বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৯৬ সালে তালেবান প্রথম আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে। এর আগে কেমন ছিল আফগান নারীদের জীবন? অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক উইলিয়াম পোডলিচ ১৯৬৭ সালে ইউনেসকোর এক প্রকল্পের আওতায় দুই বছরের জন্য কাবুলের টিচার্স কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিনি ছিলেন শৌখিন আলোকচিত্রী। সে সময় পোডলিচের তোলা ছবিগুলোয় তালেবানের ক্ষমতা দখলের আগের আফগান নারীদের জীবনযাত্রার আন্দাজ মেলে। সে সময়ের আফগান নারীরা পাশ্চাত্য পোশাকে অভ্যস্ত ছিলেন। নারী–পুরুষ একসঙ্গে বাসে যাতায়াত করতেন এবং শপিং মলে যেতেন। স্কুল–কলেজে নারীদের পড়াশোনা, গানবাজনা, খেলাধুলার ছবিও উঠে এসেছে পোডলিচের ক্যামেরায়।

default-image

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান শাসনামলে নারীদের জীবনযাপন বদলে যায়। নানা নিয়মের বেড়াজালে অনেকটাই ঘরবন্দী হয়ে পড়েন নারী। নারী স্বাধীনতা কী, তা বোধ হয় সে সময় ভুলতেই বসেন তাঁরা। সে সময় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া ও চাকরি নিষিদ্ধ করা হয়। নারীদের খেলাধুলা ছিল নিষিদ্ধ। বাইরে যেতে হলে পুরো শরীর ঢেকে যেতে হতো তাঁদের। পুরুষসঙ্গী ছাড়া বের হতেও পারতেন না তাঁরা। হত্যা ও ব্যভিচারের সাজা ছিল জনসমক্ষে ফাঁসি।

১৯৯৯ সালে তালেবান শাসনামলে থাকা এক নারীর বর্ণনায় উঠে আসে তাঁদের সে সময়ের কষ্টের জীবনের কথা। ফিব্রা নামের সেই নারীর বয়স এখন ৩২ বছর। থাকেন লন্ডনে। ১৯৯৯ সাল ছিল ফিব্রার শৈশবকাল। ফিব্রারা ছিলেন চার বোন ও এক ভাই। ফিব্রার বাবাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তালেবান। বাবাকে তাঁরা আর ফিরে পাননি। তালেবান শাসনামলে তাঁদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাবার খোঁজ করার সময় মাকেও মারধর ও হুমকি-ধমকি দেয় তালেবান। তালেবান শাসনের পতনের পর ফিব্রাদের পড়াশোনা আবার শুরু হয়। দুই দশক পর তালেবান ফিরে আসায় আফগানিস্তানে থাকা পরিবার নিয়ে এখন আবার উদ্বেগে রয়েছেন ফিব্রা।

default-image

২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর নারীদের জীবনে আবারও বদল আসে। শুরু হয় নতুন পথচলা। নারীরা আবার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কর্মক্ষেত্রে বাড়ে নারীদের পদচারণ। সংগীত, চিত্রাঙ্কন ও খেলাধুলায় সাফল্যের ছাপ রাখতে শুরু করেন নারীরা। গণমাধ্যমেও নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বাড়ে। ইউনেসকোর তথ্য অনুসারে, গত বছর আফগানিস্তানে শিক্ষার হার ছিল ৪৩। ২০১৭ সাল থেকে পরের দুই বছরে দেশটিতে শিক্ষার হার বেড়েছে ৮। আফগান নারীদের সাফল্য ও সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সংবাদ উপস্থাপক বেহেস্তা আরঘান্দ।

তালেবানের ক্ষমতা দখলের কয়েক সপ্তাহ আগে আফগানিস্তানের বার্তা সংস্থা টোলোর হয়ে তালেবানের এক নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে বেহেস্তা বেশ কিছু কড়া কথা বলেছিলেন তালেবান নেতাকে। নারী অধিকার নিয়ে তিনি বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেছিলেন ওই তালেবান নেতার কাছে। তবে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর দেশ ছাড়তে হয় বেহেস্তাকে। গত ১৫ আগস্ট কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তালেবান সাংবাদিকদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। তাই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।

default-image

তালেবানের ক্ষমতা দখলের পরে দেশটির অর্থনীতি, কূটনীতি, শাসনপদ্ধতি, পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দেখা দেয় আফগান নারীদের নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দেশ ও সংস্থা নারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আর সেসব উদ্বেগ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণও মিলতে শুরু করেছে। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকারের বেঁধে দেওয়া নানা নিয়মের বেড়াজালে আটকে পড়ছেন আফগান নারীরা।
তালেবানের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় কোনো নারী সদস্য রাখা হয়নি। এমনকি নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভবনে নারী কর্মীদের ঢুকতে দিচ্ছে না তালেবান। তালেবান সরকারের নতুন শিক্ষামন্ত্রী আবদুল বাকি হাক্কানি আফগান নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পড়ার কথা জানিয়েছেন। শর্ত হলো তাঁদের হিজাব পরতে হবে। পুরুষদের সঙ্গে ক্লাস করার অনুমতি দেওয়া হয়নি নারীদের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আলাদা ক্লাসের ও নারী শিক্ষকের বন্দোবস্ত করা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

আগেরবারের তালেবান শাসনে আফগানিস্তান ১০০ বছর পিছিয়ে গেছে। তালেবান নারীদের মানুষ মনে করে না।
আফগান এক নারীর প্রতিক্রিয়া

তালেবান–নিযুক্ত আফগানিস্তানের খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাবিষয়ক দপ্তরের মহাপরিচালক জানান, দেশটিতে ৪০০ ধরনের খেলাধুলার অনুমোদন দেওয়া হবে। তবে এসব খেলায় নারীরা অংশ নিতে পারবেন কি না, তা স্পষ্ট করে জানাননি তিনি। এর মধ্যেই আফগানিস্তানের নারীদের ফুটবল দলের ৮০ জনের বেশি সদস্য পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছেন। ১৫ আগস্ট তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে কাবুল বিমানবন্দরে কাজ করতেন ৮০ জনের বেশি নারী। তবে এখন কাজে ফিরেছেন মাত্র ১২ জন। জাতিসংঘের এক আফগান কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, আফগানিস্তানের কয়েকটি প্রদেশে নারীদের বাইরে বের হতে বাধা দিচ্ছে তালেবান। এমনকি নারীদের চাকরি ছাড়তেও বাধ্য করা হচ্ছে।

শুধু খেলোয়াড় নন, আফগানিস্তান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন নারী অধিকারকর্মী, রাজনীতিক, গবেষক ও সাংবাদিকেরাও। গত বুধবার ভারতের নারী সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের আয়োজিত অনলাইন আলোচনায় এমনই কয়েকজন আফগান নারী জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। তাঁরা বলছেন, ‘আগেরবারের তালেবান শাসনে আফগানিস্তান ১০০ বছর পিছিয়ে গেছে। তালেবান নারীদের মানুষ মনে করে না।’
তবে একেবারে চুপ করে বসেও নেই আফগান নারীরা। তালেবানের রক্তচক্ষু মোকাবিলা করেই বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ হচ্ছে। চলছে অনলাইন জগতেও প্রতিবাদ। এসব বিক্ষোভেও নারীদের ওপর তালেবানের সহিংস আচরণ ও মারধরের অভিযোগ করেছেন আফগানিস্তানের নারী সাংবাদিকেরা। শিক্ষার্থীদের জন্য তালেবাননির্ধারিত পোশাকনীতির প্রতিবাদ জানিয়েছেন আফগান নারীরা। প্রতিবাদ জানাতে তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডুনটটাচমাইক্লথস’ ও ‘আফগানিস্তানকালচার’ নামে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছেন। এ হ্যাশট্যাগের সঙ্গে আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাকের ছবি জুড়ে দিয়ে তা শেয়ার করছেন তাঁরা।

অধিকার আদায়ে আফগান নারীদের লড়াই চলছেই। এ পথে বারবার হোঁচট খাচ্ছেন তাঁরা। এক পা এগোলে পিছিয়ে যেতে হচ্ছে দশ পা। একালের আফগান নারী এ লড়াইয়ে নিজেদের কতখানি টিকিয়ে রাখতে পারবেন, সে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, আল–জাজিরা, বিবিসি, এবিসি নিউজ, স্পুতনিক নিউজ ও ইন্ডিয়া টুডে

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন