গরমে বিদ্যুৎসংকট

ইরাকে জলবায়ুর এমন পরিবর্তনের পেছনে কয়েক দশক ধরে চলা যুদ্ধের ভূমিকা রয়েছে। দেশটির অবকাঠামো অনেকটাই নষ্ট হওয়ার পথে। ইরাকে প্রচণ্ড খরা, বারবার বালুঝড়, মরুভূমি অঞ্চলের সংখ্যা বাড়ছে। নদীর পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে।
প্রচণ্ড গরম আর প্রতিকূল এ আবহাওয়ার মধ্যেই ইরাকে বারবার বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ঘটে।

কেবল যাঁরা ব্যক্তিপর্যায়ে জেনারেটর ব্যবহার করতে পারেন, তাঁরাই ফ্রিজ অথবা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন; তবে সেটা মোটেও সহজলভ্য নয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন পর্যায়ে জেনারেটর ব্যবহারের জন্য অনেক ইরাকিকে মাসে ১০৫ ডলার খরচ করতে হয়।

এত বেশি অর্থ ব্যয় করা সাধারণ ইরাকিদের পক্ষে কঠিন। উম মোহাম্মদ বলছেন, সরকারকে অবশ্যই দরিদ্রদের সহায়তা করতে হবে। তাদের স্বীকার করতে হবে যে নাগরিকদের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ তারা সরবরাহ করতে পারছে না। উম মোহাম্মদ আরও বলেন, ইরাকি সরকার নাগরিকদের সঙ্গে যা করছে, তা সৃষ্টিকর্তাও মেনে নেবে না।

বিদ্যুৎ-সংকট কেন

ওপেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ হলো ইরাক। তবে তেলসম্পদে একসময়ের সমৃদ্ধিশালী এই দেশ বছরের পর বছর ধরে প্রতিবেশী ইরানের কাছ থেকে গ্যাস কিনছে। ইরাকের বিদ্যুৎ খাতের এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয় ইরান।

ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানি খাতে অর্থ পরিশোধ করা বাগদাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমদানি খাতে ইরাকের বকেয়া বেড়েছে। তেহরান আমদানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

এর প্রভাবে ইরাকের বেশির ভাগ জায়গায় বিদ্যুৎ–বিভ্রাট স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৪ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার এই দেশে এমন বিদ্যুৎ-সংকটের জন্য রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে ২০১৯ সালের শেষ দিক থেকে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বেশ কয়েকবার বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভের বেশির ভাগই হয়েছে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে।

বসরা থেকে কিছুটা উত্তরে নাসিরিয়াহ অঞ্চলের বাসিন্দা নাতাক আল খাফাজি। তিনি বলেন, এত গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। পরিস্থিতি নারকীয় হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিভিন্ন দেশে গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে যখন সবাই বেড়াতে যায়, তখন খাফাজির তিন সন্তান গরমের জন্য কোথাও যেতে পারে না। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকার ঘরে তারা ঢুকে থাকে, যাতে বাইরের তাপ থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে পারে। তিন সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে খাফাজি ব্যাটারিচালিত একটি ফ্যান কিনেছেন। তবে চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না। কারণ, তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রিতে পৌঁছালে এই ফ্যান গরম থেকে খুব সামান্যই স্বস্তি দিতে পারবে।

পরিস্থিতির উন্নতির জন্য যা করা দরকার

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীর্ষ পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় ইরাককে অন্তর্ভুক্ত করেছে জাতিসংঘ। গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ইরাকে ১০টি বালুঝড় হয়েছে। খরা, মাটির ক্ষয়, উচ্চ তাপমাত্রা ও কম বৃষ্টিও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে।

ইরাকের প্রেসিডেন্ট বাহরাম সালেহ সতর্কতা জারি করে বলেন, ‘ইরাকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ জাতীয় গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, এই জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি।’

সালেহ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইরাকের ৩৯ শতাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করেছে মরুকরণ। এসব এলাকায় পানির সরবরাহ কমে যাচ্ছে। ফসলের ফলনও কম হচ্ছে।

ইরাকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেইফ আল বদর বলেন, সামনের বছরগুলোয় দাবদাহ ও ধূলিঝড় আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে—এমন অনেককে সামনে আরও চিকিৎসা দিতে হতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরাকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এসব সংকট মোকাবিলার জন্য স্থিতিশীল নেতৃত্বের সংকট রয়েছে ইরাকে। কারণ, দেশটি গত অক্টোবরে নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা টালমাটাল পরিস্থিতিতে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক সতর্কতা জারি করে বলেছে, ইরাকে জলবায়ু সংকটের সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু সংকটের কারণে ইরাক পানিসম্পদের ২০ শতাংশ হারাতে পারে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন