বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

৯/১১ হামলার ঘটনার সঙ্গে যে কয়েকটি দেশের নাম জড়িয়ে পড়ে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল আফগানিস্তান। তখন প্রচণ্ড প্রতাপে আফগানিস্তান শাসন করা তালেবান ছিল আল-কায়েদা প্রধান ওবামা বিন লাদেনসহ সংগঠনটির বড় বড় নেতার আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষক। তাই আফগানিস্তানে সাবেক সোভিয়েত বাহিনীর উত্থান ঠেকাতে মার্কিন সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়া তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু বনে যায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো, আল-কায়েদাকে গুঁড়িয়ে দিতে হলে আগে তালেবান সরকারকে হটাতে হবে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক মিত্রদেশগুলোকে নিয়ে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

যে হামলার জেরে শুরু হয়েছিল আফগান যুদ্ধ, তার ২০ বছর পূর্তির আগেই আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে উঠেপড়ে লাগে যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই চুক্তি ছিল একপেশে, যা আফগানিস্তানে তালেবানকে ক্ষমতায় বসাতে সহায়তা করেছে। চুক্তিটি আফগান জনগণ ও দেশটির সরকারের বিপক্ষে ছিল।

আফগান যুদ্ধের ইতি টানতে ট্রাম্প প্রশাসনের করা চুক্তি ধরেই বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রশাসনও তাড়াহুড়ো করে পদক্ষেপ নেয়। গত ১ মে আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্তভাবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরুর পর থেকে তালেবানের হাতে পতন ঘটতে থাকে একের পর এক আফগান শহর। গত ১৫ আগস্ট কাবুল দখলে নেয় তালেবান। গত মঙ্গলবার তালেবান আফগানিস্তানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গঠন করে। তাতে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত ও কট্টর নেতারা স্থান পেলেও কোনো নারী ও তালেবানের বাইরে কোনো জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধির সেখানে জায়গা হয়নি।

কিন্তু আফগানিস্তানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ গঠনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের সুযোগ ছিল তালেবানের হাতে। কিন্তু সংগঠনটি সেই পথে হাঁটেনি। নতুন এই সরকার গঠন নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব। পশ্চিমাদের নিয়ম মেনে তালেবান যে দেশ চালাবে না, তেমনটাই মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত।

default-image

কাবুল দখলের পর অনেকটাই আলাদা তালেবানকে দেখা গিয়েছিল। একসময়ের প্রধান শত্রু সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইসহ আফগানিস্তানের আগের সরকারের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন তালেবান নেতারা। তাঁরা দেশটিকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন। সংঘাত নয়, শান্তির মাধ্যম দেশের শাসনভার গ্রহণ করার কথাও বলেন তালেবান নেতারা।

কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই পুরোনো চেহারায় ফিরতে শুরু করেছে তালেবান। ইতিমধ্যে বিক্ষোভ দমনে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে তারা। ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে তালেবান যে কঠোর শরিয়াহ আইন চালু করে, এবারও সেই পথেই হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তালেবান ইতিমধ্যে নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বিলুপ্ত করেছে। নারীদের মন্ত্রী করা হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে। ইসলামি অনুশাসন মেনে নারীদের কাজে যাওয়া, বাইরে বের হতে নির্দেশ দিয়েছে তালেবান। জাতিসংঘের এক আফগান কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, কাবুল দখলের পর তালেবান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা থেকে ক্রমেই তারা সরে যাচ্ছে। আফগানিস্তানের কয়েকটি প্রদেশে নারীদের বাইরে বের হতে বাধা দিচ্ছে তারা। এমনকি নারীদের চাকরি ছাড়তেও বাধ্য করছে।

তালেবানের আগের শাসনামলে নারীদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ, বাইরে যেতে হলে পুরো শরীর ঢাকা, মেয়েদের স্কুল যাওয়া নিষিদ্ধের মতো কঠোর বিধিনিষেধ জারি ছিল। দেশটিতে টেলিভিশন, সিনেমা, বিনোদন নিষিদ্ধ ছিল। তালেবানের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা এবারও নারীদের সব ধরনের খেলাধুলা নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন। তবে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি দিয়েছে তালেবান। সেই ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের আলাদাভাবে পাঠদানের কথা বলছে তারা।

তবে হত্যা, ব্যভিচারের সাজা জনসমক্ষে ফাঁসি ও চুরির শাস্তি অঙ্গচ্ছেদের মতো কঠোর যে শাস্তি তালেবানের আগের শাসনামলে প্রচলিত ছিল, তা এবার বলবৎ হবে কি না, এখনো নিশ্চিত নয়। তবে নারী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার হরণের বিষয়টি সব মহলে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

সম্প্রতি আফগান পার্লামেন্টের নারী সাংসদ ফারজানা কোচাই বলেন, রাজনীতি, শিক্ষা, অর্থনীতিতে আফগান নারীদের যে অংশগ্রহণ ছিল, এখন তাঁদের সেই সুবিধা পাওয়া কঠিন হবে।

ধর্মীয় কট্টরপন্থার দিক দিয়ে তালেবান অবিচল থাকবে বলে মনে হচ্ছে। তবে নেতৃত্বের দিক থেকে সংগঠনটির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথম যখন তালেবান ক্ষমতায় এসেছিল, তখন সরকারে থাকা ব্যক্তিদের বেশির ভাগ ছিলেন সবেমাত্র মাদ্রাসার পড়া শেষ করা। রাজনীতি, ভূরাজনীতি, বিশ্ব কূটনীতি, সরকার চালানোর দক্ষতার বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু এবারের তালেবান নেতৃত্ব অনেক বেশি অভিজ্ঞ। দীর্ঘদিন যুদ্ধে লিপ্ত আর ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে তালেবান নেতাদের সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে।

default-image

বিষয়টি মানছেন আফগান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইরফান ইয়ার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে এক সাক্ষাৎকার তিনি বলেছেন, বিশ্বায়নের কারণে তালেবানে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাদের। তিনি আরও বলেন, যখন প্রথম তারা (তালেবান) ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের সবাই ছিলেন মাদ্রাসাছাত্র। তাঁরা কিছুই জানতেন না। কিন্তু ২০ থেকে ২৪ বছর ধরে তাঁরা রাজনীতিতেই যুক্ত ছিলেন। আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার বিষয়টি ক্রমান্বয়ে রপ্ত করতে পেয়েছেন তাঁরা।

তালেবান যে আন্তর্জাতিক মাঠের নতুন খেলোয়াড় হয়ে উঠছে, তা ইতিমধ্যে আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। তারা নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তালেবানের সেই প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করছে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তানের মতো দেশগুলো। চীন তালেবানের সঙ্গে কাজ করতে মুখিয়ে রয়েছে। রাশিয়াও তা–ই। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তো তালেবানকে সামরিক-আর্থিকভাবে সহায়তা করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় তালেবান পশ্চিমাদের দিকে না ঝুঁকে ক্ষমতাধর প্রতিবেশী চীন এবং একসময়ের শত্রু রাশিয়ার পাটাতনে আশ্রয় নেবে বলে মনে হচ্ছে। তবে আলোচনার পথ কারোর জন্যই বন্ধ রাখবে না আফগানিস্তানের নতুন এই শাসক।

কট্টর রক্ষণশীলতার আড়ালে নিজেদের উদার হিসেবেও তুলে ধরার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইরফান ইয়ার বলেছেন, নতুন তালেবানকে উদার মনে করাটা বোকামি হবে। তারা এখনো খুবই রক্ষণশীল। তবে তালেবান উপলব্ধি করেছে যে আগের মতো নিপীড়নমূলক শাসন যদি বজায় রাখে, তাহলে সেটাকে কেউই গ্রহণ করবে না।

তথ্যসূত্র: এবিসি নিউজ, বিবিসি

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন