শনিবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের একজন বুদ্ধি করুণাত্নে। বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মরত এই যুবক বলছিলেন, ‘বিষয়টি (দেশের অর্থনৈতিক সংকট) এখন জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বিক্ষোভের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে করুণাত্নে বলেন, এই প্রথমবারের মতো ভেদাভেদ ভুলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজকর্মীরা একত্রে কোনো বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ ও বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে যোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের দাবি জানান তাঁরা।

২০১৯ সালে গোতাবায়া রাজাপক্ষে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এক বছরের কম সময়ে পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তাঁর দল। জয়ের পর বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসান তিনি। অপরদিকে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য সংবিধান সংশোধন করেন।
শুধু প্রধানমন্ত্রীর পদই নয়; রাজপক্ষে পরিবারের সদস্যদের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ অর্থ, কৃষি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের নজিরবিহীন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে।

তবে শ্রীলঙ্কার অনেকে এখনো মনে করছেন, গোতাবায়া ও মাহিন্দা রাজপক্ষে দেশের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ২০১৯ সালে ইস্টার সানডেতে বোমা হামলার উদাহরণ দিয়েছেন। হামলায় প্রায় আড়াই শ মানুষ নিহত হন। এ ঘটনার পর সরকার সন্ত্রাস দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর আগে, ২০০৯ সালে তামিল টাইগারদের সঙ্গে চলা দীর্ঘ ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের ইতি টানতে সক্ষম হন সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা। তখন গোতাবায়া ছিলেন দেশের প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন। বড় ভাইয়ের পাশে থেকে তামিল বিদ্রোহীদের দমনে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।

কিন্তু ২০১৯ সালে রাজাপক্ষে পরিবার নতুন করে ক্ষমতায় আসার পর দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়। ব্যর্থ হয় দেশের নানা বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে—বলছিলেন একজন বিক্ষোভকারী। তাঁর কথায় সায় দিয়ে আরেক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘দেশ পরিচালনার কোনো যোগ্যতাই নেই গোতাবায়ার। দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিতে হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান নেই তাঁর।’

মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে কমতে থাকায় স্বাধীনতার পর এখন সবচেয়ে বাজে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে রীতিমতো লড়াই চালাচ্ছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতির সঙ্গে যোগ হয়েছে, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকট। তেল–গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং চলতে থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।

শুধু বৈদেশিক রিজার্ভের অপ্রতুলতাই নয়। বিক্ষোভকারীরা দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করছেন। রিজার্ভ সংকট দেখা দেওয়ায় বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের কাছে সাহায্য চাওয়া নিয়েও সরকার গড়িমসি করেছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের। অপরদিকে গত দুই বছর করোনাভাইরাসের কারণে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত পর্যটনে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

শিক্ষাদীক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন লেখক বুদ্ধদসা গালাপাথি। তিনি বলেন, ‘গত দুই বছর গোতাবায়া কী করেছেন? কিছুই করেননি। এ জন্য দেশের দায়িত্ব পালনে আমরা রাজাপক্ষেকে আর দেখতে চাই না। এমনকি এই পরিবারেরও কাউকে দেখতে চাই না আমরা।’

সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে গোতাবায়ার উদাসীনতা আরও ক্ষুব্ধ করেছে বিক্ষোভকারীদের । গত মার্চে সাধারণ মানুষ যখন প্রথম রাস্তায় নামেন, তখন সরকারের অনেক কর্তাব্যক্তিই তাঁদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। আবার অনেক সরকারি কর্মকর্তা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া সংকট ঘনীভূত হয়।

শ্রীলঙ্কায় মার্চে তেল–গ্যাস, জ্বালানি, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার স্বাভাবিক সরবরাহ শুরুর দাবিতে সূত্রপাত হয় আন্দোলনের। অবস্থা বেগতিক দেখে একপর্যায়ে জরুরি অবস্থা ও কারফিউ জারি করেন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া। কিন্তু তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে কয়েকদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হয়ে তাঁকে।

রাজাপক্ষে পরিবারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর পেছনে সাধারণ মানুষ আরও কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন। অনেকে মনে করেন, ক্ষমতাসীন পরিবারটি ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। তাদের দুর্নীতির জন্যই দেশের এই বেহাল দশা। শেন স্টিলম্যান নামের এক যুবক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘যেখানে মানুষ না খেয়ে থাকছে, সেখানে রাজাপক্ষে পরিবার ও তাদের সহযোগীরা আয়েশি জীবন যাপন করছে। এসব অন্যায় সহ্য করতে না পেরে আমি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছি।’

থারিন্দু জয়াবর্ধনে নামের আরেক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘রাজাপক্ষে পরিবার ১,৮০০ কোটি ডলারের মালিক, এমন কথা শোনা যাচ্ছে। এই সংখ্যা দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় তিন গুণ।’

বিক্ষোভকারীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে আল-জাজিরা রাজাপক্ষে পরিবারের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।