default-image

সেই আটককেন্দ্রের সেলগুলোর দরজা এত নিচু যে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়েছিল লি ইয়ং-জু নামের আরেক বন্দীকে। এরপর তাঁকে হাত হাঁটুতে রেখে আসন গেড়ে বসতে বলা হয়। এভাবে বসে থাকতে হতো দিনে ১২ ঘণ্টা। একটু এদিক-সেদিক হলে বা সেখানে থাকা অন্যদের সঙ্গে সামান্য ফিসফাস করলেও তাঁকে গুরুদণ্ড ভোগ করতে হতো। ওই সময়ে চাইলেই পানি খেতে পারতেন না লি ইয়ং। আর খাওয়ার জন্য দেওয়া হতো ভুট্টার সামান্য ভুসি।

ইয়ং-জুর ভাষ্য, ‘সেখানে আমার নিজেকে পশু মনে হতো, মানুষ নয়।’ ২০০৭ সালে দেশ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চীনে ধরা পড়ার পর তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়। রাখা হয় চীন সীমান্তের কাছে ওই ডিটেনশন সেন্টারে। বিচারের অপেক্ষায় তিন মাসে সেখানে তাঁকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি বিসিসির কাছে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

সেলে থাকাকালে ইয়ং-জু সারাক্ষণই রক্ষীদের বুট জুতার ‘ক্ল্যাক, ক্ল্যাক’ শব্দ পেতেন। এই শব্দ সেলের সামনে থেকে ঘুরে পেছনে, আবার সামনে—এভাবে আসত। এর মানে সেলের বাইরে সারাক্ষণই টহল চলত। যখনই জুতার শব্দ মৃদু হয়ে আসত, তখনই ইয়ং-জু সেলের সঙ্গীদের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলার চেষ্টা করতেন।

লি ইয়ং-জু বলেন, ‘আমরা আবারও দেশ ছেড়ে পালানো, দালালদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা—এসব গোপন বিষয়ে কথা বলতাম।’

এই আটককেন্দ্রগুলো মূলত উত্তর কোরিয়া থেকে লোকদের পালালে কী হবে, সেই ভয় তৈরি করার জন্যই ছিল। তবে এটি স্পষ্ট যে এ ভয় লি ইয়ং-জু বা তাঁর সেলসঙ্গীদের ওপর কাজ করেনি। সেখানে থাকা বেশির ভাগই দেশছাড়ার চেষ্টা করার অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু লি ইয়ং-জুর পরিকল্পনার কথা বাইরে ফাঁস হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘রক্ষীরা আমাকে সেলের গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত বের করতে বলে।

এরপর সেই রক্ষী চাবির রিং দিয়ে মারতে শুরু করে। হাত ফুলে নীল হওয়া পর্যন্ত এ মার চলতে থাকে। আমি অভিমানে কাঁদতে চাইনি। এই রক্ষীরা আমাদের মধ্যে যাঁরা উত্তর কোরিয়া ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের বিশ্বাসঘাতক বলে মনে করত। বারান্দা ঘেঁষে যতগুলো সেল ছিল, সব কটি থেকেই মারের শব্দ পাওয়া যেত। আমি ৩ নম্বর সেলে থাকতাম। কিন্তু ১০ নম্বর সেলে মারধরের শব্দও আমি শুনতে পেতাম।’
উত্তর কোরিয়ার কারাগারে আন্তর্জাতিক আইনের কতটা লঙ্ঘন হয়, তা বিস্তারিতভাবে তদন্ত করে দেখতে ‍‘কোরিয়া ফিউচার’ (https://www.koreafuture.org/nkpd) নামের অলাভজনক একটি বেসরকারি সংগঠন দুই শতাধিক বন্দীর সঙ্গে কথা বলেছে।

লি ইয়ং-জু তাঁদের একজন। সংগঠনটি ১৪৮টি কারাগারে ৭৮৫ বন্দীর বিরুদ্ধে ৫ হাজার ১৮১টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এবং এর পেছনে দায়ী ৫৯৭ জনকে চিহ্নিত করেছে।

default-image

সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, চলতি মাসে চালু করা নর্থ কোরিয়া প্রিজন ডেটাবেইস হলো দেশটির প্যানেল সিস্টেমে সংগঠিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন ও নৃশংসতার একটি ক্রমবর্ধমান ও ব্যাপক সংরক্ষণাগার। ডেটাবেইসটি কোরিয়া ফিউচারের বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে সংগৃহীত প্রমাণ সংরক্ষণ করে।
উত্তর কোরিয়া অবশ্য সব সময় নিজ দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে বিবিসি থেকে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

কোরিয়া ফিউচার লোকজনকে কারাগারের অবস্থা স্বচক্ষে দেখানোর জন্য অনসং আটককেন্দ্রের একটি থ্রিডি মডেলও তৈরি করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে কোরিয়া ফিউচারের সহপরিচালক সুইয়ন ইয়ু বিবিসিকে বলেন, উত্তর কোরিয়ার কারাব্যবস্থা এবং এর ভেতরে যে নির্যাতন চলে, তা ‘দেশটির ২ কোটি ৫০ লাখ জনগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখার জন্যই’ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিটি সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রেই কারাগারের এই নির্যাতন কীভাবে তাঁদের জীবনে প্রভাব ফেলেছে, এর সাক্ষী হয়েছি। একজন তো নবজাতককে হত্যার ঘটনা চাক্ষুষ দেখার কথা বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেন।’

নির্যাতনের নানা অভিযোগ

অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে উত্তর কোরিয়া বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার দেশটি শাসন করছে। দেশটির নাগরিকদের বর্তমান নেতা কিম জং-উনের পাশাপাশি কিম পরিবারের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য দেখাতে হয়। আর করোনা মহামারির মধ্যে দেশের ভেতরে ও বাইরে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।

সেখানে কেউ যদি বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে, তবে তাঁকে কঠোর শাস্তি পেতে হয়। এমনকি সেখানে বিদেশি সিনেমা বা নাটক দেখাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দেশটির শাসনব্যবস্থায় বারবার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং প্রতিটি কারাগারেই একই অবস্থা। সেখানে বন্দীদের ধর্ষণ ও নানা ধরনের যৌন নির্যাতনের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সেখানে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়েছে বলে কয়েকজন দাবি করেন।

নর্থ হামগিঅং প্রাদেশিক ডিটেনশন সেন্টারের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে সাবেক এক বন্দী বলেন, সেখানে আট মাসে একজনের গর্ভপাত করানো হয়। শিশুটি সে সময় বেঁচে ছিল এবং তাকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া পাঁচজন বলেছেন, তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখেছেন।

ন্যায়বিচারের পথে আরও এক ধাপ

বিচারে লি ইয়ং-জুর সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড হয়। তিনি বলেন, ‘আমি চিন্তায় ছিলাম, এই সাড়ে তিন বছরের মেয়াদ শেষ করতে গিয়ে আমি মরে না যাই। যখন আপনি এ ধরনের বন্দিশালায় ঢুকবেন, তখন আপনার নিজেকে মানুষ মনে হবে না। একপর্যায়ে ধৈর্য ও বেঁচে থাকার ইচ্ছা চলে যাবে।’

সাইরম নামের আরেকজনও ২০০৭ সালে অনসং ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী ছিলেন। সেখানে কীভাবে পেটানো হয়, সেই অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বলেন, ‘তারা আপনার ঊরুতে কাঠের লাঠি দিয়ে মারবে। আপনি হেঁটে ঢুকবেন, কিন্তু হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে হবে। যখন অন্যদের মারত, আমি তাদের দিকে তাকাতে পারতাম না। আমি মাথা ঘুরিয়ে নিতাম, কিন্তু তারা আমাকে সেটা দেখতে বাধ্য করত। তারা আপনার অন্তরাত্মাকে হত্যা করে।’

কারাগারের সেই দুঃস্বপ্নের কথা মনে করে সাইরম বলেন, ‘যদি কোনো উপায় থাকে, আমি চাই, তারা শাস্তি পাক।’ বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় আছেন। এখানে তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছেন। এ ঘটনাগুলোর বিচার পাওয়া কঠিন। তবে এই তদন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্যপ্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
সাইরম ও লি ইয়ং-জু দুজনেই আশা করছেন, এসব তথ্যপ্রমাণ তাঁদের ন্যায়বিচার পেতে আরও একধাপ এগিয়ে দেবে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন