বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত আগস্ট মাসে কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে আইএসের আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনায় ১৫০ জনের বেশি নিহত হন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর সেনারা আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ার পর দৃশ্যত এখন আইএসকেপি (আইএসের খোরাসান শাখা) তালেবানের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। দুই পক্ষ এখন রক্তাক্ত লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। আর এ লড়াইয়ের কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে জালালাবাদ।
পশ্চিমা জোটের বিরুদ্ধে তালেবানের লড়াই শেষে আফগানিস্তান এখন অনেকটাই শান্ত। কিন্তু জালালাবাদে তালেবান সদস্যদের লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিদিনই হামলার ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়ভাবে দানেশ নামে পরিচিত আইএস তালেবানের পুরোনো কৌশল প্রয়োগ করছে। তালেবান যেভাবে সাবেক সরকারকে উৎখাত করেছে সেই কৌশল, যেমন রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ও গুপ্তহত্যা। এখন এগুলোই চালিয়ে যাচ্ছে আইএস। আইএসের চোখে তালেবান যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বা নিজেদের আদর্শ বাস্তবায়নে যথেষ্ট কঠোর নয়। আর তালেবানের চোখে আইএস ‘ধর্মদ্রোহী চরমপন্থী’।

নানগরহার প্রদেশের রাজধানী জালালাবাদ। সেখানে বাড়ি তালেবানের গোয়েন্দাপ্রধান ড. বশিরের। ভয়ানক ব্যক্তি হিসেবে তাঁর বেশ দুর্নাম রয়েছে। অতীতে তিনি পার্শ্ববর্তী কুনার এলাকায় আইএসের একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী ঘাঁটি ধ্বংস করতে সহায়তা করেন। তবে এখন রাস্তার পাশে ফেলে রাখা লাশের সঙ্গে তালেবানের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। অবশ্য তাদের হাতে অনেক আইএস সদস্য ধরা পড়ার বিষয়টিতে তিনি গর্ববোধ করেন। সম্প্রতি তালেবানের ক্ষমতা দখলের সময় বিশৃঙ্খলার সুযোগে অনেক আইএস সদস্য কারাগার ছেড়ে পালায়।

ড. বশির ও তালেবানের অন্য সদস্যদের বক্তব্য, আফগানিস্তানে যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছে। তাঁরা দেশটিতে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনছেন। বশির দাবি করেন, আফগানিস্তানে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে আইএসের অস্তিত্ব নেই। অথচ আইএসের অস্তিত্ব থাকার সব ধরনের প্রমাণ রয়েছে দেশটিতে। তিনি বলেন, সিরিয়া ও ইরাকে দায়েশ আছে। দায়েশ নামে এখানে কোনো দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী নেই। তিনি এই জঙ্গিদের বিশ্বাসঘাতকের দল বলে মনে করেন, যারা ইসলামিক সরকারের বিপক্ষে বিদ্রোহ করেছে।

বাস্তবতা হলো, আইএস শুধু আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠিতই নয়, এটি দেশটিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘প্রাদেশিক শাখা’ প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা আইএস-কে নামে পরিচিত। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আইএসকে যাত্রা শুরু করে। সেই সময় তাদের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কারণ, এর আগে ২০১৪ সালে সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন এলাকা দখল করে তথাকথিত ‘খেলাফত’ ঘোষণা করে আইএস।

default-image

চলতি মাসের শুরুর দিকে আইএস আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় সবচেয়ে বড় শহর কুন্দুজের খান আবাদ এলাকার গোজার-এ-সাইয়েদ আবাদ মসজিদে জুমার নামাজের সময় ভয়াবহ বোমা হামলা চালায়। হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান ৪৬ জন।
ড. বশির এ ঘটনায় উদ্বেগের কিছু নেই বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বকে আশ্বস্ত করছি, চিন্তার কিছু নেই। সন্ত্রাসীদের কোনো ছোট এক গোষ্ঠীও যদি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং এ ধরনের হামলা চালায়, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা ৫২ দেশের জোটকে যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করেছি...তারাও (সন্ত্রাসী) সেভাবেই পরাজিত হবে।’ দুই দশক ধরে বহুজাতিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘গেরিলাযুদ্ধকে প্রতিহত করা আমাদের জন্য কঠিন কিছু নয়।’

কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে আইএসের হামলার ঘটনায় আফগানবাসীসহ প্রতিবেশী ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আফগানিস্তানের বাইরে হামলা চালাতে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে আইএস তাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

default-image

এ মুহূর্তে আফগানিস্তানে আইএসের নিয়ন্ত্রণে কোনো অঞ্চল নেই। কিন্তু একসময় নানগরহার ও কুনার প্রদেশে তাদের ঘাঁটি ছিল। পরে তালেবানের পাশাপাশি মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় আফগান সেনাবাহিনীর হাতে উৎখাত হয় ঘাঁটি দুটি। তালেবানের সদস্যসংখ্যা যেখানে প্রায় ৭০ হাজার, সেখানে আইএসের সদস্য মাত্র কয়েক হাজার।
এখন তালেবানের হাতে রয়েছে পশ্চিমা বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র। অন্যদিকে আইএস মধ্য এশিয়া ও পাকিস্তান থেকে বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগ দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইএসের অনেক সদস্যই আফগান তালেবান ও পাকিস্তানি তালেবান থেকে দলছুট। এক তালেবান নেতা বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা তাদের ভালোভাবে জানি, তারাও আমাদের ভালোভাবে জানে।’

সম্প্রতি বেশ কিছু আইএস সদস্য নানগরহারে ড. বশিরের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তালেবানের সাবেক এক সদস্য বিবিসিকে বলেছেন, আইএসে যোগ দেওয়ার পর তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তালেবানের একমাত্র লক্ষ্য যেখানে আফগানিস্তানে ‘ইসলামিক আমিরাত’ প্রতিষ্ঠা করা, সেখানে আইএসের লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে তাদের ‘তথাকথিত খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করা।

তালেবানের ওই সদস্য বলেন, আইএস সবার জন্য, পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা পুরো বিশ্বে তাদের শাসন কায়েম করতে চায়। কিন্তু তাদের শাসন কায়েমের ভাষা হবে ভিন্ন। তবে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার যথেষ্ট শক্তি তাদের নেই।

default-image

অনেক আফগান আইএসের সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলোকে ‘নতুন খেলা’ বলে মনে করছেন। জালালাবাদে শুধু যে তালেবানই আইএসের শিকার হচ্ছে এমনটা নয়। সমাজকর্মী আবদুল রহমান মাওয়েন বিয়ের একটি অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে আইএসের হামলার শিকার হন। তাঁর গাড়িতে গুলি ছোড়া হয়। গাড়িতে দুই ছোট্ট ছেলের সামনে মারা যান তিনি।

আবদুল রহমানের ভাই শাদ নূর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে বলছি, যখন তালেবান ক্ষমতায় এল, আমরা খুব খুশি ও আশাবাদী হয়েছিলাম। ভেবেছি দেশ থেকে দুর্নীতি, হত্যা, মারামারি দূর হবে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আইএসের তৎপরতায় আমরা নতুন এক পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছি।

ভাষান্তর: লিপি রানী সাহা

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন