এমন অবস্থায় রাজাপক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে জনবিদ্রোহে জড়িত লাখো তরুণ এবং অন্যদের হৃদয়ের আর্তনাদ হলো, তাদের প্রয়োজন একজন নেলসন ম্যান্ডেলা। তাদের আকুতি, ‘আমাদের একজন ম্যান্ডেলা দাও।’ দেশটির গণমাধ্যমে ডেইলি মিররের মতামতে এ কথা বলা হয়েছে।

মতামতে বলা হয়েছে, তিন মাসের বেশি সময় ধরে দেশটির বেশির ভাগ অংশে চলছে বিক্ষোভ। শ্রীলঙ্কায় এমন একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজন, যিনি নির্বাচনের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কাজ করবেন। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে খুব কমই এমন কোনো রাষ্ট্রনায়ক দেখেছে দেশটি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডুডলি সেনানায়েকের মতো নেতারা এ ধরনের মর্যাদা অর্জনের কাছাকাছি এসেছিলেন। কিন্তু ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনগণ তাঁকে এবং তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, তিনি মূলত চালের রেশন দুই কিলোগ্রাম থেকে কমিয়ে এক কিলোগ্রাম করেছিলেন। বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে মানুষের কাছে গর্ব করেছিলেন, তিনি প্রয়োজনে চাঁদ থেকেও চাল আনবেন।

গত শতকে সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা। কয়েক দশক কারাবাস ও নির্যাতন সহ্য করেছিলেন। কারণ, দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের শ্বেতাঙ্গ-আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী এ নীতিকে কার্যত সারা বিশ্ব নিন্দা জানিয়েছিল। বিদ্বেষপূর্ণ এবং অমানবিক এ নীতি খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছিল। ওই সময় দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের সফর নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ, দলটিতে একজন ভিন্ন বর্ণের খেলোয়াড় বাসিল ডি অলিভেরা ছিলেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) দক্ষিণ আফ্রিকাকে টেস্ট ক্রিকেটে ১৯৭০ সালে নিষিদ্ধ করে।

এর পরের সপ্তাহে ১৮ জুলাই, নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস পালন করে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থা যে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে এমন আন্তর্জাতিক সম্মান দিয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ম্যান্ডেলা। এ উপলক্ষে নেলসন ম্যান্ডেলার এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো কিছু ভেঙে ফেলা এবং ধ্বংস করা সহজ। বীর তারাই, যারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং গড়ে তোলে।’

জাতিসংঘের মতে, ম্যান্ডেলা মানবতার সেবায় তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন একজন মানবাধিকার আইনজীবী, একজন বিবেকের বন্দী, একজন আন্তর্জাতিক শান্তিপ্রণেতা এবং স্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে। ২০০৯ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৮ জুলাইকে নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এতে ম্যান্ডেলার মূল্যবোধকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সংঘাতের সমাধানে মানবতার সেবায় তার উৎসর্গকে স্বীকৃতি দেয়; জাতি সম্পর্ক; মানবাধিকা; লিঙ্গসমতা, শিশু এবং অন্য দুর্বল গোষ্ঠীর অধিকার; দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই; সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রচারকে স্বীকৃতি দেয়।

২০১৮ সালে বিশ্বনেতারা নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি সম্মেলনের জন্য নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে মিলিত হন। শীর্ষ সম্মেলনে প্রায় ১০০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, সদস্যরাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণকারীরা একটি ন্যায়, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য বিশ্ব গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে দ্বিগুণ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার গ্রহণ করেন।

২০১৯ থেকে ২০২৮ সালকে নেলসন ‘ম্যান্ডেলা শান্তির দশক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে তাঁর নম্রতা, ক্ষমা ও সহানুভূতির জন্য অভিবাদন জানানো হয়। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে এবং বিশ্বজুড়ে শান্তির সংস্কৃতির প্রচারে তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার রাজাপক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে জনবিদ্রোহে জড়িত লাখো তরুণ এবং আন্দোলেন অংশ নেওয়া অন্যরা নানা বিষয় উত্থাপন করে চলেছে। এর একটি বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া। কারণ, দিনব্যাপী জ্বালানির লাইনে মানুষের অপেক্ষা তরুণদের কষ্ট দেয়। শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণদের হৃদয় থেকে আর্তনাদ হতে পারে যে ‘আমাদের একজন ম্যান্ডেলা দাও’।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন