default-image

চীনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ হাজারেরও বেশি। সংখ্যাটা দ্রুত বাড়ছে। আর এমনটা যে ঘটতে চলেছে, এই সতর্কবার্তা প্রথম যাঁর কাছ থেকে এসেছিল, তিনিও এখন মৃত্যুর মিছিলে শামিল। বিশ্ববাসী জেনে গেছে সেই সাহসী চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াংয়ের কথা। জেনে গেছে নিখোঁজ সাংবাদিক চেন কিউশির কথাও। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে খবর প্রচারের জন্য কোয়ারেন্টাইন করার নামে তাঁকে আটকে রেখেছে পুলিশ।

লির সতর্কবাতায় কান দিয়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে চীন সরকারের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা জোরদার হলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা হয়তো কমত।

হিরো চিকিৎসকের কথা
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর চ্যাট গ্রুপে বার্তা দিয়ে করোনাভাইরাস নিয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করেছিলেন চক্ষুবিশেষজ্ঞ লি ওয়েনলিয়াং। চোখের চিকিৎসক হলেও তিনি কয়েকজন রোগীর মধ্যে বিশেষ ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ লক্ষ করেন। উহানের হাসপাতালে এ ধরনের রোগীদের সংখ্যা তখন বাড়তে শুরু করেছে। লি দেখছিলেন, চীনের সরকার এ নিয়ে তেমন কোনো তথ্য প্রকাশ করতে চাইছে না। চিকিৎসকের দায়বদ্ধতা থেকে লি তাঁর কর্তব্য ঠিক করে ফেলেন। ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনি তাঁর সহকর্মী চিকিৎসকদের সুরক্ষামূলক পোশাক পরার পরামর্শ দেন। সে সময় করোনা সংক্রমণ রোধে চীনের সরকারের তৎপর হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা।

চার দিন পর লিকে তলব করে জননিরাপত্তা ব্যুরো। সামাজিক অস্থিরতা ছড়ানোর জন্য লিখিত বিবৃতি দিয়ে ক্ষমা চাইতে হয় লিকে। চুপ করতে বাধ্য হন লি। এর মধ্যে আরও ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। গত ১০ জানুয়ারি লিও আক্রান্ত হন। ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। মৃত্যুর কারণ নিয়ে লুকোচুরির পর জানা যায়, লির মৃত্যু হয়েছে করোনাভাইরাসে। এ নিয়ে বিক্ষোভ হয় চীনে।

সাংবাদিক চেন কেন নিখোঁজ
৩৪ বছর বয়সী নাগরিক সাংবাদিক চেন কিউশি চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রস্থল উহান থেকে তিনি সমালোচনামূলক প্রতিবেদন করছিলেন। করোনাভাইরাস ঠেকাতে উহানে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চীনা সরকার। এর এক দিন পর গত ২৪ জানুয়ারি চেন কিউশি সেখানে যান। তিনি সেখানকার ভিড়ে ঠাসা হাসপাতাল, মৃতদেহের সৎকারকারী প্রতিষ্ঠান, অস্থায়ীভাবে তৈরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। নিজের চোখে দেখা এসব জায়গার ভিডিও তিনি অনলাইনে আপলোড করেন। উহানের বিপর্যস্ত অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বের মানুষ জানতে পারে।

লির মতো চুপ করানো হয় চেনকেও। ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ৭ ফেব্রুয়ারি ইউটিউবে লাইভে এসে চেনের মা অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে জোর করে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চেনের আপলোড করা সবকিছু মুছে ফেলা হয়েছে।

default-image

অতীত থেকে শেখে না চীন
চীনে ঘরের বিপর্যয় লুকিয়ে রাখার প্রবণতা খুব পুরোনো। দেশটিতে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ হয় ২০০২-০৩ সালে। চীনা কর্তৃপক্ষ কয়েক মাস ধরে গোপন রেখেছিল সেই ভয়াবহ তথ্য। প্রকাশ হতে হতে ২৬টি দেশের সাত শতাধিক মানুষ মারা যায়।

২০০৮ সালে চীনের কমপক্ষে ২০টি দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দুধের সঙ্গে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেলামিন মিশিয়ে বাজারজাত করেছিল। এ বিষাক্ত দুধ খেয়ে চীনে ছয় শিশুর মৃত্যু এবং তিন লাখের বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চীনা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোয় সেই খবর প্রকাশ করতে দেয়নি। একইভাবে চিকিৎসক লির মৃত্যুর খবর চীনের গণমাধ্যমে এসেছে সাদামাটাভাবে।

চীনা নাগরিকদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, করোনাভাইরাসের খবর শেয়ার করায় চীনে বার্তা আদান-প্রদানের মেসেজিং অ্যাপ ‘উইচ্যাটে’ অনেককে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

কী করছে চীন
এখন পর্যন্ত চীন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যা করছে, তা হলো আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলাদা করে রাখা। চীন প্রায় পাঁচ কোটি মানুষকে কোয়ারেন্টাইন করে রোগের বিস্তার রোধের চেষ্টা করছে। এর পাশাপাশি উপশমের জন্য চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। করোনার কেন্দ্রস্থল উহানে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য মাত্র ১০ দিনে তৈরি হয়েছে হাসপাতাল। কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি নিয়ে গবেষণাও চলছে। কিন্তু তা আদৌ কবে আসবে বা কার্যকর হবে কি না, সেটা অজানা।

দেরিতে হলেও বোধোদয় কিছুটা হয় চীনের। নতুন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ‘দুর্বলতা ও ঘাটতি’ থাকার কথা ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকটায় স্বীকার করেছেন চীনের শীর্ষ নেতারা। চীনের পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর নেতারা এই স্বীকারোক্তি দেন। সেখানে জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উন্নতি করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

যদি আগে ভাবত
ডিসেম্বরের শেষ থেকে করোনার সংক্রমণের শুরুতেই লির সতর্কবার্তা চীনা সরকারকে যদি আরেকটু ভাবাত, তাহলে প্রতিরোধব্যবস্থা সংক্রমণের শুরুতেই নেওয়া যেত। আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাটা আরও কম হতে পারত। ভ্যাকসিন তৈরির উদ্যোগটাও শুরু হতো আরও আগে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে চীন সরকারের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা জোরদার হলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কমত।

বিজ্ঞাপন
এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন