ কথাটি ব্যাপকভাবে জানাজানি হলে, যারা এখনো জোরদার নির্যাতনের পক্ষে সাফাই গান, তাঁরা সে কাজ থেকে নিবৃত্ত হবেন।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন