শিনজো আবের হত্যাকারী তেৎসুইয়া ইয়ামাগামিকে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পুলিশের পক্ষ থেকে খুবই কম তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় গুজব কারখানার পরিচালকেরা সেই সুযোগ গ্রহণ করে নানা রকম সংবাদ প্রচারে লিপ্ত হচ্ছেন, যার মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার মতো উপাদান থেকে যাওয়া সংবাদের ঘাটতিও একেবারেই নেই। ঘৃণার ভাষণ জাপানে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও ফেসবুক-টুইটার-লাইনের কল্যাণে সেই নিষেধাজ্ঞার প্রতি অবজ্ঞা–প্রদর্শনের মনোভাবেও কোনো রকম ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না।

জাপানের পুলিশ হত্যাকারীর যে পরিচয় তুলে ধরেছে, তাতে দেখা যায়, ৪১ বছর বয়সী সেই ব্যক্তি নারা শহরের অধিবাসী এবং বিশেষ একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর পারিবারিক কারণে বীতশ্রদ্ধ। ফলে বিশেষ সেই ধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় পুলিশ প্রকাশ না করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিন্তু নানা রকম পরিচয়ে সেই গোষ্ঠীকে জনতার সামনে উপস্থিত করছে। শুধু তা–ই নয়, হত্যাকারীর পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তিকর বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা পিছিয়ে নেই। টুইটার-ফেসবুক-লাইনের মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশ কিছু পোস্টিংয়ে যেমন এ রকম পরিষ্কার আভাস দেওয়া হয়েছে, ইয়ামাগামি আসলে বংশগত দিক থেকে জাপানি নন। তিনি হচ্ছেন জাপানে সাধারণভাবে ‘জাইনিচি’ নামে পরিচিত কোরীয় বংশোদ্ভূত।

‘জাইনিচি’ কারা

১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরীয় উপদ্বীপ জাপানের উপনিবেশ থাকা অবস্থায় কোরিয়ার যেসব শ্রমিককে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে খনি ও কলকারখানায় কাজ করার জন্য জাপানে নিয়ে আসা হয়েছিল, এদের উত্তর-পুরুষদের মধ্যে বড়সংখ্যক পরবর্তী সময়ে জাপানে থেকে গিয়েছিলেন। তাঁরাই জাপানে ‘জাইনিচি’ হিসেবে পরিচিত। জাপানের সমাজ জাইনিচিদের কখনোই সমাজের মূলধারার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেনি। নানা রকম বৈষম্যের শিকার বিভিন্ন সময়ে তাঁদের হতে হয়েছে। সম-অধিকারের ধারণার দিক থেকে জাপানের সমাজ ইদানীং নানাভাবে এগিয়ে গেলেও জাইনিচিদের প্রতি অবজ্ঞার মনোভাব আজও পুরোপুরি দূর হয়নি এবং অতীতের মতো প্রকাশ্যে না হলেও সংকটের সময় সেই মনোভাব আবেরও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেখা যায়।

অতীতে সেই ঘৃণা এতটাই ব্যাপক ছিল যে দেশে কোনো রকম প্রতিকূল অবস্থা দেখা দিলে এর জন্য শুরুতেই অনেক ক্ষেত্রে তাদের সরাসরি দায়ী করা হতো। শুধু তা–ই নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে সে রকম গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হতো। ১৯২৩ সালে টোকিও এবং আশপাশের এলাকার উপর আঘাত হানা প্রচণ্ড ভূমিকম্পের পর যেমন গুজব রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নিয়ে কোরীয়রা রাজধানীর পানির উৎসগুলোতে বিষ মিশিয়ে দিয়ে জাপানিদের নির্বিচারে হত্যা করে চলেছে। এর ফলে কোরীয়দের আঘাত হানার দাঙ্গা জাপানের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে কোরীয় বংশোদ্ভূত অনেকে তখন প্রাণ হারিয়েছিলেন। আজকাল ঠিক সেরকম নগ্ন প্রচার না চালানো হলেও কোরীয় বংশোদ্ভূতদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণের মনোভাব জাপানে যে পুরোপুরি দূর হয়ে যায়নি, আবের হত্যার ঘটনা সেই বাস্তবতা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশ কিছু পোস্টিংয়ে যেমন দাবি করা হচ্ছে, ইয়ামাগামি আসলে হচ্ছেন একজন ‘জাইনিচি’, জাপানের ক্ষতি করার জন্য তিনি ঘটনা ঘটিয়েছেন। গুজবের বড় এক অংশ ‘জাইনিচি’র উল্লেখ করলেও একই সঙ্গে হত্যার সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সংযোগ থাকার উল্লেখও অনেক পোস্টিংয়ে করা হচ্ছে। জাপানের প্রভাবশালী দৈনিক ‘মায়নিচি শিম্বুন’ সেরকম বেশ কিছু পোস্টের বর্ণনা দিয়ে উল্লেখ করেছে, অপরাধীর পরিচয় এবং উদ্দেশ্য নিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া এ রকম গুজবে অনেকেই সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়া নিয়ে শঙ্কিত। কিছু কিছু পোস্টিং ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্রের উপস্থিতি খুঁজে পেয়ে এ রকমও বলছে, গুলি চালানোর পেছনে জাইনিচি ছাড়াও চীন ও রাশিয়ার হাত রয়েছে এবং হত্যার আদেশ এরাই দিয়ে থাকবে।

কোরীয় বংশোদ্ভূতদের নিয়ে এ রকম গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকায় ফুকুওকা শহরে দক্ষিণ কোরিয়ার কনস্যুলেট কার্যালয় সরকারি টুইটার অ্যাকাউন্টে সতর্ক করে দিয়েছে, আবের হত্যার ঘটনার পর জাপানে বসবাসরত কোরীয়রা ঘৃণার ভাষণের লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারেন।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন