সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে চিকিৎসক দল শিনজো আবেকে বাঁচাতে চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তাঁরা তাঁর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চেষ্টা চালিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ১০০ ইউনিটের বেশি রক্ত দেওয়া হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে এক চিকিৎসক নিশ্চিত করেন, আবের শরীরে দুটি ক্ষত পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো গুলির দ্বারা সৃষ্ট ক্ষত। কিন্তু চিকিৎসক দল অস্ত্রোপচারের সময় কোনো গুলি খুঁজে পায়নি।

জাপানের স্থানীয় গণমাধ্যম কিয়োডোর খবরে জানানো হয়েছিল, স্থানীয় সময় আজ শুক্রবার জাপানের পশ্চিমাঞ্চলের নারা শহরে নির্বাচনী বক্তব্য দেওয়ার সময় পেছন থেকে গুলি করা হয় ৬৭ বছর বয়সী শিনজো আবেকে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল।

দেশটিতে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শিনজো আবের মৃত্যুতে পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোক প্রকাশ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিয়ো কিশিদা এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে এটিকে বর্বরতা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এ গুপ্তহত্যাকাণ্ডের কথা শুনে ‘ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন’ বলে উল্লেখ করেন।

মহান এই নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। কিশিদা আবেকে ‘কাছের বন্ধু’ উল্লেখ করে বলেন, অনেকটা সময় তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে অনেক মূল্যবান উপদেশ ও সমর্থন পেয়েছেন।

জাপানে দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আবে। অসুস্থতার কারণে ২০২০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। তবে ক্ষমতায় থাকা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ওপর তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

এ হত্যাকাণ্ডের পর জাপানের পুলিশ তাৎসুইয়া ইয়ামাগামি নামে ৪১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করেছে। হামলাকারী জাপানের সাবেক নৌসেনা (জাপানিজ মেরিটাইম সেলফ ডিফেন্স ফোর্স)। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি অস্ত্র দিয়ে তিনি শিনজো আবেকে গুলি করেন। আটকের পর তাঁর অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। হামলার সময় তাঁর পরনে ধূসর রঙের টি–শার্ট ও ট্রাউজার ছিল।

জাপানে বন্দুক আইন খুবই কঠোর। সেখানে সহিংসতার ঘটনায়ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা বিরল।

বিশ্বব্যাপী বন্দুক সহিংসতার ঘটনার নজরদারিকারী প্রতিষ্ঠান স্মল আর্মস সার্ভে জানায়, ২০২০ সালে জাপানে আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাউন্সিলের জাপানবিষয়ক পরিচালক ন্যান্সি স্নো বলেন, আবের এই গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা জাপানকে অনেকটা পাল্টে দেবে।

স্নো সিএনএনকে বলেন, ‘জাপানে গুলি করে হত্যার ঘটনা শুধু বিরল নয়, এটি সত্যিকার অর্থে সাংস্কৃতিকভাবেও সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। আমাদের দেশে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের যে সংস্কৃতি আছে, তা জাপানের সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। এই সময়টায় বলার মতো কিছু নেই। আমি আসলে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।’

জাপানের আগ্নেয়াস্ত্র আইন অনুযায়ী, জাপানে শুধু শটগান বিক্রির অনুমোদন আছে। ক্ষুদ্র অস্ত্র (রিভলবার, পিস্তল) রাখা এখানে আইনবিরুদ্ধ। এই আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়ার প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘ। এ জন্য প্রচণ্ড ধৈর্যের প্রয়োজন।

অস্ত্র পেতে হলে জাপানে একজন সম্ভাব্য ক্রেতাকে দিনব্যাপী ক্লাসে অংশ নিতে হয়, লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে হয়। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের পরীক্ষা এবং মাদকের পরীক্ষা দিতে হয়। তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হয় ব্যাপকভাবে। আগে অপরাধের কোনো ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না, ব্যক্তিগত ঋণ আছে কি না, সংঘবদ্ধ কোনো অপরাধে সম্পৃক্ততা আছে কি না বা পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও এখানে খতিয়ে দেখা হয়।

অস্ত্রের নিবন্ধন পাওয়ার পর এর মালিককে অবশ্যই পুলিশের কাছ থেকে এ অস্ত্রের নিবন্ধন করতে হয়। এ অস্ত্র কোথায় রাখা হবে, তা জানাতে হয়। একটি পৃথক এবং তালাবদ্ধ স্থানে এটি রাখতে হয়। প্রতিবছর অন্তত একবার এ অস্ত্র পুলিশকে দেখাতে হয়। অস্ত্রের নিবন্ধনের নবায়ন করতে প্রতি তিন বছর পর প্রশিক্ষণ নিতে হয় এবং পরীক্ষায় বসতে হয়।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন