default-image

আধুনিক সমরসজ্জায় ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে সগর্বে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে ট্যাংক। এত দিন উন্নত সব দেশই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের আক্রমণ সাজানোর ক্ষেত্রে ট্যাংকের অবস্থান খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করত। কিন্তু ইদানীং উন্নত দেশগুলোই সেই অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধবিদ্যায় ট্যাংকের অবদান কমে যাবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠে গেছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের ময়দানে ট্যাংকের অভিষেক ঘটেছিল। ১৯১৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সোমের যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ট্যাংক নামে শত্রু নিধনে। জনক যুক্তরাজ্য। প্রথম কার্যকর ট্যাংকটির নাম ছিল ‘মার্ক ওয়ান’। ট্যাংকের ভয়ানক চেহারা দেখা গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকে ট্যাংককে মনে করা হতো সবচেয়ে বিধ্বংসী হিসেবে। বিশেষ করে শত্রুদের প্রতিরক্ষাব্যূহ তছনছ করে দেওয়ায় ট্যাংকের ভূমিকা ছিল দারুণ। একদিকে এতে আছে কামানের মাধ্যমে গোলা ছোড়ার সুবিধা। আবার অন্যদিকে শক্তিশালী বর্মব্যবস্থার কারণে একে ধ্বংস করাও কঠিন। ফলে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের ট্যাংকবহর বাড়াতে উদ্যোগ নেয়। চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শুধু ইউরোপের দেশগুলোতেই এখন আছে পাঁচ হাজারের বেশি ট্যাংক। আর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের কাছে ট্যাংক আছে প্রায় ৫৪ হাজার।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ট্যাংকের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ সমরশক্তিতে পারদর্শী দেশগুলোতেই এখন অনাস্থা দেখা দিয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যাংকের জনক যুক্তরাজ্যই এখন এই খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে ফেলতে চাইছে। কারণ, প্রচলিত যুদ্ধের নকশা বর্তমানে বদলে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল স্যার মার্ক কার্লটন স্মিথ সম্প্রতি এক বক্তব্যে জানিয়েছেন যে তিনি মনে করেন আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংকের প্রাণঘাতী রূপ অনেকটাই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। তাই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ জানাচ্ছে, শুধু যুক্তরাজ্য নয়, ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্রও একই পথে হাঁটছে। দেশটি বিশাল ট্যাংকবহর যুদ্ধসজ্জা থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কারণ, প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের মোকাবিলায় ট্যাংকের প্রয়োজনীয়তা খুব কম।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক কিছু যুদ্ধ-সংঘাতে ট্যাংক নাকাল হয়েছে বাজেভাবে। গত ফেব্রুয়ারিতে তুর্কি ড্রোনের কারণে সিরিয়ার কয়েক ডজন ট্যাংক ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অতীতে ক্যামোফ্ল্যাজের কারণে ট্যাংক যুদ্ধক্ষেত্রে লুকিয়ে থাকতে পারত। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব হয় না। জঙ্গি ও নজরদারি বিমানে এখন থাকে উন্নত সেন্সর। ফলে ইঞ্জিনের তাপ ও মাটিতে চলার দাগ চিহ্নিত করে আকাশ থেকে ট্যাংকের অবস্থান নির্ধারণ করে তা ধ্বংস করা বেশ সহজ হয়ে গেছে। আবার অ্যান্টি–ট্যাংক মিসাইল ব্যবস্থাও অনেক উন্নত হয়েছে। ফলে ট্যাংক ধ্বংস করা এখন আর নিদারুণ কঠিন কোনো কাজ নয়। তাই চিন্তক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ নিক রেনল্ডস ও জ্যাক ওয়াটলিং মনে করেন, যুদ্ধের ময়দানে ট্যাংকের মতো ভারী বর্মের সাঁজোয়া যান ব্যবহারের যে ধারণা এখনো আছে, তার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ ওঠা অযৌক্তিক নয়।

সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশেষ করে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ট্যাংকের সাফল্য ছিল নজরকাড়া। কিন্তু এক শতক পর ট্যাংক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কারণ, বর্তমান সমরবিদ্যায় বিবর্তন আসছে। আর পরিবর্তনের সেই জোয়ারে ট্যাংক ভেসে যাচ্ছে।

লন্ডনের ন্যাশনাল আর্মি মিউজিয়ামের সহকারী পরিচালক ইয়ান মেইন বলেন, আধুনিক যুদ্ধ এখন অনেক বদলে গেছে। ড্রোন এসেছে, এসেছে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংকের একা একা যুদ্ধ করার কৌশল এখন খুব একটা কাজে আসছে না। যুদ্ধের পরিবেশের বৈচিত্র্য এ ক্ষেত্রে ট্যাংকের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্যাংকের ভবিষ্যৎপথ বেশ বন্ধুর। একসময় যে ছিল যুদ্ধের রাজা, সে-ই পড়েছে রাজ্যপাট হারানোর আশঙ্কায়। উল্টো শুরু হয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সেই লড়াইয়ে ট্যাংকের টিকে থাকা এখন নির্ভর করছে অনেক যদি-কিন্তুর ওপর।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0