জাতিসংঘের হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মানুষ তাইগ্রে অঞ্চল ছেড়ে পালাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার মানুষ সুদানে ঠাঁই নিয়েছে
জাতিসংঘের হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মানুষ তাইগ্রে অঞ্চল ছেড়ে পালাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার মানুষ সুদানে ঠাঁই নিয়েছেছবি: এএফপি

‘আমি কোনো রকমে পালাতে পেরেছি। সেখানে সেনাবাহিনী কম বয়সী যাকেই পাচ্ছে, তাকেই গলা কেটে হত্যা করছে।’ কথাগুলো মেসা গেদাই নামের এক ব্যক্তির। ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় তাইগ্রে অঞ্চলের মাই-কাদরা শহর থেকে পালিয়ে তিনি পাশের দেশ সুদানে সীমান্তবর্তী আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই নিয়েছেন। কিন্তু আসার পথে হারিয়েছেন স্ত্রী ও চার বছরের ছেলেকে। এ জন্য নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবেন বলে তাঁর মনে হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না তারা কোথায় আছে বা আদৌ বেঁচে আছে কি না?’

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের তাইগ্রেতে আঞ্চলিক সরকারের বাহিনীর সঙ্গে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। তাইগ্রে অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাহিনীগুলোর হামলার অভিযোগ উঠলে ৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ সেখানে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী পাঠান এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।

এ অবস্থায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও তিনি পিছু হটতে রাজি নন। সেখানে চূড়ান্ত অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, তাইগ্রের রাজধানী মেকেলে নতুন করে বিমান হামলা চালানো হবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

স্থানীয় বাসিন্দাদের জাতিসত্তা বা ধর্ম বাছাই করে হামলা চালানো হচ্ছে বলে যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, তার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। ইথিওপিয়ায় পুরোপুরি মানবিক সংকট ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে জাতিসংঘ জানায়, প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মানুষ তাইগ্রে অঞ্চল ছেড়ে পালাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার মানুষ সুদানে ঠাঁই নিয়েছে।

ইথিওপিয়ার এই অস্থিরতার মধ্যে সুদান সরকার ২০ বছর ধরে বন্ধ থাকা তাদের ওম রাকুবা শরণার্থীশিবিরটি খুলে দেয়। ১৯৮৩-৮৫ সালে দুর্ভিক্ষের কারণে ইথিওপিয়া থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ঠাঁই দিয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষে ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। এখন সেখানে ২৫ হাজারের মতো মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।

আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই নেওয়া গেরদো বোরহান নামে ২৪ বছরের এক তরুণ বলেন, ‘আপনি যদি তাইগ্রেয়ান হন আর সরকারি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন, তাহলে আর রক্ষে নেই। তারা বন্দুকের নলের মুখে জানতে চাইবে আপনি তাইগ্রেয়ান কি না। কী উত্তর দেবেন, তা নিয়ে একটুও ইতস্তত করলেন তো মরলেন। তারা সেখানেই গুলি করে লাশ রাস্তায় ফেলে যায়। আপনি সাধারণ মানুষ বলে অনুনয় করলেও লাভ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা মারধর করতেই থাকে, কখনো কখনো এতে মৃত্যু হয়। অথবা কখনো কখনো ধরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখান থেকে কেউ ফিরে আসে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পরিস্থিতি খুবই ভয়ংকর।’

বোরহান সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে সুদানে আসতে পেরেছেন। তবে সেই পথ সুগম ছিল না। পাড়ি দিতে হয়েছে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি ঘন বনজঙ্গল। দুর্গম এই পথ পাড়ি দিতে হারিয়ে ফেলেছেন মা-বাবা ও দুই বোন।

default-image

৭৫ বছর বয়সী গানেত গাজেরদিয়েরের অভিজ্ঞতাও ভয়ংকর। শিবিরের বাইরে মাটিতে বসেই কথা বলছিলেন এএফপির সাংবাদিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে লাশগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। কিছু কিছু লাশ পচে যাচ্ছে, পথে পড়ে আছে, ছুরি দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।’ তিন মেয়ের সঙ্গে থাকতেন এই নারী। তিনি বলেন, ‘যখন বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হলো, আমরা ভয়ে অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে আসি। কিন্তু পথে হারিয়ে যায় মেয়েরা। পথে পরিচিত অনেককেই খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু বারবার পেছনে ফিরেও মেয়েদের পাইনি।’

আজ মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ তাঁর ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে বলেন, তাইগ্রের আঞ্চলিক বিশেষ বাহিনী ও মিলিশিয়া বাহিনীকে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের জন্য বেঁধে দেওয়া তিন দিনের সময় শেষ হয়েছে। তাই আগামী দিনগুলোতে সেখানে চূড়ান্ত অভিযান চালানো হবে।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় বাহিনী দাবি করেছে, তাইগ্রের পশ্চিম অঞ্চল এবং রাজধানী মেকেলে থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে আলামাটা শহরের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। কিন্তু তাইগ্রেয়ান নেতা দেবরেতশন এএফপির কাছে দাবি করেন, ‘আঞ্চলিক সরকার ও তাইগ্রের জনগণ তাদের ভূমি নিজেদের দখলেই রেখেছে। সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে আমাদের থামানো যাবে না।’

default-image

২০১৯ সালে শান্তিতে নোবেল পান আবি আহমেদ। তাঁর দেশে নতুন করে এই সংঘাত-রক্তপাতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তা থেকে বেরিয়ে আসতে আবির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নোবেল কমিটি। পাশাপাশি মধ্যস্থতার মধ্য দিয়ে এই সংঘর্ষের ইতি টানার আহ্বান জানান আফ্রিকার দেশগুলোর নেতারা। তবে বিশ্বনেতাদের এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন আবি আহমেদ।

মন্তব্য পড়ুন 0