বর্ণবাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা আজ বর্ণবাদ নির্মূলে সারা বিশ্বের আদর্শ। তবে দেশটির বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলার রেখে যাওয়া বর্ণবাদবিরোধী আদর্শে ফাটল ধরেছে বলে মনে হচ্ছে।
দীর্ঘ কারাভোগের পর ম্যান্ডেলা মুক্তি পান ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। সেই দিনটির ২৫ বছর পূর্তি হচ্ছে কাল বুধবার। কিন্তু আজও বর্ণবাদের বিভাজনের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে ম্যান্ডেলার দেশের মানুষকে। বর্ণবাদের বিভাজন দূর করে সংহতি ফিরিয়ে আনতে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি) গঠন করেছিলেন ম্যান্ডেলা। আজও কাজ করে যাচ্ছে এই কমিশন। তবে সামাজিক বিভেদ ঘুচছে না। বরং, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের আন্তসম্পর্ক নিয়ে দশকব্যাপী চলা একটি গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, এই যুগেও দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ বর্ণবাদকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে মনে করে না।
গবেষণাটি পরিচালনা করে ইনস্টিটিউট অব জাস্টিস অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটি বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ মানুষের সমন্বয়ে গড়া একটি দক্ষিণ আফ্রিকা গড়ার ইচ্ছা অনেকটাই কমতির দিকে।
নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশনের গবেষণা ও আর্কাইভ বিভাগের পরিচালক ভারনে হ্যারিস বলেন, ‘বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকল্প বিপদের মুখে আছে। মনে হয় আফ্রিকার মানুষ অতীতের হিসাব খুব দ্রুত মিটিয়ে নিতে চাচ্ছে। অনেক দেশ এর জন্য অপেক্ষা করে। অন্তত ২০ বছর। তবে আমরা অপেক্ষা করতে পারলাম না।’
হ্যারিস জানান, সম্প্রতি কেপটাউনের একটি সড়কের নামকরণ দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী আমলের শ্বেতাঙ্গ নেতা এডব্লিউডি ক্লার্কের নামে করার প্রতিবাদ জানায় স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গরা। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
ম্যান্ডেলাকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে এবং বর্ণবাদী আইন বাতিলে ডিক্লার্কের ভূমিকা ছিল। ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ডিক্লার্ক।
হ্যারিস বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার বেশির ভাগ মানুষ আজও বর্ণবাদের বিভাজিত সমাজে বাস করে। এটা তাদের ক্ষুব্ধ করে। পুরোনো বিভাজন এবং পুরোনো বর্ণবাদ এখন আরও স্পষ্ট।’
ইউনিভার্সিটি অব ফ্রি স্টেটের ইনস্টিটিউট ফর রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিসের পরিচালক আন্দ্রে কিট বলেন, ‘আমাদের জাতীয় রাজনীতির যে চরিত্র, তা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে সহায়ক নয়।’
দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তায় বর্ণবাদী ছোঁয়া আজও প্রকট। দক্ষিণ আফ্রিকায় আগমনকারী প্রথম ডাচ নাগরিক জঁ ফন রিবেককে উদ্দেশ করে গত মাসে প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা বলেন, তখন থেকেই সব সমস্যার শুরু।
এই মন্তব্যে ফ্রিডম ফ্রন্ট প্লাস পার্টি জুমার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে মামলা করার হুমকি দেয়।
কিট বলেন, বিভাজনের কারণ, এখানে কেবল টিআরসির মাধ্যমে ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়ায় মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেমন করে ঐক্য আনা সম্ভব, সে বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গেছে।

বিজ্ঞাপন
আফ্রিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন