default-image

বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা সংক্রমণ আবার দ্রুত বাড়ছে। এর পেছনে ভূমিকা রাখছে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনার ধরন (স্ট্রেইন)। করোনার এ ধরন অতিসংক্রামক। আক্রান্ত হলে দ্রুত রোগীকে কাবু করতে সক্ষম। এ কারণে করোনার দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন দেশে দেশে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও এই মুহূর্তে সংক্রমিত করোনা রোগীদের বেশির ভাগ দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনে আক্রান্ত বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের একেবারে শেষের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার বিশেষ এ ধরন প্রথম শনাক্ত হয়। অতিসংক্রামক এ ধরনের আনুষ্ঠানিক নাম বি.১.৩৫১। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে জায়গা করে নিয়েছে করোনার এ ধরনটি। গবেষকেরা জানান, এখন পর্যন্ত দুইবার রূপ বদলেছে করোনার এ ধরন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনার এ ধরনটির সংক্রমণ সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। দ্রুতই একজনের শরীর থেকে অন্যের শরীরে ছড়াতে পারে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য জানতে এখনো গবেষণা চলছে।

এই ধরনের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা

সংক্রমণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনার ধরন ঠেকাতে টিকা কতটা কার্যকর? গবেষকেরাও এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনার ধরনটি ফাইজার-বায়োএনটেকের উদ্ভাবিত কোভিড-১৯ টিকার সুরক্ষাবলয় কিছুটা হলেও ভেঙে ফেলতে পারে। ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশটির সর্ববৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্লালিৎ এ গবেষণাটি চালিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত শনিবার গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও ওই গবেষকেরা বলছেন, এ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় হয়নি, আরও গবেষণা-পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁরা বলছেন, ইসরায়েলের করোনার দক্ষিণ আফ্রিকান ধরনের সংক্রমণ তুলনামূলক কম। তাই গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত নমুনা পাওয়া যায়নি। তাঁদের মতে, আরও বড় পরিসরে এমন গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আর করোনার কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরনের বিরুদ্ধে টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতা যাচাই করাও এ গবেষণার লক্ষ্য ছিল না।

আল–জাজিরা বলছে, ইসরায়েলের এ গবেষণার ফল নিয়ে ফাইজারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। চলতি মাসের শুরুতে ফাইজার ও বায়োএনটেক জানিয়েছিল, ক্রিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা গেছে তাদের এ টিকা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনার ধরনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম। শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারে এ টিকা। দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮০০ মানুষের ওপর এ ট্রায়াল চালিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। যদিও সমালোচকদের মতে, মাত্র ৮০০ মানুষের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।

এদিকে গত জানুয়ারিতে মডার্না জানিয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার করোনার ধরন প্রতিরোধে তাদের উদ্ভাবিত কোভিড-১৯ টিকা বেশ কার্যকর। তবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকার কার্যকারিতা এ ধরনের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কমে আসার ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকানসহ করোনার সব ধরনের (স্ট্রেইন) ক্ষেত্রে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার কার্যকারিতা ৫৭ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে। এক ডোজের এই টিকার প্রয়োগ বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রতিরোধে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার প্রয়োগ স্থগিত করার সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কেন্দ্রীয় দুটি সংস্থা মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে এই সুপারিশ করে। এই টিকার প্রয়োগের ফলে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় এ সুপারিশ করা হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পরিস্থিতি

যে দেশ থেকে করোনার এ ধরনের বিস্তার, সেই দক্ষিণ আফ্রিকায় সোমবার পর্যন্ত ১৫ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে দেশটিতে মারা গেছেন ৫৩ হাজার ৩২২ জন। সংক্রমণ ও মৃত্যুর হালনাগাদ এ সংখ্যা জানিয়েছে ওয়ার্ল্ডোমিটারস। নতুন ধরন শনাক্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত জানুয়ারির শুরুর দিকে দেশটিতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ উঠেছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। এখন তা অনেকটাই কমে এসেছে। গত শুক্রবার দেশটিতে ১ হাজার ২৮৫ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। আর ওই দিন মারা যায় ৩০ জন।

বিবিসির খবরে বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় জনসন অ্যান্ড জনসনের উদ্ভাবিত করোনার টিকা দিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এক ডোজের এই টিকার ৮০ হাজার ডোজ পেয়েছে তারা। জনসনের কাছ থেকে মোট ৯০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার কথা দেশটির। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার বলছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা হাতে পেলেও এই টিকার প্রয়োগ শুরু করেনি তারা। নতুন ধরনের বিরুদ্ধে এই টিকা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে দ্বিধা রয়েছে দেশটির স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই টিকা প্রয়োগ করে যতটা সুরক্ষা পাওয়া যায়, সেই তুলনায় ঝুঁকি অনেক কম। তাই আফ্রিকার দেশগুলোতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রয়োগ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন
আফ্রিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন